“সিজারের কাজ ব্লেডে: নবজাতকের মৃত্যু, বাঁচতে লড়ছেন মা”

তাহিরপুর প্রতিনিধি :: সিজারের কাজ ব্লেডে করতে গিয়ে দুই পল্লী চিকিৎসকের হাতে নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। আর প্রসূতি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

তার নাম নাম শৌমরী বর্মন (২২)। তিনি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বড়খলা গ্রামের খলাহাটির সুজিত বর্মনের স্ত্রী।

সোমবার এই অপচিকিৎসার ঘটনা ঘটে। পল্লীচিকিৎসকরা হলেন, বড়খলা গ্রামের লালমোহন বর্মন ও বালিজুরি গ্রামের নুরুল আমিন। তারা দুজনেই বালিজুরি বাজারের পল্লী চিকিৎসক। ঘটনার পর থেকে দুই পল্লীচিকিৎসক বিষয়টি অর্থের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।

প্রসূতির পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোববার ভোর রাতে শৌমরী বর্মণের প্রসব ব্যথা উঠলে সোমবার সকালে গ্রামের পল্লীচিকিৎসক লালমোহন বর্মনকে ডাকা হয়। তিনি প্রথমে প্রসূতিকে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও কিছুক্ষণ পর জানান, নিজেই শৌমরী বর্মণের গর্ভের সন্তান প্রসাব করাবেন। এই বলে তিনি পরিচিত আরেক পল্লীচিকিৎসক নুরুল আমিনকে ফোন করে আনেন। তারপর দুজনেই প্রসূতিকে পরীক্ষা করে বলেন, শৌমরী বর্মনের পেটের সন্তান মৃত। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে গিয়ে লাভ নেই, তারাই সন্তান বের করবেন। কিন্তু এসময়  গ্রামের ধাত্রী রাজু বেগম ও প্রসূতি নিজেই জানান, সন্তান মৃত নয় জীবিত আছে। গর্ভের সন্তান নড়াচড়া করছে বলে তিনি অনুভব করতে পারছেন। তবুও দুই পল্লীচিকিৎসক জোর গলায় দাবি করেন গর্ভের সন্তান মৃত, তাই মৃত সন্তন দ্রুত বের করতে হবে। এই বলে তারা প্রসূতিকে কোন প্রকার অচেতন না করেই জরায়ুর মুখ কেটে সন্তান বের করেন। সন্তান বের করার সময় তার মাথার বেশ কিছু অংশ কেটে যায়। তড়িঘড়ি করে তারা নবজাতকের মাথায় ৫টি সেলাই করেন এবং দাবি করেন সন্তান মৃত। কিন্তু পরিবারের লোকজন দেখতে পায় জন্ম নেয়া ছেলে নবজাতকটি জীবিত ও নড়াচড়া করছে। তাৎক্ষণিক তাকে পাশের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পথে বিশম্ভপুর থানার সামনে তার মৃত্যু হয়।

এদিকে শৌমরী বর্মনের অধিক রক্তক্ষরণ হলে তার জরায়ুর মুখে ১৭টি সেলাই করেন দুই চিকিৎসক। পরে রোগীর অবস্থা বেগতিক হলে দ্রুত তাকে বিশম্ভপুর হাসপাতালে ভর্তি করে পরিবারের লোকজন ।

প্রসূতির স্বামী সুজিত বর্মন বলেন, আমাদের গ্রামের ধাত্রি রাজু বেগম ও আমার স্ত্রী বার বার বলেছে সন্তান জীবিত। আমরা সুনামগঞ্জের যেতে চাইছিলাম। কিন্তু লালমোহন ও নুরুল আমিন জোর গলায় সবাইকে ধমক দিয়ে বলেছে সন্তান মৃত। ব্লেড দিয়ে কেটে সন্তান বের করার পর দেখা যায় বাচ্চা জীবিত ও নড়াচড়া করছে। পরে  হাসপাতালে নেয়ার পথে বাচ্চাটি মারা গেছে।

তিনি আরও বলেন, দুই পল্লী চিকিৎসকের কারণেই আমার বাচ্চার মৃত্যু হয়েছে। এখন তারা আপোষের চেষ্টা করছে ও মামলা-মোকদ্দমা না করার জন্য নানাভাবে চাপ ও হুমকি দিচ্ছে।

পল্লীচিকিৎসক লালমোহন বর্মণ বলেন, আমি প্রথম রোগী দেখার পর বলেছি তোমরা সুনামগঞ্জে চলে যাও। পরিবারের লোকজনই বলেছে, নুরুল আমিনকে অনুরোধ করে আনার জন্য। নুরুল আমিন এসে বলেছে, বাচ্চার নড়াচড়া কম, মহিলার একলামসিয়া হয়েছে। পরে নুরুল আমিন জরায়ু কেটে বাচ্চার মাথা বের করেছেন। বাচ্চার মাথায় সেলাইও দিয়েছেন তিনি। আমি কিছুই করিনি।

পল্লীচিকিৎসক নুরুল আমিন বলেন, লালমোহনই আমাকে অনুরোধ করে নিয়েছে। যাওয়ার পর দেখি বাচ্চার নড়াচড়া নেই। মহিলার একলামসিয়া চলে এসেছিল। বাচ্চা আগেই মৃত ছিল। পরে ফরসেফ দিয়ে বাচ্চা বের করি। তবে মহিলার জরায়ুর মুখে কোন কাটাছেড়া করিনি।

তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ইকবাল হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। পরিবার ও আশপাশের লোকজনের সাথে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, গ্রামের পল্লীচিকিৎসক দাবি করেছেন সন্তান মৃত। কিন্তু ধাত্রী ও সন্তানের মা জানিয়েছিলেন সন্তান জীবিত। দুই পল্লীচিকিৎসক সন্তান মৃত দাবি করে ছুরি-কাঁচি দিয়ে কেটে সন্তান বের করার চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, এই দুই পল্লীচিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন বা প্রশিক্ষণ আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। তারা দুঃসাহস দেখিয়েছে। এই ঘটনায় আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তাহিরপুর থানার ওসি নন্দন কান্তি ধর বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open