নগরীতে ছাত্রদল নেতা রাজু হত্যার নেপথ্যের ‘মাস্টার মাইন্ড’র অজানা কাহিনী……..

বিশেষ প্রতিবেদক:: সিলেট নগরীতে আলোচিত ছাত্রদল নেতা ফয়জুল হক রাজু হত্যা মিশনে কতোজন অংশ নিয়েছিলো-এই প্রশ্নটি এখনো তাজা। নানা সূত্র নানা পরিসংখ্যান দিলেও প্রকৃত সত্য সামনে নিয়ে আসতে আমাদের অনুসন্ধানী চোখ এ বিষয়ে খোঁজ নিয়েছে। বীভৎস এই হত্যায় কারা সরাসরি অংশ নেয়, অনুসন্ধানে জানা যায় তাদের বৃত্তান্ত।

অনুসন্ধান বলছে, হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো হত্যার ঘটনা নয় এটি। দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পরিকল্পনার ছকমতোই হত্যা করা হয় রাজুকে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চূড়ান্ত দিনে হত্যা মিশনে অংশ নেয় ২৫-৩০ জনের একটি দল। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রদল ক্যাডারা আব্দুর রকিব। তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সদস্য। রাজু হত্যা মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে রকিবকেই। অন্যান্য ২২ আসামির বেশিরভাগই বর্তমান ছাত্রদলের পদবীধারী নেতা। যে কমিটি নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক এখন সিলেটে।

রাজুর হত্যার দুদিন পর তার চাচা জেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো.দবির আলী বাদি হয়ে সিলেট কতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা (নং : ২৩) করেন। আসামি করা হয় ২৩ জনকে। নামগুলোর সূত্র উজ্জ্বলের কাছ থেকে পাওয়া। হামলার দিনে একই মোটরসাইকেলে রাজুর সঙ্গেই ছিলো উজ্জ্বল। শরীরে গুলি আর কোপ নিয়েও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় সে। উজ্জ্বল যাদের চিনতে পরেছে সবার নাম উল্লেখ করা হয়েছে মামলায়।

এরা হলেন, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুর রকিব চৌধুরী, জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দিনার, মহানগর ছাত্রদলের গণসংযোগ বিষয়ক সম্পাদক এনামুল হক, ছাত্রদল কর্মী একরামুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা সদস্য শেখ নয়ন, মহানগর যুগ্ম সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সলিড, ২৪ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের আহবায়ক ফরহাদ আহমদ, সাদ্দাম, মুহিবুর রহমান খান রাসেল, রাসেল উরফে কালা রাহেল, আরাফাত, মোফাজ্জল চৌধুরী মুর্শেদ, আলফু মিয়া, শাহিন, সুফিয়ান, নজরুল উরফে জুনিয়র নজরুল, তোহা, জেলা সদস্য আফজল, সাহেদ, রুবেল মিয়া, মামুন ও জুমেল। এই ২৩ জনই রাজু হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়।

মামলার প্রধান সাক্ষী উজ্জ্বলের ভাষ্যমতে, অনেকগুলো মোটরসাইকেলে প্রায় ২৫-৩০ জন হামলাকারী ওঁৎ পেতে ছিলো সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আরিফুল হকের বাসার গলির মুখে। মোটরসাইকেলে চেপে রাজু আর উজ্জ্বল আর সবার মতো আরিফের বিজয় উদযাপনে শামিল হতেই সেখানে গিয়েছিলেন। মোটরসাইকেল চালকের আসনে ছিলেন উজ্জ্বল আর পেছনে বসা ছিলেন রাজু। হামলাকারীরা প্রথমে গুলি করে উজ্জ্বলকে লক্ষ্য করে। মোটরসাইকেল নিয়ে ছিটেক পড়েন রাজু-উজ্জ্বল দুজনেই। এরপর সবাই গিয়ে হামলা করে রাজুকেই। প্রথম গুলিটাই ছুড়েন ফরহাদ, ঠিক পরপরই আরেকটি গুলি ছুড়েন ছাত্রদল ক্যাডার রকিব- যাকে বলা হচ্ছে এ হত্যাকান্ডের ‘মাস্টার মাইন্ড’। পরক্ষণেই এগিয়ে আসে দিনার, মোস্তাফিজ, এনামুল, নয়ন , মামুন মোস্তাকিন মুন্নাসহ বেশ ক’জন। রাজুকে ঘিরে ধরে তখন নারকীয় উল্লাস চালায় তারা। কোপের পর কোপ পড়তে তাকে তার শরীরে। থেমে থেমে কয়েক রাউন্ড গুলিও ছোড়া হয়। হামলার সময় ছাত্রদল নেতা রকিব অকথ্য ভাষায় গালাগালি দিচ্ছিলেন রাজুকে। সঙ্গীদের বলতে থাকেন শেষ করে ফেল ওকে। দীর্ঘ সময় কোপানোর পর একসময় রাজু নিস্তেজ হয়ে পড়েন। মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে ঘাতকরা তখন মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত শাহী ঈদগাহ’র দিকে পালিয়ে যায়। তখন উজ্জ্বল আহত অবস্থায়ই রাজুকে তুলে সিএনজিতে করে ওসমানী হাসপাতালের দিকে ছুটে। সেখানেই মৃত্যু হয় রাজুর।

