মরণনেশা ইয়াবার ধোঁয়ায় ভাসছে সিলেট!

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:: ‘ইয়াবা (থাই:ভাষায় যার অর্থ পাগলা ঔষধ) একধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট। এটি মূলত মেথঅ্যাম্ফিটামিন ও ক্যাফেইন এর মিশ্রন। কখনো কখনো এর সাথে হেরোইন মেশানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি খাওয়ার বড়ি হিসাবে সেবন করা হয়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধাতব ফয়েলে পুড়িয়ে ধোঁয়া হিসাবেও এটিকে সেবন করা হয়ে থাকে। ইয়াবা প্রধান উপাদান মেথঅ্যাম্ফিটামিন ও ক্যাফেইন। এটি উত্তেজক (স্টিমুল্যান্ট) মাদক দ্রব্য। মেথঅ্যাম্ফিটামিন জাতীয় মাদক ডাকতারের অনুমতিতে এডিএইচডি জাতীয় রোগে কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ হিসাবে দেওয়া হতে পারে, তবে ইয়াবা ওষুধ হিসাবে ব্যবহারের মত বিশুদ্ধও নয় এবং উত্তেজক নেশার ভয়ানক মাত্রা ও স্বাস্থ্যের ক্ষতির ক্ষমতার জন্য এটি ওষুধ হিসাবে ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। এটি খেলে অনেক ধরণের সমস্যা হয় যেমন গায়ের চামড়ার নিচে কোনো পোকামাকড় নড়াচড়া করে মনে হয়। সিলেটে তিন ধরনের ইয়াবা টেবলেট পাওয়া যায়। প্রথম ধরনের ইয়াবা ট্যাবলেটের বেশির ভাগ সবুজ বা গোলাপি রঙের হয়। এর ঘ্রাণ অনেকটা বিস্কুটের মত হয়ে থাকে। দ্বিতীয় ধরনেন ইয়াবা ট্যাবলেট এর দাম তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এটিও নেশাসৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। তৃতীয়ধরনের ট্যাবলেটি আরও সস্তা এবং নেশায় আষক্তদের নিকট এটি ভেজাল বলে পরিচিত।ইয়াবা সেবনকারীদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা অনুসারে, চিতা নামের পিলটি সবচেয়ে নিম্নমানের ইয়াবা পিল হিসেবে গণ্য হয়। এর গায়ে ক্ষুদ্র চিহ্ন থাকে। অন্যদিকে গোলাপ জল নামের ইয়াবা পিলকে উচ্চ মান পিল হিসেবে গণ্য করা হয়। ইয়াবা পিলের গায়ে ইংরেজি ডাব্লিউ ওয়াই (WY) লেখা থাকে। ওয়াই (Y) লেখার ধরন দীর্ঘ হলে এবং ইয়াবার রঙ পুরোপুরি গোলাপি হলে ধারণা করা হয় সেটি ইয়াবা হিসেবে দেখা ভাল মানের। প্রশাসনের কঠোর নজরদারী থাকা সত্ত্বেও সিলেটে হাত বাড়ালেই যেন মিলছে ইয়াবা। পুরুষের পাশাপাশি মহিলা, পুলিশের সোর্স এমনকি পুলিশ প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য গোপনে জড়িত থাকায় মূলত সহজলভ্য হয়ে উঠছে এসব মাদকদ্রব্য। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় সিলেটে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা তৎপর। তবে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর মনোভাবে দেশজুড়ে ইয়াবার প্রকোপ কিছুটা কমলেও বর্তমানে সিলেটে ইয়াবায় সয়লাব।

গত ২৭শে জানুয়ারি রাতে সিলেট নগরের দাড়িয়াপাড়া এলাকায় জোরপূর্বক ইয়াবা সেবনের মাধ্যমে শিশুদের দিয়ে পতিতাবৃত্তি করানো ও ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে ৭ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. রোকন উদ্দিন ভূঁইয়া (৪০) ও রিমা বেগম (৩৫) নামের এক নারীকে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটলিয়ন (Rapid Action Battalion) বা র‌্যাব -৯।

