সমুদ্রপথে বিদেশে যেতে দশ বছরে ১০ হাজার বাংলাদেশির সলিল সমাধি


সুরমা টাইমস ডেস্কঃঃ উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে ৭-৮ লাখ মানুষ।

কেউ যাচ্ছে বৈধ পথে, কেউ বা অবৈধ উপায়ে।

অবৈধ উপায়ে দালাল ধরে যারা বিদেশে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যায়।

সমুদ্রপথে বিদেশে যেতে গিয়ে সলিল সমাধি হচ্ছে সমুদ্রের বুকেই।

শনিবার লিবিয়া থেকে ইতালি যাবার পথে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরেছে ৬০ জন অভিবাসী।
এর মধ্যে কমপক্ষে ৩৫ জনই বাংলাদেশি।

এভাবে প্রতিবছরই সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি নিহত হচ্ছে।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্য মতে ১০ বছরে সমুদ্রপথে বিদেশ যেতে বাংলাদেশি নিহত বা নিখোঁজ হয়েছে ১০ হাজার।

পাচার হয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ। আর বিদেশি কারাগারে বাংলাদেশি বন্দি রয়েছে ১৫ হাজারেরও বেশি। অবৈধভাবে অনুপ্রবেশসহ বিভিন্ন কারণে বন্দি আছে তারা।

জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশি বিদেশে যায় ২০১৫ সালে।

বছরটিতে বঙ্গোপসাগর রুট ব্যবহার করে অন্তত ৯৪ হাজার অভিবাসন প্রত্যাশী পাচার হয়েছে, যারা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের অধিবাসী। এদের মধ্যে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি সমুদ্রেই মারা গেছে।

জনশক্তি বিষয়ক গবেষকরা বলছেন, বিদেশে চাকরির আশায় সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে নিহত হবার দায় সরকার, দালাল এবং যারা যাচ্ছে তাদেরও আছে।

এ বিষয়ে রামরুর চেয়ারম্যান প্রফেসর তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘যারা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন তারা বেশিরভাগ সময়ই প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

তবে এই প্রতারণার দায়ভার শুধু দালালদের কাঁধে দেওয়ার সুযোগ নেই। এর দায় যেমন রাষ্ট্রকেও নিতে হবে, তেমনি নিতে হবে যারা যাচ্ছে তাদেরকেও। অবশ্য রাষ্ট্রকে মূল দায়ভার নিতে হবে।

কোথায়, কীভাবে মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছে তা খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে। বিদেশে যেতে ব্যর্থ হওয়া ১৯ শতাংশকে শূন্যতে নামিয়ে আনতে হবে। এ জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতা বাড়ানো এবং দালালদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ‘সমুদ্রপথে অবৈধভাবে অভিবাসনের কারণ, ধরন ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮১ শতাংশ বিমানযোগে ও ০.২১ শতাংশ সড়কপথে বিদেশে যায়। বাকি প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ বিপজ্জনক সমুদ্রপথ ব্যবহার করে বিদেশে পাড়ি দেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শ্রমিকদের ১০.৩৬ শতাংশ যাওয়ার সময় সীমান্তে আটক হয়, ৪৭.৫০ শতাংশ চরম মানসিক যন্ত্রণায় সময় পার করে, ১০ শতাংশ জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দেয়। একটি অংশকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়, পরে তাদের অনেককে উদ্ধার করা হয়, অনেকে সমুদ্রে তলিয়ে যায়।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার আগে টাকা দেওয়ার পরও শ্রমিকদের ৬৩.৯২ শতাংশ অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে যাওয়ার বিষয়ে, ২৩.৯২ শতাংশকে অগ্রিম টাকা দিতে হয়, ১৭.৫০ শতাংশের কাছে দফায় দফায় টাকা চাওয়া হয়, ১০.৩৬ শতাংশের টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় দালাল চক্র।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সমুদ্রপথে বিদেশ যাওয়া শ্রমিকদের ৩৮.৯৬ শতাংশ নিয়মিত বেতন পায় না, ১৪.০৬ শতাংশ জেল খাটে, ২৮.৫১ শতাংশকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়, ১৫.২৬ শতাংশ বাইরে যেতে পারে না, ২৩.৭০ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, ১০.৮৪ শতাংশের কাজের নিশ্চয়তা থাকে না এবং খাওয়া-দাওয়া ও স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগতে হয় ২১.২৮ শতাংশ শ্রমিককে।

