উত্তাল কাশ্মীরে সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ছেই

সুরমা টাইমস ডেস্ক:: সম্প্রতি ভারতে নরেন্দ্র মোদি সরকার জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এমন ঘোষণার পর থেকে কাশ্মীরজুড়ে এক ধরনের থমথমে নীরবতা। এরই মধ্যে ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিলের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন অন্তত ছয়জন। আহত হয়েছেন শতাধিক।

গত বৃহস্পতিবার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছেন বিচ্ছিন্নতাবাদ ও জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় এমন কঠোর সিদ্ধান্তের প্রয়োজন ছিল।

এদিকে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের ঘোষণার পর থেকে নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছে অঞ্চলটিকে। বিক্ষোভ ঠেকাতে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, জারি করা হয়েছে কারফিউ। ঘোষণার আগে-পরে তার সঙ্গে যোগ করা হয়েছে অতিরিক্ত সেনা সদস্য।

কড়া নিরাপত্তার কারণে বেশিরভাগ মানুষই ঘরের মধ্যে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। স্কুল-কলেজ, দোকানপাট এমনকি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোও বন্ধ রয়েছে। ইন্টারনেট ও টেলিফোন সেবা বন্ধ থাকায় কাশ্মীরের কোনো তথ্যও বাইরে আসছে না। কিন্তু এর মধ্যেও গত কয়েকদিনে শ্রীনগরে বসবাসরত বেশ কয়েকজন কাশ্মীরির সঙ্গে কথা বলতে পেরেছে ডয়চে ভেলে। কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে তাদের পরিস্থিতি কেমন, জানতে চাওয়া হয়েছে তাদের কাছে।

ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সবাই বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। এমনকি তারা যে ভালো আছেন, যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় অন্য এলাকার স্বজনদের সে খবরও পৌঁছে দিতে পারছেন না অনেকে। গত কয়েকদিনে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়েছে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে। খুব অল্প সংখ্যক হাসপাতাল ও অ্যাম্বুলেন্স খোলা রয়েছে।

রশীদ আহমেদ নামে এক দোকানি বলেন, সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে জরুরি সেবার ওপর। আমার চাচাকে ডায়ালাইসিসের জন্য হাসপাতাল নিতে হবে, নিরাপত্তাকর্মীদের এটা বোঝাতেই আমার দুই দিন লেগেছে। তার অবস্থা খুব খারাপ ছিল। তিনি জানান, চিকিৎসক ও নার্সরাও নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারছেন না। বেশিরভাগ রাস্তায় কিছুদূর পরপরই ইস্পাত ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে চেকপয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে।

এর আগেও কাশ্মীরে নিরাপত্তা অভিযান চলেছে। ২০০৮, ২০১০ এবং ২০১৬ সালে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পরপর কড়া নজরদারি চালানো হয় কাশ্মীরে। কিন্তু কখনও ল্যান্ডফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়নি।

দক্ষিণ কাশ্মীরের শোপিয়ান জেলার এলাকাটিকে একসময় ‘জঙ্গিদের অভয়ারণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। জেলাটির কাচদোরা গ্রামের ফায়াজ বুখারি জানান, এই পরিস্থিতিতে কাশ্মীরিরা কী ভাবছে, তা জানারও কোনো উপায় নেই। তিনি বলেন, আমরা কীভাবে যোগাযোগ করবো? আমরা নরকে বাস করছি৷ আমরা শুধু শুনতে পাই নিরাপত্তা বাহিনী লাউডস্পিকারে ঘোষণা দিচ্ছে সবাইকে ঘরের ভেতরেই থাকার জন্য। এটা অবিশ্বাস্য।

অঞ্চলটিতে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বাতিল হয়েছে অনেক বিয়ের আয়োজন। গোলাম রসুল নামের এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, এই পরিস্থিতিতে বিয়ের কথা চিন্তা করা কিভাবে সম্ভব?

ফার্মাসিস্ট পাশারাত মানজার বলেন, কারফিউয়ের মধ্যে খাবার কেনাকাটার জন্য কিছু সময় আমাদের দেওয়া হয়েছিল। তখন আমরা রাস্তায় পাথর ও ইটের টুকরা পড়ে থাকতে দেখেছি। এ থেকে আমরা কী বুঝবো? অবশ্যই কোনো ধরনের সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। তিনি বলেন, কাল শুনেছি, একদল ছেলেকে নিরাপত্তাবাহিনী তাড়া দিয়েছিল। তাদের একজন পালাতে গিয়ে ঝিলম নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মারা গেছে।

ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রীনগর বিমানবন্দরে আসা যাত্রীরাও শহরে পৌঁছাতে পারছেন না। আলতাফ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, কারফিউ পাস পাওয়ার প্রক্রিয়া এক অভিজ্ঞতা। এছাড়া কাশ্মীর উপত্যকার মূল অংশ ছেড়ে বাইরে যাওয়াও আমাদের মানা৷

কাশ্মীর অঞ্চলের পুলিশ প্রধান দিলবাগ সিং জানিয়েছেন ধীরে ধীরে এই নিরাপত্তা শিথিল করে দেওয়া হবে। কিন্তু সেটা কতোদিন পর, তা জানাতে পারেননি কেউ।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কাশ্মীরের কী হবে? সহিংসতার আশঙ্কা বেড়েই চেলেছে। সানা ভাট নামের এক কাশ্মীরি বলেন, আমরা এরই মধ্যে সম্পূর্ণ আত্মত্যাগ করেছি। আমাদের আর কী বাকি আছে!

Sharing is caring!

Loading...
Open