এরা দুজন ভুয়া স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে নগরীর দাড়িয়াপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে মাদক ব্যবসা করে আসছিলেন। র‌্যাবের ওই অভিযানে তাদের বাসা থেকে ৬০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ও তাদের কাছে বন্দি থাকা দুই শিশুকে উদ্ধার করে র‌্যাব। পরে মানবপাচার ও মাদক আইনে র্যাব-৯ এর করা দুটি মামলায় পুলিশের এসআইসহ দুজনকে আটক দেখিয়ে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর বিচারিক হাকিম আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয় ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট ও আশেপাশের সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে কোম্পানীগঞ্জ, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ, জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার হয়ে সিলেট শহরে কাষ্টঘর ও দক্ষিণ সুরমা এলাকাকে কেন্দ্র করে চলছে ইয়াবার মূল ব্যবসা। সিলেট শহরের উঠতি বয়সী, প্রবাসীদের ছেলেমেয়ে ও রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা কিশোররা, বড়লোক বাবা-মায়ের বখে যাওয়া সন্তানই ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মূল টার্গেট।

ইয়াবা ব্যবসায়ীরা বাসায় হোম ডেলিভারির পাশাপাশি সিলেটের বিভিন্ন হোটেলে কর্তৃপক্ষের কিংবা হোটেল বয়ের মাধ্যমে পর্যটকদের কাছে ডেলিভারি করছে তারা। পুরুষ-মহিলার পাশাপাশি পুলিশের সোর্স জড়িত থাকায় ইয়াবা ব্যবসায়ীরা থাকছে ধরাছোয়ার বাইরে। পুলিশের এসব সোর্স কতিপয় কয়েকজন পুলিশ সদস্যের যোগসাজশে এমন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।তবে, এ বছরের শুরু থেকেই সিলেটে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে হার্ডলাইনে প্রশাসন। গত দুই মাসে সিলেট মহানগর পুলিশের অভিযানের পরিসংখ্যান থেকে অন্তত তা স্পষ্ট বুঝা যায়।

এসএমপি সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে শুধু মহানগর পুলিশ কর্তৃক অভিযান পরিচালনা করে ১৪৬ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি এই দুই মাসে এসএমপির ছয়টি থানায় ৯৯টি মামলার এসব আসামির বেশিরভাগই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। পুরুষ ব্যবসায়ীর সঙ্গে বেশ কয়েকজন মহিলাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

এ বছরে এ পর্যন্ত সিলেট মহানগর পুলিশের অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ৫ হাজার ৪৪২ পিস ইয়াবা, ৫ গ্রাম হেরোইন, ৭ কেজি গাজা, ৭৩ বোতল ফেন্সিডিল, ৬৫১ লিটার চোলাই মদ, ৮০০ লিটার চোলাই মদ তৈরির উপকরণ এবং ২৫ বোতল বিয়ার।

এব্যাপারে সিলেটের মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) জেদান আল মূসা জানান, সিলেটে মাদকের প্রকোপ কমাতে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ। সিলেটে গত দুই মাসে আমরা বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে গ্রেফতার করেছি প্রায় দেড় শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীকে। ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীদের প্রতি আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। কোনো অবস্থাতেই মাদক ব্যবসায়ী এবং তাদের গডফাদাররাও ছাড় পাবে না।

তিনি আরও জানান, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে এবং মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কাজ করে যাচ্ছে। গত দুই মাসে তাদের অভিযানেও গ্রেফতার হয়েছে অনেক মাদক ব্যবসায়ী।

তিনি জানান, অবৈধ মাদকের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া অভিযান চলছে। এরই মধ্যে বিপুল সংখ্যক মাদক জব্দ করা হয়েছে। এটি ভালো অবস্থায় না আসা পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সিলেটে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পুলিশের সোর্স কিংবা সিলেটে বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়িতে দায়িত্বরত অনেক পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কি-না এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পুলিশের এই মুখপাত্র বলেন, সিলেটে পুলিশের কোনো সদস্য ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কি-না তা বলতে পারছি না। তবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক না কেন এ ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুশীলন করব। কোনো পুলিশ সদস্য যদি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open