শ্রীমঙ্গল শহরে সবচেয়ে বেশি নারী রাইডার

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা:: পরিবারের কাছে মৌলভীবাজারের অনেক মেয়ের বায়না একটি বাইসাইকেল। মেয়ের আগ্রহের কারণে পরিবারও কিনে দিচ্ছে। তাই মেয়েদের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে সাইকেল রাইড। জেলাশহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় মেয়েদের সাইকেল চালাতে দেখা যায় প্রতিদিন।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৩টি বড় সাইক্লিং গ্রুপ আছে। গ্রুপ ছাড়াও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে সাইকেল রাইডের সাথে যুক্ত হচ্ছেন। ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মেয়েরা। বর্তমান প্রজন্মের নারীরা ভয়কে জয় করেছে, সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে ছেলেবন্ধুর পাশাপাশি ঘরের বাইরে নিজেকে আবিষ্কার করছে। এতে নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে। সমান অধিকার কাগজে নয় বাস্তবে, তা সে উপলব্ধি করছে।

পৌর এলাকার সাইকেল রাইডার অনুরাধা রায় অর্পা বলেন, ‘বড় ভাইকে প্রতিদিন সাইকেল নিয়ে রাইডে যেতে দেখতাম। তা দেখে আমার খুব আফসোস হতো। একদিন তাকে বললাম আমি তার সাথে রাইডে যাব। সে-ও রাজি হলো। প্রতিদিন ভোরে ভাইয়ের সাথে সাইকেল চালানো শিখতে বের হতাম। শেখার পর প্রথম প্রথম ভাইয়ের সাথে রাইডে যেতাম। এখন মেয়েরা মিলে বা কখনো একা একা রাইডে যাই।’

রাইডারদের বাইরেও প্রয়োজনের তাগিদে প্রায় ৬শ’ নারী সাইকেল চালাচ্ছেন কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ উপজেলায়। এই দুই উপজেলার পাহাড়ি প্রত্যন্ত এলাকার ছাত্রীরা ৩-৪ কিলোমিটার দূর থেকে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারত না। প্রচুর হাঁটতে হতো। তার ওপর আসা-যাওয়ার পথে বখাটেদের ভয় ছিল। সরকারি উদ্যোগে সাইকেল পেয়ে প্রত্যন্ত এলাকার ছাত্রীদের মুখে এখন আত্মবিশ্বাসের ছাপ। তাদের দেখে উৎসাহিত হচ্ছে অন্যরাও। এ উদ্যোগ নারী শিক্ষার অগ্রগতি ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্র প্রসারিত করবে বলে ধারণা সচেতন মহলের। শুধু কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাই স্কুলে এখন পর্যন্ত ৫শ’ ছাত্রীকে সাইকেল দেওয়া হয়েছে। উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে এ প্রকল্প চলমান রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দরিদ্র ছাত্রীরা পাচ্ছে বাইসাইকেল। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন।

শুধু সাইক্লিং নয়, প্রয়োজনীয় কাজটুকু সারতেও মেয়েরা সাইকেল নিয়ে যাতায়াত করে। সবচেয়ে বেশি নারী রাইডার শ্রীমঙ্গল শহরে। ট্রাফিক জ্যামের মধ্যদিয়েই সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে নারী রাইডার। শুধু সাইকেলই নয়, কেউ কেউ বলছেন- আরেকটু বড় হয়ে স্কুটার বাইক চালানোরও ইচ্ছে তাদের। মায়েরা সবসময়ই মেয়েদের একটু অন্যরকম ইচ্ছার প্রতি সমর্থন দিলেও বাবারা উদ্বিগ্ন থাকেন। কেউ কেউ সন্তানের বায়নাকে শঙ্কা বা অজুহাত দেখিয়ে ফিরিয়ে দিলেও অনেক বাবা নিজ থেকেই সন্তানকে উৎসাহ দিচ্ছেন।

শ্রীমঙ্গলের রাইডার কলেজ শিক্ষার্থী শাহিনুর ইসলাম কিরণ বলেন, ‘সাইকেল চালানোর উৎসাহ প্রথমে বাবাই আমাকে দিয়েছেন। কখনো তিনি বলেননি, তুমি মেয়ে তাই সাইকেল চালাতে পারবে না। পরিবার সবসময় আমার সাইকেলের জন্য সহযোগিতা করছে। আমি ধন্যবাদ জানাই সিওএসকে, যারা মেয়েদের জন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে। পরিবার থেকে প্রথমে সমর্থন না পাওয়া কলেজ শিক্ষার্থী প্রিমিন্দিতা বৈদ্য ঐশি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে সাইক্লিং করার ইচ্ছে ছিল। ছোটবেলায় ছোট ভাই আমাকে সাইক্লিং শিখিয়েছে। একাদশে ভর্তি হওয়ার পর সাইক্লিংয়ে আসি। পরিবার থেকে কোন সহযোগিতা পাইনি। আমি নিজ থেকে এসেছি। গ্রুপের সবাই আমাকে সহযোগিতা করেছে। তাদের অনেক ধন্যবাদ জানাই।’

জানা যায়, নারীদের রাইডের ব্যাপারে ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ থেকেই উৎসাহ পাচ্ছেন তারা। এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার সাইক্লিং কমিউনিটির (এমসিসি) অ্যাডমিন শুভ রায় বলেন, ‘মানসিক বিকাশের জন্য সাইক্লিং অন্যতম মাধ্যম। এতে শারীরিক ব্যায়ামের সাথে তারা আত্মবিশ্বাসী হচ্ছেন। তারা সমান অধিকার উপলব্ধি করতে পারছেন। সে বাইরের জগত থেকে বাস্তবতার আলোকে অনেক কিছু শিখতে পারছে।’জেন্ডার বিভেদ নিয়ে জাতিসংঘের একটি প্রোগ্রামে কাজ করা ইফফাত নিপা বলেন, ‘এখন নারীরা ঘর থেকে বের হচ্ছে। বাইরের জগৎ দেখছে, জানছে এবং বুঝতে পারছে। ফলে তার মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মেয়েরা সাইক্লিং করছে, এটা সত্যিই খুব ভালো দিক।’

মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালের চিকিৎসক মো. আবু ইমরান বলেন, ‘সাইক্লিং ভালো লাগা বাড়ায়, বিষণ্নতা কমায়, আত্মবিশ্বাস, কর্মোদ্দীপনা বাড়ায়, ওজন কমাতে সহায়তা করে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়, ঘুমের সমস্যা দূর হয়, মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।’

Sharing is caring!

Loading...
Open