আমি আমার নগরবাসীর কছে কৃতজ্ঞ : আরিফ

নিজস্ব প্রতিবেদক::

সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমি আমার নগরবাসীর কছে কৃতজ্ঞ। তাদের মূল্যবান ভোট আজ আবারও আমাকে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করেছে। এখন নগরবাসীর সেবা ও উন্নয়নে আমি আরও বেশি মনোযোগী হব ইনশাল্লাহ।
আরিফ আরো বলেন, আজ যেভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে, এর ভোটের হিসাব দেখেই প্রকৃত চিত্র সহজে অনুমান করা যায়। গত ৩০ জুলাই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন হলে আমি বিপুল ব্যবধানে জয়ী হতাম। ভোটারদের উপর আমার আস্থা ছিল বলেই তারা আজ প্রতিদান দিয়েছেন।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের টানা দ্বিতীয় বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হলেন বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেটের নির্বাচন অফিসের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামান বেসরকারী ভাবে তাকে মেয়র ঘোষণা করেন। আরিফ যে মেয়র হতে যাচ্ছেন তা আগেই জেনেছিলেন নগরবাসী। শুধুমাত্র স্থগিত দুটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ভোটের পরিসংখ্যান আর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষারই অবসান হল এ ঘোষণার মাধ্যমে।

গতকাল (১১ই আগস্ট) শনিবার সন্ধ্যায় সিলেট নির্বাচন কমিশনের আঞ্চলিক কার্যালয়ের হল রুমে এক সংবাদ সম্মেলনে স্থগিত দুটি কেন্দ্রে ভোট গণনা শেষে সিলেট নগরীর নতুন মেয়রের নাম ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা আলীমুজ্জামান। আলীমুজ্জামান জানান, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডে ১৩৪টি কেন্দ্রে ভোটার ছিলেন ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ জন। এর মধ্যে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৯২ হাজার ৫শত ৮৮টি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। তিনি ভোট পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৩শত ৯২টি। অর্থাৎ ৬ হাজার ১৯৬ ভোট বেশি পেয়ে বেসরকারী ভাবে সিলেটের মেয়র হলেন আরিফুল হক চৌধুরী।

ঘোষণার পরপরই উপস্থিত নেতাকর্মীরা আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়েন। এবং ‘ভি’ চিহ্ন প্রদশন করে শ্লোগান দিতে থাকেন।

এ সময় আলীমুজ্জামান আরো জানান, আমরা দুইবারের ভোট গ্রহণ করেছি। গত ৩০ জুলাই ১৩২টি কেন্দ্রের ফলাফল চুড়ান্ত করতে পেরেছিলাম আজ বাকি ২টি কেন্দ্রের ফলাফল চুড়ান্ত করেছি। সর্বমোট ১৩৪টি কেন্দ্রের ভোটারদের ভোট পেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ৭ মেয়র প্রার্থী। তিনি জানান, স্বতন্ত্র প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টেবিল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে মোট ভোট পেয়েছেন ১১ হাজার। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ডা. মো. মোয়াজ্জেম হোসেন খান হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ২০৮টি। বাংলাদেশ সমাজ তান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত প্রার্থী মো. আবু জাফর মই প্রতীক নিয়ে ভোট পেয়েছেন ৯০৯টি। স্বতন্ত্র প্রার্থী এহসানুল হক তাহের হরিণ প্রতীক নিয়ে ভোট পেয়েছেন ৩১৪টি এবং বাস প্রতীক নিয়ে ৫৯২ ভোট পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. বদরুজ্জামান সেলিম।
আলীমুজ্জামান জানান, সিসিক নির্বাচনে সর্বমোট বৈধ ভোটের সংখ্যা ১ লক্ষ ৯৪ হাজার ৩ এবং অবৈধ কিংবা বাতিল ভোট ৭ হাজার ৪৮৪টি । এছাড়াও সর্বমোট প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ২লক্ষ ১ হাজার ৪৮৭টি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্থগিত এ দুই কেন্দ্রের মধ্যে নগরীর গাজী বুরহানউদ্দিন গরম দেওয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আরিফ পান ১০৫৩ ভোট এবং কামরান পান ৩৫৪ ভোট। এবং হবিনন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আরিফ পান ১০৪৯ ভোট এবং কামরান পান ১৭৩ ভোট। এই দুই কেন্দ্রে মোট ৪ হাজার ৭শত ৮৭টি ভোটের মধ্যে ধানের শীষের মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী পেয়েছেন ২১০২ ভোট। অন্যদিকে তাঁর নিকটতম আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান পেয়েছেন মাত্র ৫২৭ ভোট।

