অগ্নিঝরা মার্চ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চিরজাগরূক থাকুক


মার্চ মাস বাঙালির জাতীয় জীবনে একই সঙ্গে আনন্দ-বেদনার এবং রক্তস্নাত নবজন্মের। মার্চ যেমন স্বাধীনতার মাস তেমনিভাবে গৌরবেরও। বাঙালির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার এ মাস অনন্য এক মাইলফলক স্পর্শ করে আছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাস, শাসন-শোষণ, বাঙালির বঞ্চনা, প্রতিরোধ-সংগ্রাম এবং অবশ্যম্ভাবী মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশল সুস্পষ্ট, দ্বিধাহীন ও প্রাঞ্জল ভাষায় ব্যক্ত করেছিলেন।

অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক আন্দোলনে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দুটি মাস ফেব্রম্নয়ারি ও মার্চ। এ মাস দুটি চিরস্থায়ীভাবে মুদ্রিত হয়ে আছে বাঙালির জীবনে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চূড়ান্ত পদক্ষেপ শুরু হয় এ মাসের সূচনার দিকে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০- টানা ৯ দিনের কর্মসূচি ও প্রবল আন্দোলনে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক সরকার দিশাহারা হয়ে পড়ে।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ তৎকালীন ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকীসহ অন্য ছাত্রনেতারা বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মধ্যদিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট জনমত তুলে ধরেন।

এ মার্চেই শিল্পী কামরুল হাসানের আঁকা ঐতিহাসিক পতাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটে।

এ ভাষণটিও ২০১৭ সালে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ‘খোকা’ নামের যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করেছিলেন, ইতিহাস যাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির আসনে অভিষিক্ত করেছে, তিনিই বাঙালির মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ৮ থেকে ২৫ মার্চে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ থেকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষজন বুঝতে পেরেছিল, পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে শেষ বোঝাপড়ার সময় চলে এসেছে। তা ছাড়া এ মাসের অন্যান্য ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেও ১৯৬৯-এর গণঅভু্যত্থানের পর বাঙালি জাতি যে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে এগোচ্ছিল, তাও স্পষ্ট হয়ে যায় এ মাসে। সঙ্গত কারণেই স্বাধীনতার এ মাসটি বাঙালি জাতির জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যবাহী।

৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ধর্মঘট ও অসহযোগ আন্দোলনের ডাক এবং ৪ মার্চ থেকে সরকারি অফিসগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে যায় তৎকালীন পাকিস্তানের ভেতর বাঙালি আসলে একটি পৃথক সত্তা। বলাই বাহুল্য, মার্চের এই দিনগুলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়ে সমুজ্জ্ব্বল।

স্বাধীনতা এবং মুক্তির ঐকতানে সংঘবদ্ধ বাঙালি জাতির প্রাণচাঞ্চল্য বুঝতে পেরে নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের শেষ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে পরাজয় নিশ্চিত জেনে ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরীহ বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। গ্রেপ্তার করা হয় বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে। বলতে দ্বিধা নেই, বেদনাবিধুর অতীতের মার্চ বাঙালি জাতির কাছে এক অগ্নিস্ফুলিঙ্গ উদ্গীরণকারী মাস।

পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-শাসন আর বৈষম্যে অতিষ্ঠ বাঙালি জাতি দীর্ঘদিন স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ ছিল। আর এ প্রেরণার উৎস হিসেবে ভাষা আন্দোলনকে গণ্য করা হয়। ভাষা আন্দোলনের বিজয় বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়োপযোগী নেতৃত্বে বাঙালি জাতি মনেপ্রাণে হয়ে ওঠে অগ্নিযোদ্ধা। এ মাসেই বাঙালি জাতি তার লালিত চেতনাকে নতুন করে শানিত করে। নতুন শপথে বলিয়ান হয়। অত্যাচার, নিপীড়ন আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে এ মাস প্রতিবছরই বাঙালিকে নতুন করে অনুপ্রেরণা জোগায়।

অত্যন্ত পরিতাপের যে, বাঙালির সংগ্রামের সমৃদ্ধ অতীত থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতার এই দীর্ঘদিনেও দেশটি কলুষমুক্ত হয়নি। অপশক্তির মূলোৎপাটন এখনো পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। এখনো মুক্তবুদ্ধির ধারক, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নানাভাবেই অপশক্তি আক্রমণ করছে, যার মূলে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ। জঙ্গিবাদ নির্মূলে সরকারের কঠোর অবস্থান সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে আমরা মনে করি, যে কোনো অপশক্তির মূলোৎপাটনে রাষ্ট্রীয় কঠোরতার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা সমান জরুরি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অম্স্নান রেখে দেশ থেকে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও সব ধরনের অপশক্তি নির্মূলের দৃঢ় প্রত্যয়ই হোক এই মাসের অন্যতম শপথ। স্বাধীনতার মাসের শুরুতেই আমরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মদানকারী সব বীর শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।

Sharing is caring!

Loading...
Open