‘সড়ক পরিবহন আইন’-যৌক্তিক শাস্তির বিধান রাখা হোক

বাসচাপায় রাজধানীতে দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। সেই আন্দোলন সমাজকে ভীষণ নাড়া দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারপ্রধান সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া তৈরি করার নির্দেশ দেন। খসড়াটি গত ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে তোলা হয় এবং সেটি অনুমোদিত হয়। দশম জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট বিলটির আইনে পরিণত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে এটিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হবে।

এখন সড়ক পরিবহন খাত পরিচালিত হচ্ছে মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এর মাধ্যমে। ৭৮ বছর আগে প্রণীত ভারতীয় আইন অনুসরণ করে এ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছিল। এ আইনে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। যুগের প্রয়োজনের নিরিখে এটি অপ্রতুল মনে হওয়ায় সাত বছর আগে ‘সড়ক পরিবহন আইন’ নামে নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়। কয়েক দফায় পরীক্ষা করার পর গত বছরের ২৭ মার্চ মন্ত্রিসভায় খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়। গত ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে সেটিকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু ঘটালে অপরাধী চালকের সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল খসড়ায়। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের সময় খসড়া সংশোধন করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা বা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন ফোরামে খসড়া আইনের বিষয়ে অভিমত দিয়েছেন। সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে প্রাণহানি ঘটলে চালকের সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন তাঁরা।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সড়কে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকদের শাস্তির ঘটনা বিরল। কারণ বিচারিক প্রক্রিয়ায় ফাঁকফোকর রয়েছে। মামলা হলেও অপরাধীরা জামিন নিয়ে পালিয়ে যায়। তাই অভিযুক্ত ব্যক্তির জামিন হওয়া উচিত নয়। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে সড়কে মানুষ হত্যার শাস্তি পাঁচ বছর কারাদণ্ড যুক্তিযুক্ত নয়। আগের একটি সংশোধনী বাতিল করে আদালত দণ্ডবিধিতে এ ধরনের অপরাধের জন্য সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে বলে আদেশ দিয়েছেন, এটি এখনো বহাল আছে। কাজেই এ অপরাধের শাস্তি সাত বছরের কম হওয়া উচিত নয়। আদালত আরেকটি মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছেন, নতুন কোনো আইনে যেন বেশি শাস্তির বিধান রাখা হয়। তাই সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালনায় মানুষের মৃত্যু হলে দায়ী ব্যক্তির শাস্তি ১০ বছর কারাদণ্ড হওয়াই সমীচীন। চালক ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যা করলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধানও প্রযোজ্য।

সড়ক নিরাপদ করার লক্ষ্যে নতুন আইন পাস করার যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, তা সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত। আইন কার্যকর থাকলে এবং শাস্তির ভয় থাকলে চালকরা সতর্ক থাকবে, যাত্রী-পথচারীরাও সতর্ক থাকবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে নিয়ে যৌক্তিক শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইন পাস করা হোক।

Sharing is caring!

Loading...
Open