ও বাবা তুমিতাইন আইছো নি, আমার “মিয়াদ” খানো?

নিজস্ব প্রতিনিধি:: ও বাবা, ও বাবা তুমিতাইন আইছো নি, আমার “মিয়াদ” খানো? ৩য় দিনের কুলখানীতে যাওয়া মিয়াদের বন্ধুদের দেখে বার বার উক্তিটি বলছিলেন (নিহত মিয়াদের মা)। ‘আমার ভাইরে আনিয়া দেও’, ‘আমার ভাইরে আনিয়া দেও’-‘হে ভাত টেবিল রাখতাম খইয়া গেছে-এখনো আমার ভাইয়ে ভাত খাইলো না’- সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের বালিশ্রি গ্রামে তাদের বাড়িতে এমন আহাজারি আর পুরো বাড়িতেই চলছে শোকের মাতম। বোনেরা বিলাপ করছেন। ছোট ভাইদের আফসোস। আর শোকে একেবারে পাথর হয়ে আছেন মিয়াদের বাবা আকলু মিয়া ও তাঁর স্ত্রী (নিহত মিয়াদের মা)।

গতকাল বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের বালিশ্রি গ্রামে নিহত ওমর আহমদ মিয়াদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এমন দৃশ্যপট। শহর থেকে দেখতে যাওয়া বন্ধু-বান্ধব আর স্বজনদের আহাজারিতে পুরো বাড়ি যেন নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
নিহত ওমর আহমদ মিয়াদের বন্ধু, ওলিম্পিয়া কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ফুয়াদ আল আমিন জানান, আসার সময় আন্টিকে (মিয়াদের মাকে) ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে আসতে হয়েছে তাদের। তারা মিয়াদের মাকে সান্তনা দিতে গিয়ে বলেন, ও আন্টি আপনার “মিয়াদের” কিছু হয় নাই, আমরাই আপনার মিয়াদ। আমরাই আপনার সন্তান।

নিহত মিয়াদের বাবা আকলু মিয়া বলেন, গত সোমবার বিকাল সোয়া তিনটার দিকে মিয়াদ তার বোনের মোবাইলে কল দিয়ে বলে, ‘আপু তুমি তো রোজা রেখেছো। বাসায় সবার খাওয়া শেষ হলে আমার খাবার টেবিলে ঢেকে রেখো। আমি বাসায় এসে খাবো।’ এর ঠিক ১৫ মিনিট পর বিকাল সাড়ে ৩টায় মিয়াদের বাবার মোবাইলে গ্রামের বাড়ি থেকে কল করে জানানো হয়- মিয়াদ পায়ে গুলি খেয়েছে। আহতাবস্থায় এখন ওসমানীতে ভর্তি। আপনি হাসপাতালে যান। খবর পেয়ে মিয়াদের বাবা হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তাঁর প্রায় পাগলপ্রায় অবস্থা। ছেলেকে খুঁজতে থাকেন এদিক সেদিক। মিয়াদকে যখন মর্গে নিয়ে যাওয়া হয় তখন তিনি লাশের পাশে ছুটে যান ‘কার লাশ, কার লাশ ‘ বলে। তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে মিয়াদ আর নেই।

মিয়াদের বাবা স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার ছেলেমেয়েরা সিলেট মেসে থেকে লেখাপড়া করতো। দেড় বছর আগে একটি বাসা ভাড়া করি ওদের থাকার জন্য। যাতে সবাই একসাথে থাকতে পারে। ৪ মাস আগে নতুন এই বাসায় ছেলেমেয়েদের তুলে দেই। গত রোববার রাত ৮টায় মিয়াদের সাথে আমার শেষ কথা হয়। তিনি আহাজারি করে বলেন, যে আমার ছেলেকে মারলো সেও তো মানুষ। তাকে তো আল্লাহ মানুষ হিসেবেই সৃষ্টি করেছেন। তার দিলে কি একটুও মায়া দয়া নেই। মারলে তো হাতে বা পায়ে ও মারা যাইতো। বুকে মেরে আমার ছেলেকে নির্দয়ভাবেই মারতে হল। মিয়াদের বন্ধুদের দেখে মিয়াদের বাবা বলেন, তোমাদের মধ্যে আমি আমার মিয়াদকে দেখতে পাই।

সিলেট শহরের উপকণ্ঠের বালুচরের বাড়িতে থাকতেন ছাত্রলীগ কর্মী ওমর আহমদ মিয়াদ। অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে তিনি গত সোমবার বিকেলে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে খুন হন। ৩ ভাই ২ বোনের মধ্যে মিয়াদ ছিলেন ২য়। ভাইদের মধ্যে সবার বড়। বৃস্পতিবার মিয়াদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় কান্নার রোল। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী আর রাজনৈতিক সহকর্মীরা জড়ো হয়েছেন বাড়িটিতে। সকলের চোখেই জল। আর ভাইকে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়ে চলছেন মিয়াদের ভাই-বোনেরা।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের বালিশ্রি গ্রামে তাদের বাড়িতে এমন আহাজারি আর পুরো বাড়িতেই চলছে শোকের মাতম। বোনেরা বিলাপ করছেন, ভাইয়ের সাথে শেষ কথা ও স্মৃতিগুলোর। ছোট ভাইদের আফসোস। আর শোকে একেবারে পাথর হয়ে আছেন মিয়াদের বাবা আকলু মিয়া ও তাঁর স্ত্রী (নিহত মিয়াদের মা)।

উল্লেখ্য, গত সোমবার বিকেলে নগরীর টিলাগড়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপের কর্মীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন ওমর আহমদ মিয়াদ (২৬) নামের এক ছাত্রলীগ কর্মী। এতে আহত হয়েছেন আরও দুই কর্মী। মিয়াদ লিডিং ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ছাত্র।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close