রামরুর তথ্য মতে, ২০১২ সালে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন করার পর ৭ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিদেশে যাবার ঘটনা ঘটে ২০১৪-১৫ সালে। এ সময় বাংলাদেশির পাশাপাশি অনেক রোহিঙ্গাও সমুদ্রপথে পাড়ি জমায়। ২০১৫ সালের জুন মাসে নৌকায় করে মালয়েশিয়ায় প্রবেশের সময় কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি আটক হয়। সে সময় থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় গণকবরে অভিবাসীদের লাশের সন্ধান পাওয়া গেলে নৌকায় মানবপাচারের সংবাদ উঠে আসে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। সেই সময় দ্য ইকোনমিস্টের খবরে উল্লেখ করা হয়, আন্দামান সাগরে ভাসমান অভিবাসীদের অর্ধেকই ছিল বাংলাদেশি। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, নৌকায় করে থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া পাড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়া মানুষের ৪০ শতাংশই ছিল বাংলাদেশি।

এ রকমভাবে ২০১৪-১৫ সালের পুরোটা সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার সময় আটকের ঘটনার খবর বিশ্বব্যাপী আলোচনার ঝড় ওঠে। প্রশ্ন দেখা দেয় কেন মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে বিদেশ যেতে চায়।

এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার অবারিত সুযোগ না থাকা এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যেতে জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছপা হচ্ছে না মানুষ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) মহাসচিব নোমান আহমেদ চৌধুরী বলেন, বেশিরভাগ সময় দালালের খপ্পরে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিদেশে যাচ্ছে মানুষ। পরিবার-পরিজন ছেড়ে যাওয়া এসব অভিবাসী এক প্রকার অসহায় জীবনযাপন করে বিদেশে। নিয়োগদাতা দেশ যেমন তাদের প্রতি সহায় নয়, তেমনি অনেকে তার নিজ দেশের পক্ষ থেকেই পাচ্ছে না আশানুরূপ সহযোগিতা। প্রায় প্রত্যেক মাসেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে অভিবাসীদের নির্যাতনের খবর আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই দূতাবাস জানাতে পারছে না বা জানলেও আশানুরূপ সহযোগিতা পাচ্ছে না।

বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়, প্রতি মাসেই এক বা একাধিক ট্রিপে রাতের আঁধারে ট্রলারে বা নৌকায় চেপে টেকনাফ, সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজারের উপক‚লীয় দ্বীপ থেকে মালয়েশিয়ার পথে রওনা হয় শত শত মানুষ। মানবপাচারকারীরা সারা দেশে ফাঁদ পেতে এজেন্টদের মাধ্যমে সংগ্রহ করছে বিদেশ গমনেচ্ছু এসব অসহায় দরিদ্র ব্যক্তিদের।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশি নাগরিকদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা বলে ট্রলারে তোলার আগে প্রতিজনের কাছ থেকে ৪০-৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয় পাচারকারী চক্র। এরপর সাগরের মাঝপথে বা থাইল্যান্ডের জঙ্গলে তাদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে জনপ্রতি ২-৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে।

সর্বশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেও কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া থেকে সমুদ্রপথে পাচারকালে ৫০ জনকে উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ নিয়ে চলতি বছরে ৪ মাসে ৫৭০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন দালালকেও আটক করা হয়।

একই সময় ইন্দোনেশিয়ায় উদ্ধার করা হয়েছে ২৫০ বাংলাদেশিকে। যারা সমুদ্রপথে পাচারের শিকার হয়েছে। মালয়েশিয়ায় কাজ দেওয়ার কথা বলে পাচারকারীরা তাদের সেখানে আটকে রাখে বলে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানায়।

বাংলাদেশে নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কাজ করছে এমন সংগঠনগুলো বলছে, সাগরপথে মানবপাচারের ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যার সমাধান করতে হলে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার পথ সহজ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেশি সেখান থেকে লোক পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কর্মী প্রেরণ ও মানবপাচার রোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদও দিয়েছেন তারা। সেই সঙ্গে দালালদের দৌরাত্ম্য রোধে রাষ্ট্রকে কঠোর ভ‚মিকা রাখতে হবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open