এখনও কিভাবে স্বপদে বহাল আছেন গোয়াইনঘাট থানার ওসি জলিল ?

স্টাফ রিপোর্টার ::
সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট থানার ওসি’র অত্যাচার জনিত আচার-আচরনের কারনে যদি এসআই সুদীপ বড়ুয়ার মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যা হয় তবে এতদিন পর্যন্ত ওসি জলিলকে গোয়াইনঘাটে রাখার উদ্দেশ্য কি হতে পারে? পি.আর.বি. ( পুলিশ রেজুলেশন বুক ) অনুযায়ী যদি কোন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোন ধরনের অভিযোগ উঠে,তাহলে তাকে তার নিজ কর্মস্থল থেকে সরিয়ে স্থানীয় পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। সে জায়গায় গোয়াইনঘাট থানার ওসি জলিলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকার পরও এখনও কিভাবে স্বপদে বহাল আছেন গোয়াইনঘাট থানার ওসি আং জলিল। এ নিয়ে গোয়াইনঘাটবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকে বলেছেন নতুন পুলিশ সুপার সর্ব কিছু অবগত হলে ওসি জলিলকে সরিয়ে দিতে পারেন, সুদীপ বড়ুয়ার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী সন্তানকে সিলেট থেকে চলে যেতে বাধ্য করার মন্ত্রটি ওসি জলিলকে জেলা অথবা রেঞ্জের কোন কোন পদ মর্যাদার কর্মকর্তা বাতলে দিয়েছেন, সেদিকেও নজর দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। শোনা গেছে এক সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছিলো, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন দাখিলের সময় সীমা কতো মাস বা বছর তাও নির্ধারন হওয়া দরকার। গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ প্রশাসনের আভ্যন্তরীন নানা সংকট নিয়ে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হবার আগেই জেলা পুলিশ প্রশাসন থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে গোপন প্রতিবেদন পাঠানোর বিষয়টি অগ্রাধিকার দেয়ার তাগিদ ওয়াকিবহাল মহলের।

অত্যান্ত লজ্জার বিষয় গোয়াইনঘাটের এত বিতর্কিত ওসি আব্দুল জলিলকে জেলা পুলিশ লাইনে পুরুষকৃত করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিক থেকে শুরু করে সকল সুবিধা ভোগীরা গত বুধবার থেকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তারাই সম্প্রতি ওসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন এবং সুদীপ হত্যার বিচার চেয়ে ফেসবুকে বিক্ষেভ করছিলেন।

জানা যায়, ওসি আব্দুল জলিলের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন সিলেটের গোয়াইনঘাট থানার এস আই সুদীপ। তুচ্ছ কারণে তাকে গালিগালাজ করতেন ওসি। বার বার টাকার জন্য চাপও দিতেন। গত ২রা জুন রোববার সাব-ইন্সপেক্টরদের মাসিক চাঁদা ওসিকে দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন আব্দুল জলিল। কিন্তু সুদীপ ওই টাকা দিতে অস্বীকার করেন। এরপর থেকে সুদীপকে আরো বেশি মানসিক চাপে রাখেন ওসি। এসব কারণেই এস আই সুদীপ আত্মহত্যা করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ২রা জুন রোববার বিকালে এস আই সুদীপের লাশ উদ্ধারের পর নানা তদন্তে ওসি জলিলের কুকীর্তির বিষয়টি ধরা পড়েছে।

আর সুদীপের মৃত্যুর ঘটনায় সিলেট জেলা পুলিশে টালমাটাল পরিস্থিতি ছিলো বিরাজমান। সুদীপের বেইজমেট পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে ওসি জলিলের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছিলো। এ ঘটনার পর ক্ষোভ সামলাতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। নিহত এস আই সুদীপ বড়ুয়ার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া থানার সোনাইছড়ি গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত রাবিন্দ্র লাল বড়ুয়া। বাংলাদেশ পুলিশে তিনি ২৮ বছর ধরে কর্মরত ছিলেন। চলতি বছরের ১৬ই ফেব্রুয়ারি তিনি সিলেটের গোয়াইনঘাট থানায় বদলি হয়ে আসেন। সুদীপ বড়ুয়ার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস এবং ছেলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী চট্টগ্রামের একটি স্কুলে লেখাপড়া করে।

