তারা নকল তারকা!

3 ডেস্ক রিপোর্ট: কলকাতার অখ্যাত শিল্পীরা যখন নিজেদের ক্যারিয়ারের আর্থিক সঙ্গতির জন্য বাংলাদেশের প্রযোজকদের সাথে লবিং করছেন। ঠিক সে সময় আমাদের দেশের শিল্পীরাও সেই সব অখ্যাত সঙ্গীত পরিচালকদের হাত ধরে নতুন করে হিট হবার স্বপ্ন বুনছেন। মূলত ক্যারিয়ারে হতাশাগ্রস্ত শিল্পীরাই এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন। ক্যারিয়ারে একের পর এক সুর নকল কিংবা নিজের মিউজিক ভিডিও নকল করছেন অনেক শিল্পী। তাদেরকে আবার তারকা খ্যাতি দেয়া হয়েছে। তরুণ শিল্পীদের ভেতরে এই গুটিকতক শিল্পীরা ডোবাচ্ছেন গোটা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ইমেজ। এটা অধিকাংশ সিনিয়র শিল্পীরা এ নিয়ে লজ্জা আর ঘৃণা প্রকাশ করেছেন।

এই সময়ে আলোচিত কণ্ঠশিল্পী ইমরান মাহমুদুল নতুন করে সমালোচনায় এসেছেন তার নতুন প্রকাশিত একটি গানের মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করে। গানটি প্রশংসিত হলেও ইমরানের এই গানটির ভিডিওটি নকলের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। ইমরান ছাড়াও পড়শী, বেলাল খান, আরেফিন রুমী কনাসহ অনেকেই বিরুদ্ধেই নকলের অভিযোগ রয়েছে।

গায়ক ইমরানের ক্যারিয়ারের শুরু একটি রিয়েলিটি শো থেকে। আমেরিকা সফরে বিভিন্ন অনৈতিক কাজের স্বাক্ষী হিসেবে যখন বাংলাদেশি কমিউনিটিকে লজ্জায় ফেলে দেয় ইমরান, তখনও তা নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। বিটিভির এক অনুষ্ঠানে ইমরান দেশ বরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের সাথেই বেয়াদবি করে বসেন। তা নিয়ে শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনও পত্রিকায় স্টেটমেন্ট দিয়েছিলেন।

নিজের মিউজিক ভিডিও নকলের খবরে আত্মপক্ষ সমর্থন করে ইমরান বলছেন, ‘এসব কিছু নয়। এর চেয়েও অনেক বড় নকল হয়েছে আর এরকম ভিডিও বানানো এখানে এই প্রথম নয়। অনেক কিছুই আছে যা হুবহু নকল করে বানানো হয়।’

অন্য বড় চুরির উদাহরণ দিয়ে নিজে বাঁচার চেষ্টা করছেন। সাম্প্রতিক মিউজিক ভিডিও নকলের বিতর্কে খোদ শিল্পীই সেটিকে আরো যুক্তিযুক্ত করানোর চেষ্টা করেন। আর এ ধরণের চর্চায় আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির প্রতি সাধারণ দর্শকদের যে সম্মান তা নিয়েও আজ প্রশ্নের সম্মুখীন হত হচ্ছে অনেককেই।

সম্প্রতি বেলাল খান নিজের ক্যারিয়ারে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত হলেও এই তরুণ কন্ঠশিল্পীও তার সাম্প্রতিক মিউজিক ভিডিওতে যে ন্যাক্কারজনক অশ্লীলতা আর নকলবাজি দেখিয়েছেন তা নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল সামাজিক ওয়েবসাইটে। তরুণ শিল্পীদের ভেতরে এই গুটিকতক শিল্পীরা ডোবাচ্ছেন গোটা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির ইমেজ। এটা অধিকাংশ সিনিয়র শিল্পীরা এ নিয়ে লজ্জা আর ঘৃণা প্রকাশ করেছেন।

