বাউল আব্দুল করিম’র জন্মশতবার্ষিকী: দুইদিন ব্যাপি অনুষ্ঠান শুরু

1সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: যেন সুরের ঢেউ লেগেছে কালনীর পাড়ে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছেন বাউলরা। কেউ মঞ্চে গাইছেন। আবার কেউ চায়ের দোকানেও বসে গাইছেন।
কালনী নদী দিয়ে যাওয়া নৌকার মাঝিরাও সুর মেলাচ্ছেন। সমাজ পরিবর্তনের স্বাপ্নিক লোকশিল্পী একুশে পদক প্রাপ্ত বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক উৎসবের প্রথম দিন সন্ধ্যা সোয়া ৭ টার পরের দৃশ্য ছিল এটি।
দিরাইয়ের উজান ধলের কালনীর পাড়ে বাউল বাউল সম্রাটের দুইদিন ব্যাপি জন্মশতবর্ষ অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে শুক্রবার সন্ধ্যা সোয়া ৭ টায়। শাহ্ আব্দুল করিম জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় পর্ষদের আয়োজনে ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় দিরাইয়ের উজানধল মাঠে দুই দিনের এই উৎসব হচ্ছে।
শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় উৎসবের উদ্বোধন করানো হয় বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম’র পৌত্র ঝলক শাহ্কে দিয়ে। পর শুরু হয় আলোচনা অনুষ্ঠান। শাহ্ আব্দুল করিম’র ছেলে শাহ্ নূর জালাল আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন শাহ্ আব্দুল করিম জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন পরিষদের জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম কদ্দুছ। অতিথি’র বক্তব্য দেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ। বক্তব্য দেন- যুগ্মসচিব ওমর ফারুক, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ঝুনা চৌধুরী, সাংস্কৃতিক সংগঠক শামসুল আলম সেলিম, কামরুল ইসলাম লিটন, শামসুল বাসিত সেরু, শেখ মফিজুর রহমান, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট নাজমুল হাসান, দোলন চৌধুরী প্রমুখ। আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন- আলী আহমদ।
শাহ্ আব্দুল করিম জন্মশতবার্ষিকী জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক গোলাম কদ্দুছ বলেন,‘বাঁচতে হলে শাহ্ আব্দুল করিমের চেতনাকে হৃদয়ে লালন করতে হবে, আমরা যে সময়ে শাহ্ আব্দুল করিম’র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করছি, এই সময়ে জঙ্গীবাদ, মৌলবাদ এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীদের আক্রমনের শিকার হচ্ছে মাতৃভূমিসহ গোটা পৃথিবী। শাহ্ আব্দুল করিমের গানে কথা এখন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। এজন্যই এই আয়োজন। শাহ্ আব্দুল করিম একজন সাধারণ মানুষ নয়। তাঁর কীর্তি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান হচ্ছে অনেক দেশেই।’
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ঝুনা চৌধুরী বলেন,‘শাহ্ আব্দুল করিমের সৃষ্টি আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুন প্রজন্ম যাতে ভুল পথে যেতে না পারে সেজন্য বড় শিক্ষনীয় শাহ্ আব্দুল করিমের গানের কথা। এজন্যই সরকার শাহ্ আব্দুল করিমসহ মরমী সাধকদের গানের কথা পৌঁছে দিতে এমন উৎসবের আয়োজন করেছে।’ তিনি শাহ্ আব্দুল করিম যাদুঘর প্রতিষ্ঠা এবং শাহ্ আব্দুল করিমে নিজের গড়া সঙ্গীতালয়কে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা দেবার দাবী জানান।
১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাউল বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিম। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মানুষকে আনন্দ দেবার পাশপাশি, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসংগতির কথা গানে গানে জানিয়ে গেছেন এই বাউলশিল্পী। নিলোর্ভ-নিরহংকার কিংবদন্তিতুল্য এই বাউল শিল্পী ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। অভাব-অনটন, দুঃখ-দারিদ্রে বেড়ে ওঠা বাউল করিম’র বয়স যখন ১২, রাখালের চাকুরী ছেড়ে গ্রামের পার্শ্ববর্তী ধলবাজারেরর এক মুদির দোকানে কাজ নিলেন। দিনে চাকুরি আর রাতে হাওর-বাঁওরে ঘুরে গান গাওয়ার মধ্য দিয়েই বেড়ে ওঠা তাঁর। গ্রামের নৈশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পড়াশুনা হয়নি করিমের। গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাউলা, ভাটিয়ালি, পালাগান গাইতে গাইতে পুরো ভাটি অঞ্চলে নাম ছড়ায় তাঁর। এরপর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষার লড়াই, কাগমারী সম্মেলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে গণসংগীত গেয়ে গেয়ে লাখ লাখ তরুণকে উজ্জীবিত করেছেন এই মরমী বাউল। গান গাওয়ার জন্য ধর্মান্ধদের হাতে নির্যাতিত ও ঘর ছাড়া হলেও মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান প্রচার করেছেন গানে গানে।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close