দুর্নীতির আতুঁড় ঘর সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস

নিজস্ব প্রতিবেদক::   লাইনে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ফাইল জমা সব জায়গাতেই টাকা লাগে। টাকা না দিলে একটি পাসপোর্ট পেতে গ্রাহকদের কত ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়। সিলেটের দক্ষিণ সুরমার আলমপুরস্থ বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে ‘মার্ক সিন্ডিকেট’ করে চলছে ঘুষ বাণিজ্য।

এখান থেকে দালাল মারফতে অভ্যন্তরীণ লিংক ধরে পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে হয়। সরাসরি জমা দিতে গেলে হয়রানিতে পড়েন গ্রাহকরা। আর দালাল বা ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন জমা দিলেই সহজে মিলে যায় মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট। অবশ্য এর জন্য ভোক্তভোগীদের অতিরিক্ত টাকাও গুনতে হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাধারণ পাসপোর্টের বেলায় তিন হাজার ৪৫০ টাকা এবং জরুরি বা এক্সপ্রেস পাসপোর্ট করতে ছয় হাজার ৯০০ টাকা ফি ব্যাংক চালানে জমা দিয়ে আবেদন করা হয়। আর দালাল মারফত সাধারণ পাসপোর্ট পেতে খরচ হয় আট হাজার এবং এক্সপ্রেস পাসপোর্টে ১০ হাজার টাকা। নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত এ টাকা অফিসে দিতে হয় দালালদের।

সাধারণ আবেদনের পাসপোর্ট পেতে ২২ কার্যদিবস লাগে। কিন্তু মাধ্যম ধরে না গেলে এ পাসপোর্ট পেতে বিলম্ব হয়ে মাস দু’একে গিয়ে দাঁড়ায়। আর জরুরি বা এক্সপ্রেস পাসপোর্ট পেতে সাত কার্যদিবসের স্থলে চলে যায় মাসখানেক। অবশ্য এ জন্য পুলিশ রিপোর্টের বিলম্ব হওয়াকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এদিকে, সিলেট পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদাসীনতার কথা জানালেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষক মোঃ ইউনুছ।

তিনি বলেন, আমি আমারটিসহ পরিবারের সদস্যদের চারটি পাসপোর্টের জরুরি আবেদন করেছিলাম। এর মধ্যে একটি ফাইল মিসিং হয়ে গেছে বলে আমাকে জানানো হয় খুদে বার্তায়। পরে রোববার (০৯ই আগস্ট) সরাসরি অফিসে গেলে বিষয়টি নিয়ে ডিএডি ফরিদের সঙ্গে আমার কথা কাটাকাটি হয়। এসময় কেনো মিসিং হয়ে গেছে জানতে চাইলে, ডিএডি ফরিদ বলেন, চার থেকে পাঁচটি আবেদনের মধ্যে এমন দু’একটি ঘটনা ঘটেই যায়! একপর্যায়ে বিষয়টি উপ পরিচালককে জানালে অফিস সহকারী মোশাররফ ফাইলটি খোঁজে বের করে দেন।

একটি নয়, এমন অনেক হাজারো অভিযোগ সিলেট পাসপোর্ট অফিসের বিরুদ্ধে।

গত ৮ই আগস্ট বিয়ানীবাজারের রিদওয়ান হুসাইন সোনালী ব্যাংকের ৯৯৯৬ রশিদে তিন হাজার ৪৫০ টাকা জমা দিয়ে সরাসরি নতুন পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে যান। কিন্তু প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি ফাইলটি জমা দিতে পারেননি। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (০৬ই সেপ্টেম্বর) তিনি ফাইল জমা দিতে গেলে পেশা প্রাইভেট সার্ভিসের সনদ সংযুক্ত করে দিতে বলা হয় তাকে। পরে তিনি বিভিন্ন অফিসে ধরনা দিয়েও প্রাইভেট সার্ভিসের সনদ জোগাড় করতে পারেননি।

আরেক ভুক্তভোগী সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সহ সভাপতি সাত্তার বলেন, আমার পুরাতন পাসপোর্ট জমা দিয়ে এমআরপি পাসপোর্ট পেতে সরাসরি দু’টি আবেদন আমি অফিসে জমা দিই। পরে অফিস থেকে মুঠোফনে একটি খুদে বার্তা দেওয়া হয় টাকা মিস ম্যাচ হয়েছে। এ নিয়ে গত রোববার (০৯ই সেপ্টেম্বর) আমি কাগজপত্রসহ অফিসের পর্যালোচনা কক্ষে গেলে মোশাররফ নামে একজন ২০০ টাকা দাবি করেন। এক পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে উপ পরিচালকের সঙ্গে দেখা করলে তিনি বলেন, কম্পিউটার থেকে ম্যাসেজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেছে।

সূত্র জানায়, দালাল ও ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে না গেলে ছবি তোলা ও ফিঙ্গার প্রিন্ট দিতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আর সরাসরি জমা দেওয়া ফাইলকে ‘কুত্তা ফাইল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ফেলে রাখা হয়।

অফিসের অভ্যন্তরের কতিপয় কর্মকর্তা, কর্মচারী, আনসার ও পুলিশের সদস্যরা এমন ভোগান্তি সৃষ্টির অন্তরালে রয়েছেন বলেও জানা গেছে।

এসব বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসের উপ পরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, পাসপোর্ট আবেদন খোয়া যাওয়ার কোনো ঘটনা আদৌ নেই। মূলত আবেদন ফরম ভুলবশত বান্ডেল পরিবর্তন হয়ে অন্যটিতে গেলে এমনটি হয়। অবশ্য সময় নিয়ে খোঁজতে হয়। তাছাড়া টাকার মিস ম্যাচের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সার্ভার থেকে ম্যাসেজ যেতে পারে। পরে কর্মকর্তারা ঠিক করেও নেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম নেই। ভোগান্তি লাঘবে সিসি ক্যামেরা বেষ্টিত করা হয়েছে পুরো কার্যালয় এলাকা। যদিও বাইরের দালালদের সঙ্গে অফিসের কর্মচারীদের যোগসূত্র এবং ওয়ান ব্যাংকের দালালদের বিচরণও খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেন তিনি।

Sharing is caring!

Loading...
Open