স্থগিত দুই কেন্দ্র ছাড়া বাকি সব কেন্দ্রের সম্মিলিত ভোট গণনায় মেয়র পদে এগিয়ে ছিলেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী ১৩২ কেন্দ্রের মধ্যে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছিলেন ৯০ হাজার ৪৯৬ ভোট।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরান নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৮৭০ ভোট। তার চেয়ে ৪ হাজার ৬২৬ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন আরিফ। মেয়র নির্বাচিত হতে আরিফের প্রয়োজন ছিলো মাত্র ৮১ ভোট।

এর আগে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসীল অনুযায়ী গত ৩০ জুলাই দিনভর উৎসব আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সিসিক নির্বাচনের মোট ১৩৪ কেন্দ্রের মধ্যে ১৩২ কেন্দ্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও অনিয়মের কারণে নগরীর গাজী বুরহানউদ্দিন গরম দেওয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হবিনন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। ফলে ৪ হাজার ৬২৬ ভোটে এগিয়ে থাকার পরও আরিফের মেয়র হওয়ার ভাগ্য ঝুলে থাকে স্থগিত এ দুই কেন্দ্রের নির্বাচনের ওপর।

এদিকে গতকাল শনিবার (১১ই আগস্ট) সকাল ৮টা থেকে ওই দুই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার পর বেলা ১০ টার দিকে নগরীর গাজী বুরহানউদ্দিন গরম দেওয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র দখলের অভিযোগ পাওয়া গেলেও এর আধঘণ্টা পর দায়িত্বশীল ম্যাজিস্ট্রেটের হস্তক্ষেপে আবার তা দখলমুক্ত হয়। এরপর থেকেই চলে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ। তবে একই ভোটকেন্দ্র থেকে জাল ভোটার সন্দেহে ৫ জনকে আটক করা হয়। এছাড়া হবিনন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণে হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে আগে থেকে সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন।

স্থগিত হওয়া গাজী বুরহান উদ্দিন গরম দেওয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার ছিল ২ হাজার ২২১ জন, আর হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটার ২ হাজার ৫৬৬ জন। সব মিলিয়ে এই দুই কেন্দ্রে ভোটার ছিলেন ৪ হাজার ৭৮৭ জন।

সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামান বলেন, সর্বত্র শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠভাবে পুনঃ ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তিনি নতুন মেয়র আরিফুল হককে শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন জানান।

নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সিলেটের সর্বসাধারণের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আলীমুজ্জামান বলেন, দীর্ঘ ৬১দিন নির্বাচনী এই কার্যক্রমে আমরা অংশগ্রহণ করেছি। রিটার্নিং অফিসার হিসেবে আমি আপনাদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। আমাকে এই কাজে সার্বিক ভাবে সহযোগিতা করেছেন সিলেটের আপামর জনগণ, সম্মানিত প্রার্থীগণ, সকল মিডিয়ার সাংবাদিকগণ আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সকল বিভাগের কাছে। যাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় এই নির্বাচন সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণবাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।

২০০২ সালে সিলেট পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হয়। চারদলীয় জোট সরকার আমলে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তখন আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী হিসেবে বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বিজয়ী হয়েছিলেন। পরে ২০০৮ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় দ্বিতীয়বার বিজয়ী হয়েছিলেন কামরান। ২০১৩ সালের ১৫ জুন তৃতীয় নির্বাচনে ‘পরিবর্তন’ আওয়াজ তুলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী ৩৫ হাজার ১০০ ভোটের ব্যবধানে কামারানকে হারিয়েছিলেন। আরিফুল হক পেয়েছিলেন ১ লাখ ৭ হাজার ৩৩০ ভোট। বদরউদ্দিন আহমদ কামরান পেয়েছেন ৭২ হাজার ২৩০ ভোট। তাঁদের ভোটের ব্যবধান ছিল ৩৫ হাজার ১০০।

Sharing is caring!

Loading...
Open