সিলেট আওয়ামী লীগেও শোকজ আতঙ্কে নেতারা……..

নিজস্ব প্রতিবেদক::
সদ্য সমাপ্ত সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নৌকার ভরাডুবি ঘটেছে। নিশ্চিত জয় হাত ছাড়া হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই তৃণমূল নেতাকর্মীরা পরাজয়ের নেপথ্যে দলীয় নেতাদেরই দায়ী করে আসছিলেন। নৌকার এই পরাজয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীরা এখনো ফুঁসছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

তাদের অভিযোগ, সিলেটে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে নৌকার পক্ষে থাকলেও আড়ালে তারা খেলেছেন ‘ভিন্ন খেলা’। তৃণমূলের নানা অভিযোগে দৃষ্টি পড়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের। এবার নড়েচড়ে বসেছেন দলীয় হাইকমান্ড। দলের ভেতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন। এরই ধারাবাহিকতায় সিসিক নির্বাচনে নৌকার পরাজয়ের নেপথ্যের নায়কদের শীঘ্রই শোকজ করবে কেন্দ্র। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল শনিবার এক পথসভায় দলের ভেতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের শোকজের বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। তাঁর বক্তব্যে অন্য তিনটি জেলার সাথে সিলেটের নামও ওঠে এসেছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যারা দলীয় প্রার্থী এবং প্রতীকের সাথে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করে বিশৃঙ্খলা অর্থাৎ দলের চেইন-অব কমান্ড ভঙ্গ করেছেন তাদেরই শোকজ করা হবে।

এরআগে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে যারা দলের বিরুদ্ধে আত্মবিনাশী কাজ করেছেন তাদের রেহাই নেই বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। গত ৩০ আগস্ট সিলেট নগরীর রেজিস্ট্রারি মাঠে জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষ্যে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত শোকসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, আমি সিলেটে কেবল শোকসভায় ভাষণ দিতে আসিনি। সিসিক নির্বাচন নিয়ে যে সকল অভিযোগ ওঠেছে সেগুলোকে খতিয়ে দেখতেও এসেছি। ধারণা করা হচ্ছে, ওবায়দুল কাদেরের সিলেট সফরের সংগৃহীত তথ্য-উপাথ্যের আলোকে দায়ীদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং শীঘ্রই তাদের শোকজ করা হবে।

এদিকে, নির্বাচনে স্থানীয় পর্যায়ে যেসব আওয়ামী লীগ নেতা কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছিলেন, তাদের অনেকেই জয় পেতে ধানের শীষের প্রার্থীর সাথে গোপনে আঁতাত করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, আওয়ামী লীগের এজেন্ট নিয়োগে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করেননি দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। তাদের এই অদূরদর্শিতার কারণে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকরাও নৌকা প্রতীকের এজেন্ট হয়েছিল। যারা ভোটের দিন ধানের শীষ বা স্বতন্ত্র থেকে প্রার্থী হওয়া জামায়াত নেতার পক্ষে কাজ করে। এরই নেপথ্যে গুটিকয়েক আওয়ামী লীগ নেতারও হাত ছিলো বলে অভিযোগ তৃণমূলের।

সিসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুৎফুর রহমান, সহসভাপতি আশফাক আহমদ, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক বিজিত চৌধুরী, মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, এটিএমএ হাসান জেবুল, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রহমান জামিলসহ স্থানীয় পর্যায়ের শীর্ষ অধিকাংশ নেতার কেন্দ্রে নৌকার পরাজয় ঘটে। এছাড়া যুবলীগ-ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের বাড়ির পাশের কেন্দ্রেও ভরাডুবি ঘটে নৌকার।

সূত্র মতে, সিলেট পৌরসভার চেয়ারম্যান ও পরবর্তীতে সিসিকের টানা ২ বারের মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ টানা দুবার নির্বাচন করে পরাজয় বরণ করেছেন। আর এ পরাজয় এক সময়ে তাঁর সাথে থাকা কাউন্সিলর, পরবর্তীসময়ে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের ব্যবধান ছিলো প্রায় ৩৭ হাজার ভোটের। এবারের নির্বাচনে হারলেও ভোটের ব্যবধান কমে ৬ হাজার ২০১-এ দাঁড়ায়।

সিসিক নির্বাচনে ২০০৩ ও ২০০৮ সালে টানা দু’দফা নির্বাচিত হওয়া বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের পরাজয়ের নেপথ্যে কারণ জানতে নানা ধরণের তথ্য ওঠে আসে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন কামরান তথা নৌকার পরাজয়ের অন্যতম কারণ গোপনে দলীয় নেতাদের বিরোধীতা, একে অন্যের প্রতি সন্দেহ, অতিরিক্ত আত্মবিশ^াস আর দলের কাউন্সিলর প্রার্থীদের অসহযোগিতাই নৌকা প্রতীককে পরাজয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

কামরান অনুসারীদের দাবি, ২০১৩ সালের নির্বাচনে দলীয় কোন্দলের কারণে কামরানের পরাজয় হয়েছিলো। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে ঐক্যবদ্ধ থাকার পরও কামরান বিজয়ী হতে পারেননি।

কামরান অনুসারীদের মতে, সিসিক নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সে নির্দেশনার পর নির্বাচনী মাঠে দলীয় নেতারা প্রকাশ্যে ছিলেন ঐক্যবদ্ধ। অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কারণে কামরান ও তাঁর ঘনিষ্টজনরা দলের নেতাদের প্রতি সন্দেহ পোষণ করেন। এক নেতার কাছ থেকে গোপনে অপর নেতার গতিবিধি সম্পর্কে খবর নেওয়ার বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় অনেক নেতাই প্রচারণা থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেন।

অপরদিকে, ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৫টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। বাকী ১২টি ওয়ার্ডেও দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় স্থানে ছিলো আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা। অথচ ভোটের হিসেবে কামরান বিজয়ী কাউন্সিলরদের ওয়ার্ডেও সুবিধাজনক অবস্থান করতে পারেননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী ও মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদের কেন্দ্র ছাড়া বাকি শীর্ষ নেতাদের অনেকেরই কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছে নৌকা প্রতীক।

কারা শোকজ হচ্ছেন এবং শোকজের নেপথ্যে কী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন? এমন প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, ‘কোনো নির্বাচনে এমন ঐক্যবদ্ধ হতে দেখেননি আওয়ামী লীগকে। যেমন ঐক্যবদ্ধ ছিলেন সিসিক নির্বাচনে। এরপরও যদি কোনো নেতাকর্মী গোপনে নৌকার বিরোধীতা করেন তাহলে কেন্দ্র তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াটাই স্বাভাবিক। বিশ্বাসঘাতক নেতাকর্মী চিহ্নিত হওয়া এবং শাস্তির আওতায় আসা জরুরি।’

Sharing is caring!

Loading...
Open