‘বাংলাদেশে ‘#মিটু’ আন্দোলন ফেসবুকেই আটকে থাকবে…….!’

সুরমা টাইমস ডেস্ক:: বাংলাদেশের দুজন নারী সম্প্রতি তাদের ওপর যৌন হেনস্তার অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে শেয়ার করার পর ‘#মিটু’ আন্দোলন নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। মূলত চলচ্চিত্রের তীর্থস্থান হলিউড থেকে এই ‘#মিটু’ আন্দোলন শুরু হয়। তারপর থেকে এর হলকা বয়ে যাচ্ছে উপমহাদেশের জনপ্রিয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলিউডে।

এখন সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে বাংলাদেশের ওই দুই নারীর যৌন নিপীড়নের অভিজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে সেই আন্দোলনের একটা প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে বলে মনে করেন অনেকে। এই #মি-টু আন্দোলনের পরিণতি কি হবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মিডিয়ায় কর্মরত এক নারী। তিনি নিজেও এক সময় তারই এক জ্যেষ্ঠ পুরুষ সহকর্মীর আপত্তিকর আচরণের শিকার হয়েছিলেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নারী বলেন, ‘আমিও চাইলেই আমার বিষয়টাকে সামনে আনতে পারি। কিন্তু এতে জল ঘোলা হওয়া ছাড়া আর কিছুই হবে না। আমরা এই আন্দোলনের জন্য আসলে প্রস্তুত না। কারণ এখনও এদেশে আন্দোলনের শুরুটা অনেক সুন্দর দেখায়, তারপর এটার মিসইউজ হয়। যার প্রভাবে ওই ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই হয় না।’

ওই দুই নারীর সাহসিকতাকে স্বাগত জানালেও তিনি প্রশ্ন তোলেন এই ‘#মিটু’ মুভমেন্টের ফলাফল নিয়ে। তার মতে, পাশের দেশের অনুকরণে ‘#মিটু’ মুভমেন্টে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ঠিকই। কিন্তু সেই দেশে এই ‘#মিটু’ আন্দোলনের ফলে যেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি; তেমনি বাংলাদেশেও এটি ওই সামাজিক মাধ্যমেই স্ট্যাটাস এবং এ নিয়ে সাময়িক তোলপাড়ের মধ্যেই আটকে যাবে।

এ নিয়ে বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘যাদের অনুকরণে এই মুভমেন্টটা বাংলাদেশে এসেছে, সে দেশেই কি এই মুভমেন্টের কোন পরিণতি দেখা গেছে? কোন উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে? কেউ বিচার পেয়েছেন? তা তো হয়নি। মিডিয়ায় খালি তোলপাড় হয়, কিন্তু কোন কাজের কাজ কিছুই হয় না। মাঝখানে কিছু সুবিধাবাদী এই সুযোগটা নেয়। আমি কাউকে সেই সুযোগটা দিতে চাই না।’

বেশিরভাগ নারী তাদের যৌন হেনস্তার অভিজ্ঞতা সামনে আনতে চান না। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আরেকজন নারীও নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘একটা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রোডাক্টের ফটোশুটের বিষয়ে আমার আলোচনা হয়। মিটিংয়ের পর আমাকে নেয়ার বিষয়টা পুরোপুরি ফাইনাল হয়ে যায়। কিন্তু আমি যেদিন কন্ট্রাক্ট সাইন করতে যাব, সেদিন ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধানের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। তিনি ওই মুহূর্তে সাইন না করিয়ে বলেন যে আমার সঙ্গে পরে কথা বলবেন।’

‘পরদিন আমাকে উনি ফোন দিয়ে জানান যে, তিনি কক্সবাজারে যাচ্ছেন। আমি ওনার সঙ্গে যেন যাই। আমি তার কণ্ঠ বা বলার ভঙ্গি দেখেই বুঝেছি, তার এই প্রস্তাবের সঙ্গে আমার কাজের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। সম্পূর্ণ নোংরা একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তখন আমি কন্ট্রাক্টটা রিজেক্ট করে দেই।’

‘পরে এই কথা আর কাউকে বলিনি। কারণ আমি জানি, এটা বলা মাত্র মানুষ আমাকেই দোষারোপ করবে যে আমি কেন মডেলিং করতে গেলাম? তাছাড়া আমি কাদের সঙ্গে মিশি… আরও নানা কথা। নিজেকে ঝামেলায় জড়াতে চাইনি।’

