ইউএস-বাংলা বিমান দুর্ঘটনা পাইলটের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা

সুরমা টাইমস ডেস্ক::    পাঁচ মাস আগে কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজটি বিধ্বস্তের ঘটনার দায় দুর্ঘটনায় নিহত পাইলট আবিদ সুলতানের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে নেপালি ইংরেজি দৈনিক দ্য কাঠমাণ্ডু পোস্ট। ওই দুর্ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ না হলেও তদন্তের একটি কপি হাতে পাওয়ার দাবি করে দৈনিকটি বলছে, গত ১২ মার্চে বিধ্বস্ত ওই উড়োজাহাজের পাইলট আবিদ সুলতান ‘ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মারাত্মক মানসিক চাপ ও উদ্বেগের’ মধ্যে ছিলেন। ওই অবস্থায় তিনি একের পর এক যেসব ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ নিয়েছেন তার পথ ধরেই ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিএস-২১১ বিধ্বস্ত হয়।

কাঠমাণ্ডু পোস্ট লিখেছে, পাইলট আবিদ সুলতান ত্রিভুবনে নামার প্রস্তুতির সময় বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ‘অসত্য’ তথ্য দিয়েছিলেন; এক ঘণ্টার ওই পুরো ফ্লাইটে তিনি ককপিটে বসেই ধূমপান করছিলেন।

তবে নেপাল সরকারের তদন্তদলে থাকা বাংলাদেশের প্রতিনিধি, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ফ্লাইট অপারেশন কনসালট্যান্ট ও এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন গ্রুপের (এএআইজি) প্রধান ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন এম রহমতউল্লাহ কাঠমাণ্ডু পোস্টের প্রতিবেদনকে ‘ভিত্তিহীন’ বলেছেন। তিনি গতকাল সোমবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ ভুয়া ও মিথ্যা সংবাদ। আমি নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা বলেছি। ওরাও অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছে। আমি বলেছি, কাঠমাণ্ডু পোস্টের বিরুদ্ধে তোমরা অ্যাকশন নাও।’ তিনি আরো বলেন, ‘তদন্ত শেষ হওয়া তো দূরের কথা, আমরা কাছাকাছিও যেতে পারিনি। এ সময় এ ধরনের প্রতিবেদন কাম্য নয়। এটা পুরোপুরি ভুয়া নিউজ। পাইলট আবিদ সুলতানের মেডিক্যাল রিপোর্টে আমরা ত্রুটি পাইনি।’

এদিকে তদন্ত শেষ না হওয়ার আগে এ ধরনের প্রতিবেদনকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ আড়াল করার অপচেষ্টা বলে উল্লেখ করেছে ইউএস-বাংলা। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বেসরকারি এই এয়ারলাইনস বাংলাদেশের গণমাধ্যম, যাত্রী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি ‘মনগড়া ও ভিত্তিহীন’ প্রতিবেদনে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ করছে।

বিবৃতিতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (পাবলিক রিলেশনস ও মার্কেটিং সাপোর্ট) মো. কামরুল ইসলাম উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী (আইকাও কর্তৃক প্রণীত) যেকোনো দুর্ঘটনা-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এ ধরনের অসমর্থিত মতামত প্রকাশ কোনো গণমাধ্যমের কাছেই কাম্য নয়। আইকাও এনেক্স ১৩-এর নিয়মানুসারে নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এবং বিমান চলাচল বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় এ দুর্ঘটনা বর্তমানে তদন্তাধীন। একটি দুর্ঘটনা তদন্তাধীন অবস্থায় এ ধরনের প্রতিবেদন দুটি অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। এক. অযাচিতভাবে এয়ারলাইনস এবং ক্রুদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। দুই. দুর্ঘটনা ঘটে থাকার প্রকৃত কারণকে আড়াল করার চেষ্টা। ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ দ্য কাঠমাণ্ডু পোস্টের প্রতিবেদনকে ‘দুরভিসন্ধিমূলক’ বলে মনে করে।

দুর্ঘটনার পরপরই নেপালের ইংরেজি দৈনিক নেপালি টাইমস কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে পাইলটের সর্বশেষ কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। নেপালি পত্রিকাটি তখন বলছিল, কন্ট্রোল রুম থেকে ভুল বার্তা দেওয়ার কারণেই ককপিটে দ্বিধায় পড়েন পাইলট। রানওয়ে ০২ ও ২০ নিয়েই এ দ্বিধা সৃষ্টি হয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের ছয় কর্মকর্তাকে পরদিন (১৩ মার্চ) অন্যত্র বদলি করে। ইউএস-বাংলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ তখন দাবি করেন, ‘কাঠমাণ্ডু এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) টাওয়ারের পক্ষ থেকে গাফিলতি ছিল। তারা আমাদের পাইলটদের ভুল বার্তা দিয়েছে। সে কারণেই এ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। তারা আমাদের পাইলটকে মিসলিড করেছে ভুল রানওয়েতে ল্যান্ড করার জন্য।’ ত্রিভুবন বিমানবন্দরের এটিসি টাওয়ারের ভুল বার্তার ব্যাপারে ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ দেশটির অপর ইংরেজি দৈনিক দ্য হিমালয়ান টাইমস এক প্রতিবেদনে বলে, এটিসি টাওয়ার থেকে প্রায়ই পাইলটদের কাছে এ ধরনের ভুল বার্তা দেওয়া হয়। ওই সময় হিমালয়ান টাইমসকে বিমানের একাধিক পাইলট জানান, তাঁরা প্রায়ই এটিসি টাওয়ার থেকে আবহাওয়াসংক্রান্ত ভুল বার্তা পান।

ঢাকা থেকে ৬৭ জন যাত্রী ও চারজন ক্রু নিয়ে রওনা হয়ে ১২ মার্চ দুপুরে কাঠমাণ্ডুতে নামার সময় বিধ্বস্ত হয় ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজটি। এতে ৫১ জনের মৃত্যু হয়, যাদের মধ্যে ২৭ জন বাংলাদেশি।

Sharing is caring!

Loading...
Open