অপরাধের ‘পুরস্কার’ আওয়ামী লীগের ‘দুর্লভ’ মনোনয়ন!

নিউজ ডেস্ক:: ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছিলেন, কোনো বিতর্কিত, নিন্দিত ও সমালোচিত সাংসদ মনোনয়ন পাবেন না। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতারাই মনোনয়ন পাবেন। কিন্তু গত রোববার মনোনয়ন ঘোষণার পর দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব বিতর্কিত ব্যক্তিরাই দলের মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, লোকলজ্জার ভয়ে যে দুজন অতি বিতর্কিত ও নিন্দিত সাংসদকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিতে পারেনি, সান্ত্বনা হিসেবে সেই মনোনয়ন তাঁদের পরিবারেই রেখে দিয়েছে। বাইরে যেতে দেয়নি। এই দুই সাংসদ হলেন কক্সবাজার-৪ আসনের (টেকনাফ-উখিয়া) আবদুর রহমান ওরফে বদি ও টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের আমানুর রহমান খান ওরফে রানা।

টাঙ্গাইলে আমানুরের জায়গায় মনোনয়ন পেয়েছেন তাঁর বাবা আতাউর রহমান খান, বয়স আশির কাছাকাছি। আর কক্সবাজারের আবদুর রহমান বদির জায়গায় তাঁর প্রথম স্ত্রী শাহীন আক্তার চৌধুরী (দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে অনেক আগে বদির ছাড়াছাড়ি হয়েছে, না হলে হয়তো মনোনয়নটিও ভাগ করে দিতে হতো)। তাঁদের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিচয় যা-ই থাকুক না কেন, একজন খুনের মামলার চার আসামির পিতা, আরেকজন ইয়াবা গডফাদার হিসেবে পরিচিত এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার শীর্ষে নাম থাকা ব্যক্তির স্ত্রী। শুধু বদি নন, তাঁর পাঁচ ভাই, ভাগনে, বেয়াই, ফুফাতো ভাইসহ বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির নামও আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায়।

টাঙ্গাইল-৪ আসনে সাংসদ আমানুর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যার আসামি হিসেবে এখন কারাগারে। তিনি সংসদে উপস্থিত না হয়েও শুধু সাংসদ পদ রাখার জন্য পলাতক অবস্থায় হাজিরা খাতায় সই দিয়ে যেতেন। খুনের মামলার আসামি অপর তিন ভাই পলাতক, যাঁদের দুজন বিদেশে। অথচ পুলিশ পাঁচ বছরেও তাঁদের খুঁজে পায়নি। ২০১৩ সালে মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের নেতা ফারুক আহমেদ খুন হন। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হতে চেয়েছিলেন, আমানুরের ভাইও ওই পদপ্রত্যাশী ছিলেন। আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ফারুক আহমেদের স্ত্রী নাহার আহমেদ একবার আসামি আমানুরকে দেখে বলেছিলেন, ‘আমরা তোকে সন্তানের মতো দেখতাম, আর তুই আমাকে বিধবার শাড়ি পরালি!’ নাহার এখনো বিচারের আশায় আদালতে ধরনা দেন, আর নানা বাহানায় মামলার তারিখ কেবল পিছিয়ে যায়।

ধর্মের কথা হলো, পিতার অপরাধের জন্য পুত্রকে দায়ী করা যাবে না। কিন্তু এখানে পুত্রের অপরাধের জন্য পিতাকে পুরস্কৃত করা হলো। মনোনয়ন পাওয়া পিতার চার পুত্রই খুনের আসামি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব অন্তত মামলার বিচার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম ওরফে লেবু বলেছেন, ‘ফারুক হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে ওঠায় যাঁরা এত দিন পালিয়ে ছিলেন, এখন আবার তাঁরা প্রতাপ দেখাবেন। পলাতক আসামিরাও ফিরে আসবেন।’

অন্যদিকে কক্সবাজার-৪ আসনের সাংসদ আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াও নানা অভিযোগ আছে। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় কাজ করেছেন এমন সরকারি কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, শিক্ষক কম পাওয়া যাবে, যাঁরা তাঁর হাতে প্রহৃত হননি। কিন্তু এই ‘সাহসী পুরুষই’ দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হলে সৌদি আরবে যান ওমরার নাম করে। সে সময় টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের নেতা একরামুল বন্দুকযুদ্ধে মারা গেলে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

আমানুরের বাবা আতাউর রহমান সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা। অবসর নেওয়ার পর তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দিলেও কখনো নেতৃত্বে আসেননি। জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হয়েছেন সাংসদপুত্রের কল্যাণে। এবার সেই সাংসদপুত্র জেলে থাকায় একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নও পেয়ে গেলেন। আর কক্সবাজারের শাহীন আক্তার ২০০৮ সালে স্বামী বদির ছায়া প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। কেননা, নারী প্রার্থী হিসেবে অন্দরমহলে স্বামীর পক্ষে প্রচার চালাতে পারতেন। তিনি ভোট পেয়েছিলেন ৬৭৬। এবারে স্বামীর সুবাদে ‘আসল প্রার্থী’ হলেন আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়ে। এই সৌভাগ্য কজনের হয়?

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ২০ নভেম্বর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছিলেন, বদি ও রানার পরিবর্তে তাঁদের পরিবারের ভেতরেই মনোনয়ন দেওয়া হবে। তাঁর দাবি, ‘ঘরে কি সবাই অপরাধী, আপনি অপরাধী হলে কি সবাই অপরাধী বা পরিবারের সব লোক খারাপ? বদি সম্পর্কে যে কন্ট্রোভার্সি আছে, তার কোনো প্রমাণ আছে? কন্ট্রোভার্সি থাকায় অলটারনেটিভ বেছে নিয়েছি।’ এর মাধ্যমে তিনি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিলেন, ঘরে ‘অপরাধী’ আছে। আর সেই অপরাধের ‘পুরস্কার’ হলো আওয়ামী লীগের ‘দুর্লভ’ মনোনয়ন।

Sharing is caring!

Loading...
Open