শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর ফের ছাত্রলীগের হামলা, আহত ১০

সুরমা টাইমস ডেস্ক::    কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা, আটককৃতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিঃশর্ত মুক্তি ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভ মিছিলে ফের হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগের শিক্ষক লাঞ্ছিত ও অন্তত ১০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

আজ রবিবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দের ব্যানারে’ ওই বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ। এতে শিক্ষকদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক খান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজীমউদ্দীন খান, অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদীসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, কোটা সংস্কার আন্দোলকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলা, আটককৃতদের নিঃশর্ত মুক্তি ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে বেলা ১১টায় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধনের ডাক দেয় বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তবে ১১টা বাজার আগেই শহীদ মিনারের পাশে আইন অনুষদের সামনে ছাত্রলীগের বিভিন্ন হল শাখার নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। এ সময় ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানার নিয়ে শহীদ মিনারে বেশ কয়েকজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এর মধ্যে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের উপ মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক আল মামুন ছিলেন। এর কিছু সময় পরে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধনে অংশ নিতে শহীদ মিনারে জড়ো হতে শুরু করেন। এ সময় ফাহমিদুল হকসহ অন্যান্য শিক্ষকরাও সেখানে উপস্থিত হন। ছাত্রলীগের গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ ও বেগম বদরুন্নেসা কলেজের শিক্ষার্থীরাও সেখানে উপস্থিত হয়ে অবস্থান নিতে দেখা যায়। পরে পৌনে ১২টার দিকে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী, নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা শহীদ মিনারের বেদীর সামনে ব্যানার নিয়ে মানববন্ধনে দাঁড়ান। এ সময় কোটা আন্দোলনে নিপীড়িত শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সচেতন শিক্ষার্থীবৃন্দদের মানববন্ধনস্থলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল শাখার নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নেন। পরে দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি মানববন্ধন করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানায়, মানববন্ধনে শিক্ষকরা বক্তব্য দেওয়ার সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের দিকে মাইক তাক করে উচ্চস্বরে বিভিন্ন কটুক্তি করতে থাকে। ‘পাকিস্তানি রাজাকার শিক্ষকদের বহিষ্কার করতে হবে’, ‘শিক্ষকরা জামায়াত-শিবিরের দোসর’-এসব বলে উত্যক্ত করতে থাকে। পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির এক পর্যায়ে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। কটুক্তি শুনে শিক্ষকরা তার বিচারের দাবি জানান। বিচার না হওয়া পর্যন্ত শহীদ মিনারে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানানোর ঘোষণা দেন। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও সেখানে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দেন। পরে তানজিম উদ্দীন খান ও ফাহমিদুল হক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সেখানে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে শিক্ষকরা পিছিয়ে গেলে আবার দুই পক্ষই সেখানে অবস্থান করতে থাকেন। এক পর্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ওই স্থান থেকে সরে একটি মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের দিকে রওনা দিলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও তাদের পিছু নেয়। মিছিলটি শিববাড়ি মোড়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আবাসিক ভবন বঙ্গবন্ধু টাওয়ারের কাছে এসে পৌঁছালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিলে ঢুকে পথ আটকে দাঁড়ান। এমন সময় ছাত্রলীগের জহুরুল হক শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বে ১০-১৫ জনের একটি দল এসে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। পরে শিক্ষকরা বাঁধা দিতে গেলে তাদেরকে লাঞ্ছিত করে। এ সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন, উপ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক আল মামুন, কেন্দ্রীয় সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য তানভীর হাসান সৈকত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ সভাপতি রুম্মান হোসেন, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস, সাংগাঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলম, সহ সভাপতি মিলন হোসেনসহ ঢাকা কলেজের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে হামলায় অংশ নিতে দেখা যায়। হামলায় অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। এ সময় তারা(নেতাকর্মী) সাংবাদিকদের মোবাইল ও ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে হামলার মুখে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরদের মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় শহীদ মিনারের সামনের রাস্তায় স্যার এফ রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান তুষারের নেতৃত্বে মেয়েদের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আবার শহীদ মিনারে অবস্থান নেন।

এদিকে মারধরের ঘটনার পরে শহীদ মিনারে শিক্ষকদের অবস্থানের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা সবাইকে চলে যেতে মাইকিং করেন। পরে সহকারী প্রক্টর আবু হোসেন মুহম্মদ আহসান ও সোহেল রানা সেখানে উপস্থিত হয়ে অবস্থানরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরকে সেখান থেকে নিয়ে যান।

হামলার বিষয়ে অধ্যাপক ফাহমিদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদ ও মুক্তির দাবি জানাতে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছি। মানববন্ধন চলাকালীন সময়ে তারা আমাদেরকে গালি দিয়েছে। রাজাকার ও দালাল বলেছে। পরে আমরা শহীদ মিনার ত্যাগ করে রাজু ভাস্কর্যের দিকে যেতে গেলে আমাদের ওপর হামলা চালায়। শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করেন। আমি এই ঘটনার নিন্দা ও বিচার দাবি করছি।

হামলার বিষয়ে আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের ক্যাম্পাসে আমরা নিরাপদ নয়। কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে বা ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করতে আসলে ছাত্রলীগ দিয়ে আমাদের ওপর হামলা করা হচ্ছে।

তবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন বলেন, হামলাকে কখনও ছাত্রলীগ সমর্থন করে না। শহীদ মিনার এলাকায় হামলায় ছাত্রলীগের কেউ ছিল না। তবে ছাত্রলীগের কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে যেতে পারে। ছাত্রলীগের কর্মীরা সবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী, পরে ছাত্রলীগ। তবে ছাত্রলীগের কেউ যদি জড়িত থাকে তাহলে আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব। তবে আমি নিশ্চিত সেখানে ছাত্রলীগের কেউ ছিল না।

এ ঘটনার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর একে এম গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, শহীদ মিনারে শিক্ষক-শিক্ষার্থী যারাই ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেখানে প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা গিয়ে সবাইকে সরে যেতে বললে তারা অসহযোগিতা করেন। এ সময় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেখানে ছাত্র-শিক্ষক যারাই ছিলো তাদের সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Sharing is caring!

Loading...
Open