৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীর সন্তান জন্ম দেয়া নিয়ে তোলপাড়


সুরমা টাইমস ডেস্ক :: সিলেটের ওসমানীনগরে মাদরাসা পড়ুয়া অবিবাহিতা এক ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীর পুত্র সন্তান জন্ম দেয়া নিয়ে এলাকায় তোলপাড় চলছে। দিনদুপুরে সন্তানের জন্মদানের পর সামাজিক হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে সন্তানটিকে বাড়ির নিকটস্থ পুকুর পাড়ের জঙ্গলে ফেলে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রেমের ফাঁদে ফেলে জন্মদানকারী সিএনজি অটোরিক্সা চালক সন্তানটির পিতৃত্বের দাবী অস্বীকার করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

বিষয়টি জানার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জন্মদাতা প্রলোভনকারী ঐ ছেলের সাথে মেয়েটিকে বিয়ে দেয়ার জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। তবে অভিযুক্ত সিএনজি চালকের বিরুদ্ধে বহুবিবাহসহ নারীদের ফাঁদে ফেলে চরিত্র হননের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয় সূত্র ও ভিকটিমের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, উপজেলার মাদার বাজার এফ ইউ সিনিয়র মাদরাসার ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও উপজেলার উছমানপুর ইউনিয়নের ধনপুর গ্রামের মানিক মিয়ার মেয়ে রাহেলা বেগম (১৫) এর সাথে পার্শ্ববর্তি বালাগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের দোহালিয়া গ্রামের মাশুক মিয়ার ছেলে ও আজিজপুর সিএনজি অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সদস্য অটোরিক্সা চালক আছদ্দর আলী (৩৫) এর মধ্যে এক বছর ধরে অবৈধ সম্পর্ক চলে। সম্পর্কের কারণে দৈহিক মেলামেশা হলে রাহেলা গর্ভধারণ করে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর শনিবার ৩টায় রাহেলা এক পুত্র সন্তান জন্ম দিলে সামাজিক হেয় প্রতিপন্নতার ভয়ে ছেলেটিকে পার্শ্ববর্তি একটি পুকুর পাড়ের জঙ্গলে ফেলে দেয়া হয়। বিকালে গ্রামের ছেলেরা পুকুর সংলগ্ন মাঠে খেলতে গেলে শিশুর কান্না শুনে এগিয়ে গিয়ে একটি নবজাতক দেখতে পান। সংবাদটি চারদিকে ছড়িয়ে গেলে গ্রামের শিল্পী নামের এক মহিলা নবজাতক শিশুটিকে উদ্ধার করে এনে ঘন্টাখানেক সময় তার কাছে রাখেন।

এসময় পার্শ্ববর্তি বাশিয়া গ্রামের জাহানারা নামের এক নিঃসন্তান মহিলা নবজাতকটি নিজে লালন পালন করবেন বলে শিল্পীর কাছ থেকে নিয়ে নেন। জাহানারা নবজাতকটিকে এক রাত ও অর্ধদিন রাখার পর গ্রামবাসির অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে সন্তানটি রাহেলা ও আছদ্দরের বলে। তখন গ্রামবাসি বিষয়টি স্থানীয় উছমানপুর ইউপি চেয়ারম্যান ময়নুল আজাদ ফারুকের কাছে জানালে চেয়ারম্যান রাহেলা ও তার পিতাকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এসময় রাহেলা এবং তার পিতা স্বীকার করেন নবজাতকটি রাহেলা এবং সিএনজি চালক আছদ্দরের সন্তান বলে। এসময় ইউপি চেয়ারম্যান ময়নুল আজাদ ফারুক নবজাতকটিকে রাহেলার কোলে তুলে দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আছদ্দরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন রাহেলার পরিবারকে ।