আরেফিন রুমীর ব্যক্তিগত জীবনের বিশৃঙ্খলা নিয়ে ঔদ্ধত্ত্ব আচরণ। দুরবীন ব্যান্ডের শহীদের হাত ধরে যে রুমী ইন্ডাস্ট্রিতে আসে পরে তার সাথেই নানামূখী প্রতারণা, একের পর এক নকল সুরের কাজ এসবের কারণে বাজার চলতি ইউটিউব হিট বাড়ছে। কিন্তু সঙ্গীতকে পেশা করে যে আত্মমর্যাদায় তরুণরা কথা বলতে পারতো একসময় সেই সম্মানের অবস্থান আজ ধুলোয় মিটিয়ে দিয়েছেন গুটিকতক শিল্পী।

দেশের বাইরে গায়িকা পড়শী নিজের অডিয়েন্স মাতাতে না পেরে ‘লুঙ্গি ড্যান্স গাওয়া শুরু করেন, কাণ্ডজ্ঞ্যানবিবর্জিত হয়েই। তার ভিডিও সাধারণ দর্শকেরা আপলোড করে নিন্দা জানান। কতটা সম্মান তারা বয়ে নিয়ে আসেন বিদেশের মাটিতে!

অন্যদিকে মিউজিক ভিডিও কালচারে সম্প্রতি গায়িকা কনা ভারতীয় একটি গানের হুবহু নকলের পরও পত্রিকায় দুঃখ প্রকাশের বিপরীতে সেটিকে জাস্টিফাই করার জন্য ঔদ্ধত্বের মতো আচরণ করেন। সাংবাদিকদের তার প্রতিপক্ষ বলে জ্ঞান দেন। এই যখন ইন্ডাষ্ট্রির গায়ক-গায়িকাদের আচরণ,  সঙ্গীত সমাজে যখন চোরের মা’দেরই বড় গলা- তখন পরবর্তী নতুনেরা যে সেই চৌর্যবৃত্তিকেই নিজের নিছক জনপ্রিয়তার অপকৌশল ভাববেন, এটাই তো স্বাভাবিক। তাই সঙ্গীতের অবক্ষয়ের শেকড়ে গুটিকতক কাণ্ডজ্ঞানহীন কণ্ঠবিক্রেতা দায়ী।

ইন্ডাষ্ট্রিকে কলুষিত করছে আজ এসব শিল্পীরাই। অনেকেই মিউজিক ভিডিও মেকারদের ওপরে দোষ চাপিয়ে নিজেরে ভারমুক্ত করছেন। আদতে নির্মাতারা এই নকলবাজের জন্য অপরাধী হলেও মূল লগ্নিকারী বা পরিকল্পক তো শিল্পী নিজেই।

সর্বাধিক নকল ভিডিও নির্মাতা হিসেবে চন্দন চৌধুরী আজ রেকর্ডের খাতায় নাম লেখাতে চলেছেন। অথচ কেন শিল্পীরা তাকে দিয়ে সেটি করাচ্ছেন সেটিও প্রশ্ন সাপেক্ষ। আর যে কোনো অন্যায়ের প্রশ্রয় দিলে তার অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নৈতিকতার অবক্ষয় যে ঘটে থাকে, তা-ই দেখছে আজকের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি।

এমন অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে তথাকথিত জনপ্রিয় গায়করা পথ হাঁটার পরও একাধিক মিডিয়ার কল্যাণ অকল্যাণর ফাঁক গলেই পার পেয়ে যায় তারা। আর ফেসবুক বা ইউটিউবে তো এখন ডলার খরচ করলেই নিজের হিট কেনা যায়। এই স্থুল প্রতিযোযোগিতার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর আজ তারা।

তাই অধিকাংশ সিনিয়র শিল্পীরা এসব বিতর্কের আলোচনায় লজ্জায় নিজেদের চোখ কান ঢাকেন। দেশের বাইরে বা ঢাকার বাইরে কোনো মফস্বলে আরেফিন রুমী উচ্ছৃঙ্খল জীবন, কনা, ইমরানদের এই বেয়াদবী আচরণ কিংবা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত কোনো গায়কের ভিডিও যখন এতটা অশ্লীল নোংরামিতে ছেঁয়ে যায় তখন তাদেরকেও সাধারণ বিবেকবান মানুষের নানান কথা শুনতে হয়। আজ ধারাবাহিকভাবে সেই অবক্ষয়ের পথেই এই মিউজিক ইন্ডাষ্ট্রি।

Sharing is caring!

Loading...
Open

Close