উজ্জ্বলের ভাষ্য, রাজুর উপর হামলার ধরন থেকে বুঝতে পেরেছি টার্গেটই ছিলো রাজু। তাছাড়া নির্বাচনের পর থেকে রাজুর মোবাইলে একাধিক হুমকি আসে। যদিও সেসবে পাত্তা দেয়নি রাজু। একাধিক হুমকির কিছু ক্লিপও আছে রাজুর মোবাইলে আছে। হামলার দিন রাজুর মোবাইলটি তাই ছিনিয়ে নেয় ঘাতকরা। হামলাকারীদের অনেকের বসবাসই উপশহরে। রাজুও থাকতেন ওই এলাকায়। উপশহরের একটি বড় এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন এই কিলার রকিব। তেররতন এলাকায়ই ছিলো রকিব বাহিনীর আড্ডা। এলাকাবাসীর সাথে আলাপ করে জানা গেছে তেররতনসহ উপশহর এ ব্লক বি ব্লক এলাকায় একক আধিপত্য ছিলো রকিবের। সেখানে বৃহৎ একটি দল করে ছিনতাই, রাহাজানি সহ নানা ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। তার সঙ্গী ছিলেন তেররতন এলাকার অরেক ক্যাডার সুহিন। যিনি এবার সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী ছিলেন। যৌথ বাহিনীর আমলে রকিব সুহিন দুজনই চোরাই গাড়িসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন র‌্যাবের হাতে। মহানগর ছাত্রদলের আগের কমিটির সহ প্রচার সম্পাদক ছিলো ফয়জুল হক রাজু। সেসময় রকিব গ্রুপেই ছিলো সে।

একসময় রাজু ল কলেজে ভর্তি হয়। সেময় রকিব গ্রুপের অন্যান্য ক্যাডারদের নানা অপকর্মে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে সে। ফেরাতে ব্যার্থ হয়ে ধীরে ধীরে দলত্যাগ করে রাজু। তখন থেকেই বিরোধের সূত্রপাত। এদিকে নির্বাচনের সময় রাজু মেয়র আরিফের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। আরিফও তাকে স্নেহ করতেন বেশ। নির্বাচনী জনসভায় যাওয়ার সময় রাজুকে ডেকে নিয়ে নিজের গাড়িতে তুলতেন। বিষয়টি স্বভাবিক ভাবে নেননি রকিব। আরিফের ড্রয়িং রুমে বসা নিয়েও রকিব সাথে একাধিক বাকবিতন্ডা হয় রাজুর । এভাবে খুব দ্রুতই রাজু চোখেরবালী হয়ে ওঠেন রকিবের। সেই থেকেই পরিকল্পনা শুরু হয় রাজু হত্যার। অনুসন্ধানে জানা গেছে উপশহর তেররতন এলাকায় একাধিক বৈঠক বসে হামলার ছক আঁটতে। সে অনুযায়ী গত ৩০শে জুলাই নির্বাচনের পর থেকেই ঘাতকরা রাজুর ওপর হামলার সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু যুঁতসই সময় আসে গত ১১ই আগস্ট রাতে। সময় সুযোগ মতো সেদিনই রাজুর ওপর অতর্কিত হামলা চালায় তারা।

