ছাত্রলীগ কর্মী জাহিদ হত্যা মামলা সঠিকভাবে তদন্ত না করার অভিযোগ


নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেটে ছাত্রলীগ কর্মী আবুল হোসাইন জাহিদ হত্যা মামলা সঠিকভাবে তদন্ত না করার অভিযোগ উঠেছে।
এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন খোদ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাজিক কুমার রায়। আলোচিত হত্যা মামলাটির যথাযথ তদন্ত না করেই নাকি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে মামলার আসামিদের নাম-ঠিকানা নিয়েও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছেন।

এ ঘটনায় আদালত দাখিলকৃত অভিযোগপত্রটি আমলে না নিয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য সিলেট পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) আদেশ দেন।অভিযোগ রয়েছে,তদন্তের সময় মামলার বাদীর কাছ থেকে কোনও ধরনের সহযোগিতা নেননি তদন্ত কর্মকর্তা। এমনকি আদালতে দাখিলকৃত অভিযোগপত্রে ছয় জনকে অব্যাহতি দেওয়ারও সুপারিশ করেছেন তিনি। কিন্তু আদালতে হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ফজর আলী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে নিজের জড়িত থাকার পাশাপাশি আরও সাত জনের নাম উল্লেখ করেছিলেন।

জবানবন্দিতে রাহাত, নয়ন ও সাহেদসহ অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও সুস্পষ্ট ছিল বলে আদালতের কাছে তা প্রতীয়মান হয়। তবুও মামলার তদন্তকর্মকর্তা কোনও ধরনের তদন্ত ছাড়াই উক্ত আসামিদের সঠিক নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন।
আদালত সূত্র জানায়, সিলেট মেট্রোপলিটন ৩য় আদালতে গত ২৭ মে অভিযোগপত্র নং-৮১ দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে সালমান ও আরমানের নাম আসে। এছাড়াও আলোচিত এ হত্যা মামলা থেকে রাহাত, ওবায়দুল, নয়ন, হাবিবুর রহমান, জালাল আহমদ ও এনায়েত হোসেনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

এছাড়াও কিশোর অপরাধী হওয়াতে ফজর আলী, শাহেদ ও ইয়াছিন আহমদ তায়েফকে অভিযুক্ত করে পৃথক আরেকটি অভিযোগপত্র ৮১ (ক) দাখিল করেন।আদালত তার দেওয়া আদেশে উল্লেখ করেন, ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত অভিযুক্ত ফজর আলী নিজেকে এই মামলার ঘটনার জড়িত বলে আদালতে ১৬৪ ধারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তার দেওয়া জবানবন্দিতে রাহাত, নয়ন, তায়েফ, আরমান, ছোট্ট জাহিদসহ সাত জনের নাম প্রকাশ পায়। জবানবন্দিতে আসামি রাহাত, নয়ন, সাহেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সুস্পষ্ট। তদন্তকারী কর্মকর্তার উক্ত আসামিদের সঠিক নাম-ঠিকানা না পাওয়ার দাবিটি অযৌক্তিক,কেননা এটি একটি হত্যা মামলা। এক্ষেত্রে আসামিদের সঠিক নাম-ঠিকানা নিরুপণ করার সর্বাত্মক চেষ্টা প্রয়োজন। যার কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তার দাখিলকৃত অভিযোগপত্র অগ্রাহ্য করা হলো।

আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ফজর আলী উল্লেখ করে,জাহিদ হত্যাকাণ্ডের সময় রাহাত, নয়ন, সাহেদ, তায়েফ, সালমান (ফজর আলীর ছোট ভাই), আরমান (ফজর আলীর ছোট ভাই)ও ছোট জাহিদ উপস্থিত ছিল। গত ২৫ জানুয়ারি সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৩য় আদালতের তৎকালীন বিচারক মামুনুর রহমান সিদ্দীকির আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আসামিরা।

সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ২৭ অক্টোবর সিলেট নগরের উপশহরের ডি ব্লকের ২৫ নং রোডে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় ছাত্রলীগ কর্মী আবুল হোসাইন জাহিদকে। এ ঘটনায় জাহিদের পিতা নগরের সৈদানীবাগ এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৯ জনকে এজাহার নামীয় আসামি করার পাশাপাশি অজ্ঞাত আরও ১০-১৫জনকে আসামি করা হয়।

আসামিরা হচ্ছেন- সোনারপাড়া এলাকার হাছন আলীর ছেলে ফজর আলী,সালমান, আরমান, হবিগঞ্জের মাধবপুরের শাহ জালালপুর গ্রামের শওকত জামানের ছেলে রাহাত ও ওবায়দুল। এছাড়াও চাঁদপুর জেলার পাছৈর খাছাড়ী বাড়ির আব্দুল মতিনের ছেলে হাবিবুর রহমান, সোনারপাড়া এলাকার সেলিম মিয়ার ছেলে শাহেদ, ছাতক মঙ্গলপুর গ্রামের মৃত জলিল আহমদের ছেলে জালাল আহমদ ও মৌলভীবাজারের বড়লেখা থানার মুদতপুর গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে এনায়েত।

রবিবার (১৪ জুলাই) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট মহানগর পুলিশের শাহপরাণ থানার জেনারেল রেকর্ড অফিসার (জিআরও) সমীরণ দাস বলেন, ছাত্রলীগ কর্মী আবুল হোসাইন জাহিদ হত্যা মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র গত ২৭ মে দাখিল করেন।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আজিম পাটোয়ারি বলেন,আদালতের নির্দেশ পেয়ে পিবিআই ছাত্রলীগ কর্মী আবুল হোসাইন জাহিদ হত্যা মামলাটির তদন্ত শুরু করেছে। কবে নাগাদ পিবিআই’র প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সিলেট মহানগর পুলিশের শাহপরাণ থানার শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা এসআই সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ছাত্রলীগ কর্মী জাহিদ হত্যা মামলা পুরোটাই তদন্ত করেছেন থানার এসআই রাজিব কুমার রায়। মামলার অভিযোগপত্রে তিন জন কিশোর অপরাধী হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগপত্রে শুধুমাত্র প্রতিস্বাক্ষর করেছি। এছাড়াও মামলার কোনও বিষয় আমার জানা নেই।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহপরাণ থানার এসআই রাজীব কুমার রায় বলেন,পুলিশের তদন্তে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে সেগুলো অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি যাদের নাম ঠিকানা খোঁজে পাওয়া যায়নি পরে তাদের নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলে তা অভিযোগপত্রে সংযুক্ত করা যাবে। হত্যাকাণ্ডের পর ছোট জাহিদকে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি।

নিহত আবুল হোসাইন জাহিদের বাবা মামলার আবুল কালাম বলেন, আমার ছেলে হত্যার মামলা নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা আমাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করেননি। যা কিছু অগ্রগতি হয়েছে তা আমাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। এমনকি অভিযোগপত্র তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রাজিব কুমার রায় গোপনে দাখিল করেছেন। আমাদেরকে তিনি কিছুই বলেননি। তিনি অভিযোগ করেন, যাদের নাম ফজর আলীর জবানবন্দিতে প্রকাশ পেয়েছে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

Sharing is caring!

Loading...
Open