এ ঘটনার পর স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে আছদ্দর আলীকে সন্তান গ্রহণের কথা বললে সে এ সন্তানের পিতৃত্বের দাবী অস্বীকার করেছে বলে জানা গেছে। এবং ঘটনার পর থেকে সিএনজি অটোরিক্সা চালক আছদ্দর আলীকে এলাকায় আর পাওয়া যাচ্ছেনা। তাছাড়া লোকলজ্বার ভয়ে রাহেলার পরিবারের লোকজন বাড়ি থেকে বাইরে বের হচ্ছেনা। এ ঘটনার পর সন্তানের পিতৃত্বের দাবী আদায়ের জন্য রাহেলার পরিবারের লোকজন ওসমানীনগর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

রাহেলার গ্রামের জনৈক এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাস করা হলে তিনি জানান, বেলা তিনটার পর অন্ধ হাফিজ সাহেবের বাড়ি সংলগ্ন পুকুর পাড়ে ছেলেরা একটি নবজাতকের কান্না শুনতে পান। আছদ্দর ট্রাইভার তাদের বাড়িতে যাওয়া আসা করতো। আমরা এদের বাড়িতে বেশি একটা যাইনা। আগামী বুধবারে গ্রামের বৈঠক আছে। বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হবে।

রাহেলার মা ফুলেছা বেগম জানান, বছর খানেক আগে আজিজপুরে একটি মোবাইলের বিচার করে দিতে গিয়ে আছদ্দরের সাথে আমাদের পরিচয় হয়। এরপর থেকে সে প্রায়ই বাড়িতে আসা যাওয়া করতো। আমরা জানিনা আমার মেয়ের সাথে তার সম্পর্ক হয়েছে বলে। সন্তান জন্ম নেয়ার পর সে এখন আর আসছেনা।

রাহেলার ভাই ইসলাম মিয়া জানান, সন্তান জন্ম নেয়ার দিন আমরা বাড়িতে ছিলাম না। আছদ্দর আমাদের বাড়িতে ছিল। সন্তান জন্ম নিলে আছদ্দর নবজাতকটিকে পুকুর পাড়ে ফেলে চলে যায়। আমরা সন্তানের পিতৃত্বের দাবী জানাই।’
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী ফুজায়েল জানান, ‘একটি নবজাতক পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। সন্তানটির পিতৃত্ব পেতে আমরা আইনি সহযোগীতা করবো।’
আজিজপুর অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ইসমাইল আলী জানান, ‘আছদ্দর এক সময় আমাদের শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য ছিল। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। সে বিভিন্ন স্থানে এভাবে বিয়ে করেছে বলে অভিযোগ আছে। আমরা তার বিরুদ্ধে মানিব্যাগ চুরি ,অটোরিক্সা জবর দখলসহ বিভিন্ন বিচার সালিশে শেষ করেছি। বিভিন্ন সময় সালিশে সে দোষী সাব্যস্থ হয়েছে। সে এখন আমাদের স্ট্যান্ডে গাড়ি চালায় না। তার বিরুদ্ধে নারীদের ফাঁদে ফেলে ভোগসহ লম্পট আচরনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় মাদারবাজার এলাকায় এরকম আরো একটি অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। সেটা শেষ হয়েছে শুনেছি।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ময়নুল আজাদ ফারুক জানান, ‘সন্তানসহ রাহেলা ও তার পিতা মানিক মিয়াকে ইউপি কার্যালয়ে আসতে বলেছিলাম। তারা নবজাতকটি রাহেলার বলে স্বীকার করেছে। নবজাতকটিকে তাদের কাছে দিয়েছি। পিতৃত্ব পেতে আইনি থানায় মামলা করা হয়েছে।’
ওসমানীনগর থানার ওসি আলী মাহমুদ বলেন, ‘নবজাতকের পিতৃত্ব নিয়ে একটি অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি জটিল। তদন্ত করার জন্য একজন আইও কে দেয়া হয়েছে। তদন্ত পূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর ঐ ছেলের সাথে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিতে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছি।’
অভিযুক্ত আছদ্দর আলীর সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন ‘আমাকে আরো একজন ফোনে বলেছেন এ সন্তান নাকি আমার। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমি এখন জ্যামে আছি, পরে কথা বলবো।’

Sharing is caring!

Loading...
Open