এ ব্যাপারে নিহত এসআই সুদীপের মেয়ে শতাব্দী বড়ুয়া কর্মরত সাংবাদিকদের জানান, ‘আমার বাবা গোয়াইনঘাটে বদলির পর থেকে থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল জলিলের সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না। মামলার কিংবা তুচ্ছ কোনো ব্যাপারে প্রায়ই আমার বাবাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ এবং চরম মানসিক চাপে রাখতেন ওসি। দিনরাত সমান তালে আমার বাবাকে বাড়তি দায়িত্ব দিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে রাখতেন ওসি আব্দুল জলিল। সর্বশেষ গত ১লা জুন শনিবার আমার বাবার সঙ্গে আমার কথা হয়, তিনি তখনও বলেছেন তিনি আর গোয়াইনঘাট থানায় থাকতে চান না।’

এরপর সুদীপকে দ্রুত অন্য থানায় বদলির আবেদনও করিয়েছেন বিতর্কিত ওসি আব্দুল জলিল। এবং ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা যদি বদলির কারণ জিজ্ঞেস করলে নিজ জেলায় যেতে চান এটা বলতেও এস আই সুদীপকে নির্দেশ দেন ওসি। সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মাহবুবুর রহমান জানিয়ে ছিলেন, লাশের সুরতহাল রিপোর্ট ও ময়নাতদন্ত শেষে রিপোর্টে ভিত্তিত্বে মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। এদিকে গোয়াইনঘাট থানার বিতর্কিত ওসি আব্দুল জলিলের বিরুদ্ধে কোয়ারিতে চাঁদাবাজি, সীমান্ত পেরিয়ে আসা ভারতীয় গরুর প্রতি চালান থেকে ২ হাজার টাকা বখরা আদায়সহ নিরপরাধ জনসাধারণকে মিথ্যা ও সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাভোগে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। বিতর্কিত এই ওসি ইতিপূর্বে চলতি বছরের ১৬ই জানুয়ারি বুধবার রাতে এই আসনের এমপি সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর বাসায় উপঢৌকন পাঠিয়ে নানা বিতর্কের জন্ম দেন ওসি জলিল। এ ঘটনায় সারা দেশের গণমাধ্যমে তার বিতর্কিত ভূমিকা ফলাও করে প্রকাশিত হলেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। তার একচ্ছত্র মদতে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে শান্তির জনপদ গোয়াইনঘাট।

ইতিপূর্বে পার্শ্ববর্তী জৈন্তাপুর থানায় ২০১১ সালে কর্মরত অবস্থায় জনসাধারণকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি, চাঁদাবাজির ঘটনায় এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ করে তাকে অন্যত্র বদলি করতে বাধ্য করান। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল থানায় কর্মরত অবস্থায় সেখানেও তিনি চাঁদাবাজি,সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ বিতর্কিত কর্মকান্ডের কারণে তাকে সুনামগঞ্জে বদলি করা হয়েছিলো। ২০১৮ সালের ২৭শে মে গোয়াইনঘাট থানায় বদলি হন ওসি আব্দুল জলিল।

থানায় যোগদানের পরই জাফলং এবং বিছনাকান্দি কোয়ারিতে চাঁদাবাজিতে মরিয়া হয়ে উঠেন। তার লাগামহীন চাঁদাবাজির কারণে জাফলং ও বিছনাকান্দি কোয়ারির সাধারণ ব্যবসায়ীরা তটস্থ ছিলেন। এ ব্যাপারে ওসি আব্দুল জলিল সাংবাদিকদের জানান, এস আই সুদীপ বড়ুয়া আত্মহত্যা করেছেন নাকি অন্য কিছু তা তিনি জানেন না। বিষয়টির ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তথ্য দেবেন। ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মিথ্যা মামলায় জনগণকে হয়রানির বিষয়ে তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।

Sharing is caring!

Loading...
Open