এখনো অধরা হোতারা::- গত এক মাসে আলোচিত এই হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন মাত্র তিন আসামি। তাও আবার বাদি পক্ষের সহায়তায়। গত ১৪ই আগস্ট রাতে নগরীর রায়নগর থেকে মামলার ১৪ নম্বর আসামি আলফু মিয়াকে গেফতার করে পুলিশ। গত ১৮ই আগস্ট আম্বরখানা থেকে গ্রেফতার করা হয় মামলার ২১ নম্বর আসামি রুবেল মিয়াকে। সর্বশেষ গত ৩রা সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে গ্রেফতার করা হয় মামলার ৯ নম্বর আসামি সাদ্দামকে। এছাড়া আর কোনো অগ্রগতি নেই হিংস্র এই হত্যা মামলায়। মামলার মূল হোতারা এখনো অধরা। ‘মাস্টার মাইন্ড’ রকিব-দিনারসহ বাকিরা হত্যার দিন থেকেই গা-ঢাকা দিয়ে আছে।

পুলিশের দাবি হোতাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যে তিনজনকে ধরা হয়েছে তাদের রিমান্ডে নিয়ে চলছে জিজ্ঞাসাবাদ। কিন্তু একমাসেও মূল হোতারা অধরা থাকায় মানসিক কষ্টে ভুগছেন রাজুর পরিবার। বাদী দবির মিয়ার দাবী এমন নির্মম হত্যাকান্ডের পর আমাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ভাতিজার বীভৎস শরীর দেখে যে যন্ত্রণায় আছি এর চেয়ে বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে মাস্টার মাইন্ডরা ধরা পড়ছে না জেনে। তবে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) ওহাব মিয়া জানিয়েছেন নির্মম এই হত্যার সাথে জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। অভিযান চলছে। আসমিদের ধরার জন্য সর্বত্মক চেষ্টাও চলছে।

দলীয় শাস্তি নেই::- গত ১১ই সেপ্টেম্বর রাজু হত্যার এক মাস পূর্তি হয়। হত্যা মামলায় উল্লেখিত ২৩ আসামির বেশিরভাগই ছাত্রদলের পদবীধারী নেতা। মাস্টারমাইন্ড রকিব খোদ কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সদস্য। দিনারও বর্তমান জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। জেলা ও মহানগর কমিটির একাধিক পদবীধারী নেতা মামলার উল্লেখিত আসামী। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও রাজু হত্যায় জড়িতদের দলীয় কোনো ব্যাবস্থা নেওয়া হয়নি। ছাত্রদল কিংবা অবিভাবক সংগঠন বিএনপির তরফ থেকে দেওয়া হয়নি কোনো বিবৃতিও। রাজুর নিহত হওয়ার পর দায়সারা ভাবে দুএকজন নেতা তার বাড়িতে গেছেন। স্বজনদের গিয়ে দিয়েছেন সান্তনা। এই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থেকে নির্মম এই হত্যার দায় এড়াতে চেয়েছেন তারা। এদিকে রাজু হত্যার পরপর ছাত্রদলেও ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে।

অছাত্র আর মুষ্ঠিমেয় দুয়েক নেতার আস্থাভাজনদের দিয়ে পকেট কমিটি করা হয়েছে বলে আগেই এ কমিটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন সিলেট ছাত্রদলের বৃহৎ একটি অংশ। গণপদত্যাগও হয়েছিলো। রাজুর হত্যার পর ছাত্রদলের এ ভাঙন আরো ভয়াবহ আকার নিয়েছে। বৃহৎ একটি অংশ রাজু হত্যার বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। পাশাপাশি জড়িত নেতাদের ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে আজীবন বহিষ্কারেরও দাবি ওঠেছে।

বিষয়টি নিয়ে কথা বললে মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, আমরা রক্তের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই। সিটি নির্বাচনে দলের বিজয়ের মুহূর্তে এমন নৃশংস হত্যাকা- কোনোভাবেই সহ্য করার মতো নয়। আমরা খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চার আছি। ইতোমধ্যে দলের বিভিন্ন কমান্ডে শাস্তির বিষয়ে অলোচনা হয়েছে। আমরা মহানগর বিএনপির তরফ থেকেও কেন্দ্রে শাস্তির জন্য কথা বলেছি। ছাত্রদলের পদবীধারী কেউ খুনে জড়িত থাকলে তাদের অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে-বলে জানান নাসিম হোসাইন।

Sharing is caring!

Loading...
Open