সংসদ নির্বাচন ঘিরে আসছে আগ্নেয়াস্ত্র

সুরমা টাইমস ডেস্ক:: আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অস্ত্রের চোরাচালান বেড়েছে বলে মনে করছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বাহিনীগুলোর নিয়মিত অভিযানে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হলেও ঠেকানো যাচ্ছে না এই অস্ত্র চোরাচালান।

স্থানীয় ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে সরবরাহের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার বৈষ্ণবনগর, মোয়াজ্জেমপুর, কালিয়াচক, গোলাপগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় গড়ে উঠেছে অস্ত্র তৈরির ছোট ছোট কারখানা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতে ছোট ছোট অস্ত্র কারখানা গড়ে ওঠার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা। এসব কারখানায় মূলত লেদ মেশিনে তৈরি করা হচ্ছে এসব অস্ত্র। পরে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে এসব আগ্নেয়াস্ত্র পাচার করা হচ্ছে বাংলাদেশে। সবচেয়ে বেশি অস্ত্রের চালান আসে সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার সীমান্ত পথে। বিশেষ করে সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা, মনাকষা, বিনোদপুর ও শাহাবাজপুর ইউনিয়নের সীমান্ত পথে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও বিস্ফোরক দ্রব্য পাচার হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ২০১৬ সালে রাজধানীর হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে দেশে আনা হয়েছিল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশে পাচারের জন্য ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অস্ত্র কারখানা থাকার বিষয়টি আমরাও জানি। বিভিন্ন সময় পতাকা বৈঠকে বিষয়টি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কর্মকর্তাদের কাছে একাধিকবার তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু এর প্রতিকার মেলেনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারতের কারখানায় উৎপাদিত আগ্নেয়াস্ত্রের গায়ে মেড ইন ইউএসএ খোদাই করে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে।’

বিজিবি সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে শিবগঞ্জ উপজেলার কিরণগঞ্জ সীমান্তের পাকাটোলা গ্রামের একটি বাড়ি থেকে তিনটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ছয় রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে বিজিবি। কিন্তু এত কিছুর পরও থামানো যাচ্ছে না অস্ত্র চোরাচালান। সম্প্রতি চোরাচালানীরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এসব অস্ত্র বহন করে নিয়ে যাওয়ার সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ধরা পড়েছে এই জেলার অধিবাসীরা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত থেকে একটি চালান ঢাকায় পৌঁছে দিতে পারলে বাহকরা পায় পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা। সামান্য টাকার জন্য ঝুঁকি নিয়ে এই কাজে জড়িয়ে পড়েছে সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে আরো জানা গেছে, শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, বিনোদপুর ও শাহাবাজপুর ইউনিয়নের একাধিক প্রভাবশালীর নেতৃত্বে চলছে অস্ত্র ব্যবসা। প্রভাবশালী এই অস্ত্র ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের চাহিদা মোতাবেক বিশ্বস্ত বাহকের মাধ্যমে অস্ত্রের চালান পৌঁছে দেয় দেশের বিভিন্ন এলাকায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অস্ত্রের চালানসহ বাহকরা ধরা পড়লেও হোতারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত এক বছরে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র, ৫০০ রাউন্ড গুলি ও বিপুল পরিমাণ গানপাউডার উদ্ধার করেছে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি। এসব ঘটনায় ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিজিবি চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫৯ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. রাশেদ আলী বলেন, ‘গত বছরে বিজিবি সদস্যরা এই জেলার সীমান্তে ২৩টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। এ বছর আট মাসে উদ্ধার করেছে ২৬টি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অস্ত্র চোরাচালান বাড়তে পারে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার টি এম মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অস্ত্রের চোরাচালান বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি নজরে রেখে অস্ত্র কারবারিদের ধরতে সক্রিয় রয়েছে পুলিশ।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ র‌্যাব ক্যাম্পের কমান্ডার স্কোয়াড্রন লিডার সাঈদ আব্দুল্লাহ আল মুরাদ জানান, অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছেন তাঁরা। গত আট মাসে র‌্যাবের অভিযানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৩টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অস্ত্র চোরাচালান প্রতিরোধে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

Sharing is caring!

Loading...
Open