সিলেটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ভাঙ্গচুরের দীর্ঘ ৬ বছর,ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়!

নিজস্ব প্রতিবেদক:: আজ ২২শে ফেব্রুয়ারি সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হামলার ৬ বছর। ২০১৩ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি রচিত হয়েছিলো সিলেটের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়। এইদিন ভাংচুর করা হয় বাঙালীর ‘প্রাণের মিনার’ সিলেটের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। ব্লগ থেকে কথিত ‘ধর্ম অবমাননার’ প্রতিবাদের নামে জামায়াত শিবিরের ইন্ধনে সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাংচুরসহ ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে দেয়া ফুলে আগুন ধরিয়ে দেয় ইসলামী আন্দোলনের ব্যানারে কয়েক হাজার নেতাকর্মী। কেবল তাই না সে সময় শহীদ মিনার ভাংচুরের সাথে উল্লাসে মেতে ওঠেছিলো হামলাকারীরা। এদিন দূর থেকে এ দৃশ্য অবলোকন করা বাঙালীদের প্রাণে তৈরি হয়েছিলো ভয়াবহ এক যন্ত্রণা। চোখের সামনে বাঙালীর চেতনার প্রতীক শহীদ মিনার ভাংচুর করা হলেও দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে না পেরে সকলেই বেদনায় বিভোর হন সেদিন। আজও এ বেদনার ক্ষত মুছতে পারেনি সিলেটের মানুষ।ওই দিনে শহীদ মিনারে হামলা ভাংচুর ঠেকাতে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হন এমসি কলেজ ছাত্র তাহমিদ, ও ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান সুহিন সহ তিন জন। শহীদ মিনার ভাংচুর ঘটনার ছয় বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। কেমন চলছে মামলার গতি, আর নিহতদের পরিবারই বা কেমন আছে । বেদনার এ স্মৃতির আজ ৬ বছর পূর্ণ হলেও শহীদ মিনার ভাংচুর মামলায় নেই কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি। বরং হামলাকারীরা হয় জামিনে না হয় কথিত ‘পলাতক থাকার’ নামে প্রকাশ্য ঘুরে বেড়ালেও তাদের এখনও আনা হয়নি আইনের আওতায়। বরং আসামিরা মিলেমিশে আছেন ক্ষমতাসীনদের সাথে। এতে ক্ষুদ্ধ সিলেটের নাগরিক সমাজ। ২০১৩ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) জুমার নামাজ শেষে কয়েকটি ইসলামী সমমনা দল ইসলামী আন্দোলনের ব্যানারে কয়েক হাজার কর্মী কোর্ট পয়েন্টে জড়ো হয়। পরে সেখানে সমাবেশ করে তারা ‘ব্লগে ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ তুলে প্রতিবাদের নামে সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে হামলা চালায়। পৌনে ৩টার দিকে মিছিলকারীরা শহীদ মিনারে ঢুকে সীমানা প্রাচীর ভাংচুরসহ ২১শে ফেব্রুয়ারির দিন দেয়া ফুলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এক পর্যায়ে তারা সেনাবাহিনী পরিচালিত ট্রাস্ট ব্যাংকে আগুন দেয়, শহীদ মিনারের সীমানা প্রাচীর, মুজিব-জাহান ব্লাড ব্যাংক ও বিএমএ ভবনে ভাংচুর করে। এ সময় ১ জন নিহত হন এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন। এর মধ্যে সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন গুলিবিদ্ধ হন। একই সময়ে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। সারা দেশের ন্যায় ইসলামী আন্দোলনের ব্যানার ব্যবহার করে জামাত শিবিরের নেতৃত্বেই এ হামলা চালানো হয় বলে সেসময় জানিয়ে ছিলো পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা। ওইদিন হামলার পর পর কোতোয়ালী থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক জামাল উদ্দিন ও কমর উদ্দিন বাদী হয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে (মামলা নং-২৫ ও ২৬) দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলার ধারা (১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩৩২/৩৩৩/৩৫৩/৩০৭/৩৭৯/৪৩৫/৩০২/৪২৭/৩৪) তথ্যসহ ২০০২ সনের (৩/৪/৬) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় উল্লেখযোগ্য আসামীদের মধ্যে বিএনপি নেতা ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী ও রেজাউল হাসান কয়েছ লোদীসহ ৮৯জনকে আসামি করে এবং ৯০০/১০০০জনকে অজ্ঞাত করে পুলিশ বাদী হয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। এ দুই মামলায় মহানগর জামায়াতের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ডাক্তার শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী, কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েছ লোদী, মহানগর জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি ইনসান আলী, মহানগর ছাত্র শিবিরের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান দেলওয়ার, এমসি কলেজ ছাত্র শিবিরের সেক্রেটারি তোফাজ্জুল আহমদ, মদন মোহন কলেজ ছাত্র শিবির সভাপতি তানভীর আহমদ, সেক্রেটারি মাহবুবসহ মোট ১৭৮ জনের নাম উল্লেখ করে কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে অজ্ঞাত আসামি করে চার্জশিট গঠন করা হলেও অধিকাংশই রয়েছেন পলাতক। কেবল তাই না, এ ঘটনার ৫ বছর পূর্ণ হলেও এখনও মামলায় তেমন কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বললেই চলে। প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, আগামী ১৮ মার্চ পত্রিকা বিজ্ঞপ্তি উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন আমলগ্রহণকারী আদালত। এর পর ও মামলার চার্জ গঠন ও সাক্ষী উপস্থাপন করা হবে। এ মামলায় ৫৬ জন আসামি জামিনে রয়েছেন এবং বাকি আসামিরা পলাতক রয়েছেন। তবে মামলার দীর্ঘসূত্রিতার জন্য সংশ্লিষ্টের গাফিলতিকেই দায়ী করছেন নাগরিক সমাজ। এ ব্যপারে সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সভাপতি মিশফাক আহমদ মিশু বলেন- কষ্ট লাগে যখন দেখি শহিদ মিনারে হামলাকারীরা জামিনে বেরিয়ে এসে বিভিন্ন জায়গায় নেতৃত্ব দেয়। তাই শহিদ মিনারে হামলাকারীরা দ্রুত আইনের আওতায় আসবে এ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এটি আমাদের প্রাণের দাবী। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণে মামলাটির এখনও কোন অগ্রগতি নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট মহানগর হাকিম আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট মফুর আলী বলেন, আগামী মার্চ মাসের ১৮ তারিখ মহানগর আদালতে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মামলার চার্জ গঠন এবং পত্রিকা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর স্বাক্ষীদের মহানগর আদালতে উপস্থিত করা হবে। মামলাগুলোর অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা আছে।

Sharing is caring!

Loading...
Open