সিলেটে রক্তের রঙ্গ বিজয়ের আনন্দকে করে তুলেছে বিষাদময়…….!

নিজস্ব প্রতিবেদক::     নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী। দেশের অন্যান্য সিটি নির্বাচনে ধানের শীষের ভরাডুবির পর সিলেটের বিজয়ে উৎফুল্ল ছিল বিএনপি। সিলেটে দলটির নেতাকর্মীরা মত্ত ছিলেন বিজয় উৎসবে। ঠিক এরকম সময়ে নিজ দলীয় ক্যাডারদের হাতে খুন হয়েছেন মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহ-প্রচার সম্পাদক ফয়জুল হক রাজু। রক্তের রঙ বিজয়ের আনন্দকে করে তুলেছে বিষাদময়। ছাত্রদলের এই আচমকা হত্যাকান্ডে এখন বিব্রত সিলেট বিএনপি।

সিসিকের চতুর্থ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে ছয় হাজারের বেশি ভোটে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বিজয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গত শনিবার রাতে মিছিল সহকারে নগরীর কুমারপাড়াস্থ বাসায় ফিরেন আরিফ। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে আরিফের বাসা থেকে একটি মোটরসাইকেলে ফিরছিলেন ছাত্রদল নেতা ফয়জুল হক রাজু, উজ্জ্বল ও সালাহ লিটন।

আরিফের বাসার গলি থেকে বেরিয়ে কুমারপাড়া পয়েন্টে আসার পর তাদের ওপর হামলা চালায় কয়েকজন যুবক। দা দিয়ে কোপানো এবং স্টাম্প দিয়ে আঘাত করা হয় তাদেরকে। হামলাকারীরা পালিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাজুকে মৃত ঘোষণা করেন। রাজু নগরীর উপশহর এ-ব্লকের ৯নং রোডের ১২নং বাসার ফজর আলীর ছেলে। এমসি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।

আরিফের বাসায় যখন বিজয় উৎসব চলছিল, তখন এই হত্যাকান্ডে হতবাক হয়ে পড়েন বিএনপি নেতারা। বিজয় উৎসব মুহুর্তেই রূপ নেয় বিষাদে। স্তম্ভিত বিএনপি নেতারা হন ক্ষুব্ধ। রাজু খুনের খবর পেয়ে রাতেই ওসমানী হাসপাতালে ছুটে যান নবনির্বাচিত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ বিএনপি নেতারা। কাল রবিবার সকালে ফের হাসপাতালে যান আরিফ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন মিলন। এসময় সেখানে উপস্থিত থাকা ছাত্রদল নেতাকর্মীরা কিছুদিন আগে ঘোষিত জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের কমিটি বাতিলের দাবি তুলেন। এছাড়া আরিফ-মিলনকে ঘিরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিহত রাজুর চাচা দবির আলী।

রাজু হত্যাকান্ড নিয়ে তার চাচা দবির আলী বলেন, ‘বিএনপি-ছাত্রদলের প্রতিহিংসার রাজনীতির বলি হয়েছে রাজু। যারা তাকে হত্যা করেছে, তাদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হোক। আমরা যেন ন্যায়বিচার পাই।’

এদিকে, ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে বিরোধের জেরে এই হত্যাকা- ঘটেছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। গত ১৩ জুন ১৮ সদস্য বিশিষ্ট জেলা ছাত্রদলের কমিটি ও ২৯ সদস্য বিশিষ্ট মহানগর ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। এই কমিটি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। কমিটি থেকে কয়েকজন পদবীধারী পদত্যাগও করেন। সিটি নির্বাচনের জন্য এই বিরোধ কিছুটা চাপা পড়লেও নির্বাচন শেষ হতেই রক্ত ঝরলো। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাহবুবুল হক চৌধুরী হামলায় নিহত রাজু এবং আহত অপর দুজন ছাত্রদলের বিদ্রোহী পক্ষের বলে জানিয়েছেন।

অভিযোগ ওঠেছে, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রকিব চৌধুরীর গ্রুপই রাজু হত্যাকান্ডে জড়িত। তবে কাল বিকেলে এই গ্রুপের সাথে জড়িত জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আলতাফ হোসেন সুমন, সাধারণ সম্পাদক দিলোয়ার হোসেন দিনার, মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি সুদীপ জ্যোতি এষ ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী আহসান যৌথ বিবৃতি দিয়ে রাজু হত্যাকান্ডের বিচার চেয়েছেন। তারা দাবি করেছেন, সিটি নির্বাচনে ধানের শীষের বিজয়ে দিশেহারা হয়ে ‘সরকারদলীয় পোষা এজেন্টরা’ এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে।

রাজু হত্যাকান্ডের বিষয়ে জেলা ছাত্রদলের পদত্যাগী সিনিয়র সহ-সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সিলেটে বারবার হত্যাকা-ের পরও দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। যার কারণে দলীয় লোকই দলীয় নেতাকর্মীদের হত্যার হুলিখেলায় মেতে ওঠেছে।’ রাজু হত্যার প্রতিবাদে সিলেটের পদবঞ্চিত বিদ্রোহী ছাত্রদল পাঁচদিনের কর্মসূচি দিয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে, রাজু হত্যাকান্ডে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে বিএনপি। সিটি নির্বাচনে বিজয়ের আনন্দের রেশের মধ্যেই এই হত্যাকান্ড ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছে। এই হত্যাকা- দলের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা।

এ বিষয়ে সিলেট মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি সালেহ আহমদ খসরু বলেন, ‘এটি একটি মর্মস্পর্শী ঘটনা। এই ঘটনায় শুধু বিএনপি নেতারাই নয়, নগরবাসীও বিব্রত। ছাত্রদলের মধ্যে যে বিভ্রান্তি জন্ম নিয়েছে, এর মধ্যে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। এই ঘটনা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। বিএনপিকে দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

নবনির্বাচিত সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘রাজু আমার জন্য নির্বাচনে কাজ করেছে। যারা আমার নির্বাচনকে সহ্য করতে পারেনি, তারাই প্রশ্নবিদ্ধ করতে এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। এই হত্যার সাথে যে-ই জড়িত থাকুক, তাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

Sharing is caring!

Loading...
Open