“বাংলাকে অপমান করা হলে জীবন দিয়ে রুখবো : মমতা

অসমে নাগরিক পঞ্জিকরণের সময় থেকেই হাতে খড়ি শুরু হয়েছিল। লোকসভা ভোটের পর সেই লাইন ধরে আরও দ্রুত গতিতে যেন হাঁটা লাগালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।সেটা হচ্ছে- পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি আক্রান্ত, সমূহ বিপদের মুখে বাংলা।

নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ- দুই গুজরাতি রাজনীতিক বাংলা দখল করতে চাইছেন, বাঙালি আবেগ দিয়ে তা রুখে দিতে হবে।

মঙ্গলবার হেয়ার স্কুল চত্বরে বিদ্যাসাগরের নতুন আবক্ষ মূর্তি উন্মোচনের সরকারি অনুষ্ঠান ছিল। ওই মঞ্চ থেকেও মুখ্যমন্ত্রীর কথায় বারা বার ঝরে পড়ল মোদ্দা এই বার্তাই।

বিদ্বজ্জন পরিবৃত হয়ে ওই সভায় মুখ্যমন্ত্রী এ দিন বলেন, “বাংলাকে অপমান করা হলে বা রাজ্য থেকে বাঙালি খেদানোর চেষ্টা হলে, তিনি জীবন দিয়ে রুখবেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “তাতে আমি বাঁচি মরি, কিছু যায় আসে না। নিজের প্রতি আমার কোনও দয়া মায়া নেই।

কিন্তু বাংলার সংস্কৃতিতে কোনও আঘাত বরদাস্ত করব না”। এখানেই তিনি থামেননি। এও বলেন, বাংলাকে গুজরাত হতে দেব না। গুজরাতকে আমি ভালবাসি। কিন্তু গুজরাত আর বাংলা এক নয়!

গোটা ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে। লোকসভা নির্বাচনের শেষ দফার ভোট গ্রহণের আগে কলকাতায় রোড শো করেছিলেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। তাঁর রোড শো চলাকালীন ধুন্ধুমার হয়েছিল বিদ্যাসাগর কলেজে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের একটি মূর্তিও ভাঙা হয়েছিল ওই সংঘর্ষে।

বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ওই ঘটনাকে বাংলার সংস্কৃতি ও চিন্তার উপর আঘাত বলে তার পর থেকেই জোরদার প্রচারে নেমে পড়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে তিনি এও বলতে শুরু করেছিলেন, বাংলার বাইরে থেকে রোড শো-র জন্য লোক এনেছিল বিজেপি। তারাই ভেঙেছে বিদ্যাসাগরের মূর্তি।

তাৎপর্যপূর্ণ হল, ওই ঘটনার পর শেষ দফায় যে ৯টি আসনে ভোট গ্রহণ হয়েছিল, তার সব কটিতেই জিতেছে তৃণমূল। তাতে শাসক দলের শীর্ষ স্তরে এই ধারনা এখন বদ্ধমূল হয়েছে যে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙারই খেসারত দিতে হয়েছে গেরুয়া শিবিরকে। ফলে এখন বাংলা ও বাঙালি লাইন আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে চাইছে রাজ্যের শাসক দল।

তৃণমূলের সেই রাজনৈতিক কৌশল এ দিন পুরোদস্তুর ধরা পড়ে হেয়ার স্কুলে অনুষ্ঠানের ছবিতে। সরকারি অনুষ্ঠান হলেও মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতা ছিল এ দিন ষোলো আনা রাজনৈতিক। কখনও তিনি বাংলার রাজনৈতিক হিংসার ঘটনার কথা বলেন।

কখনও রাজ্যপালের সমালোচনা করেন। কখনও আবার গেরুয়া শিবিরকে হুঁশিয়ার করে বলেন,“বাংলা ছেলের হাতের মোয়া নয়। এখানে যা ইচ্ছে তাই করা যায় না। বাংলাকে ভুলিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে।”

এখানেই থামেননি মুখ্যমন্ত্রী। সংখ্যালঘুদের নিয়ে রাজনীতির প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তৃতায়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা বাঙালি নই? আমরা হিন্দু নই? কিছু বললেই বলছে মুসলমান তোষণ করি। এই যে মঞ্চে আবুল বাশার বসে আছেন। তাঁকে বলব আপনি চলে যান? আমি থাকি আর না থাকি (পড়ুন সরকারে) ওই কাজ আমাকে দিয়ে করাতে পারবে না।”

প্রাদেশিকতা বাদের রাজনীতি এ দেশে নতুন নয়। এক সময়ে বালা সাহেব ঠাকরে সেই রাজনীতি করে সফল হয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতেও প্রাদেশিকতাবাদ ভরপুর বাস্তব। বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে। এখন প্রশ্ন হল, বাংলাতেও কি সেই রাজনীতি ফল দেবে?

অনেকের মতে, এ ব্যাপারে এখনই শেষ কথা বলার সময় আসেনি। তার প্রমাণ পাওয়া যাবে দু’বছর বাদে ভোটে। তবে মমতার এই কৌশল আন্দাজ করে বিজেপি-ও পাল্টা আক্রমণে নেমে পড়েছে এ দিন।

ভোটে প্রচারে এসে নরেন্দ্র মোদীই ঘোষণা করেছিলেন যে বাংলায় বিদ্যাসাগরের একটি ভব্য মন্দির গড়ে দেবে কেন্দ্রের সরকার। এ দিন, বিজেপি মুখপাত্র সায়ন্তন বসু বলেন, বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তৃণমূলের কোনও সম্পর্ক রয়েছে? কেউ এমন দাবি করতে পারবে?

যে মুখ্যমন্ত্রী দেশের প্রধানমন্ত্রীকে তুই তোকারি বলে সম্বোধন করেন, তাঁর মুখে বাংলার সংস্কৃতির কথা মানায়? বিদ্যাসাগর কলেজে যে দলের ছাত্র সংগঠন ভর্তির সিন্ডিকেট চালিয়েছে, যে দলের ছাত্র নেতারা কলেজে কলেজে অধ্যক্ষকে মারধর করে, কলেজের শিক্ষিকা জগ ছুঁড়ে মারে, তাদের মানুষ চিনে গেছে। দিদিমণির এই রাজনীতিতে চিড়ে ভিজবে না।

Sharing is caring!

Loading...
Open