তবে ওই দুই নারীর নিজেদের ‘#মিটু’অভিজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরার পর এটি নিয়ে এই প্রথম এতো বেশি আলোচনা হচ্ছে। তবে যৌন হয়রানির ওপর পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে বাংলাদেশে আরো বহু সংখ্যক নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। তাহলে যৌন হয়রানির সঙ্গে এই ‘#মিটু’আন্দোলনের পার্থক্যটা কোথায়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফাহমিদুল হক বলেন, যেসব যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে তার-সঙ্গে যদি ‘#মিটু’ মুভমেন্টের তুলনা করতে হয় তাহলে বলতে হবে যে ‘#মিটু’ মুভমেন্টের একটা বিশেষ প্রেক্ষাপট আছে। এই প্রেক্ষাপটকে তিনি তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছেন।

১. আলোচিত ব্যক্তিবর্গ:- অধ্যাপক ফাহমিদুল হক বলেন, ‘আমেরিকায় আমরা যেটা দেখেছি যে, এই মুভমেন্টে যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের সবাই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে বিখ্যাত। যিনি ভিকটিম এবং যিনি অভিযুক্ত তারা দুজনেই তারকা কিংবা তারকা না হলেও কোনো না কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। এ কারণেই মানুষ এই বিষয়টার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। এতোটা আলোচিত হয়েছে।’

২. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম:- এছাড়াও এই মুভমেন্ট ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক ফাহমিদুল হক। তিনি বলেন, ‘মেইনস্ট্রিম মিডিয়া একটা ফর্মাল প্রক্রিয়ার মধ্যে কাজ করে। এখানে তথ্য যাচাই বাছাইয়ের বিষয় থাকে। প্রচার হওয়া না হওয়ার বিষয় থাকে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় সবার পারসোনাল স্পেস আছে। এখানে যে কেউ চাইলেই তাদের অভিযোগ দায়ের করতে পারে। পুরনো বিষয় বলে এটা বাদ পড়ে যায় না। আর সেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে তার প্রতিক্রিয়াও জানাতে পারে।’

৩. বলিউড:- তাছাড়া ভারতে মুম্বাই ছবি-পাড়ার প্রভাবকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন তিনি। তার মতে বলিউডে যা কিছু হয় তার একটা প্রভাব বা প্রতিফলন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে থাকে। তিনি বলেন, ‘ফোকাসের জায়গাটায় আমাদের দেশ একটা প্রান্তিক জায়গায় আছে। আন্তর্জাতিকভাবে কোন বিষয়ে নাড়াচাড়া হলেই, আমাদের দেশেও তার প্রভাব পড়ে। আমরা কখনোই প্রাইমারি অ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারি না। তাই বাংলাদেশের এই ‘#মিটু’ মুভমেন্টে বলিউডের যে একটা প্রভাব রয়েছে সেটা অস্বীকারের উপায় নাই।’

বর্তমানে এই ‘#মি-টু’র পরিধি অনেক সীমিত হলেও যদি আরও নারী তাদের এই বিষয়গুলো প্রকাশের সাহস করেন, সেই-সঙ্গে যৌন নিপীড়নকে লজ্জার বিষয় না ভেবে এটাকে প্রতিবাদের জায়গায় নিয়ে যান তাহলে এই #মি-টু মুভমেন্ট একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে বলে মনে করেন মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল। তবে এই #মি-টু আন্দোলনকে তিনি তখনই সফল বলবেন যখন এর মাধ্যমে বিচারের কোন নজির সৃষ্টি হবে।

সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমাদের সমাজে মেয়েদের কথার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, এছাড়া ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়েও মানুষের মনে সন্দেহ আছে। এই সংস্কৃতিগুলোর সঙ্গে #মি-টুর ভবিষ্যৎ জড়িয়ে আছে।’

তবে তিনি মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে সাম্প্রতিক যে দুটো যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এসেছে সেগুলো যদি তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা হয়, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যাবে।

সুলতানা কামাল বলেন, ‘বিচারের উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারলে আরও অনেক নারী সামনে এগিয়ে আসবে। তবে আমি বিশ্বাস করি নারীরা যতো বেশি তাদের সংকোচ ঝেড়ে সামনে এগিয়ে আসবে, তাদের কথাগুলো প্রকাশ করবে। সেখান থেকে পরিবর্তন আসবে।’- বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন –

Sharing is caring!

Loading...
Open