আরিফকে ঠেকাতে সিলেট মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক বিরোধ চরমে…….!

বিশেষ প্রতিবেদন::    সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। বিএনপির বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য নেতাদের বিরোধ এখন তুঙ্গে। আরিফের প্রতিপক্ষ নেতারা মনোনয়ন বোর্ডেও তার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এই নেতারা এখনও আরিফুল হক চৌধুরীর মনোনয়ন ঠেকাতে এককাট্টা হয়ে কাজ করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (২১শে জুন) দলের মনোনয়ন বোর্ডে সাক্ষাতকার দিয়েছেন আরিফুল হক চৌধুরীসহ সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী, সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, সহ-সভাপতি ও প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, মহানগর নেতা ছালাহউদ্দিন রিমন। সাক্ষাতকার দেওয়ার সময় আরিফুল হককে মনোনয়ন না দেওয়ার দাবি জানান নাসিম হোসাইন, আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী, বদরুজ্জামান সেলিম, রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও ছালাহউদ্দিন রিমন। মনোনয়ন বোর্ডে সাক্ষাতকার দেওয়ার সময় তাদের সবারই অবস্থান ছিল আরিফুল হকের বিরুদ্ধে। এই পাঁচ মনোনয়নপ্রত্যাশীর দাবি— আরিফুল হক ছাড়া সিলেট সিটি নির্বাচনে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হোক।

অন্যদিকে, আরিফুল হক চৌধুরীর দাবি, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পুনরায় অংশ নেওয়ার জন্য তাকে প্রস্তুতি নিতে বলেছে বিএনপির মনোয়ন বোর্ড। তবে মনোনয়ন বোর্ডে সাক্ষাতকার দানকারী মহানগর বিএনপির অন্য নেতারা আরিফের এ দাবি সত্য নয় বলে জানিয়েছেন। নাসিম হোসাইন, আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী, বদরুজ্জামান সেলিম, রেজাউল হাসান কয়েস লোদী ও ছালাহউদ্দিন রিমন জানান, আরিফুল হকের ব্যাপারে তাদের অভিযোগ শুনে দলের মনোয়ন বোর্ডের মধ্যেই বিভক্তি দেখা দেয়। এসময় দলের কেন্দ্রীয় নেতারা আরিফুল হকের কাছে এসব অভিযোগের সত্যতার ব্যাপারে নানা প্রশ্নও করেন।

এই পাঁচ মনোনয়নপ্রত্যাশী আরও জানান,সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি থেকে কে মনোনয়ন পাচ্ছেন, তা জানাবে কেন্দ্রীয় কমিটি। এর মধ্যে আরিফুল হকের বিরুদ্ধে সিলেট মহানগর বিএনপির নেতাদের অবস্থান জানানো হবে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে।

এদিকে, সিলেট মহানগর বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা জানান, একটা সময় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একাধিবার প্রার্থী দিয়েও জয় পায়নি বিএনপি; বরং বিপুল ভোটে হেরেছে। কিন্তু ২০১৩ সালের ১৫ই জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পরিবর্তন আর উন্নয়নের স্লোগান নিয়ে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন আরিফ।

এবারও যদি আরিফুল হককে বিএনপি থেকে মনোয়ন দেওয়া হয়, তবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে তার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে, যেটা অন্য কাউকে প্রার্থী করলে হবে না। সিলেট মহানগরীর উন্নয়নে আরিফুল হক যে ভূমিকা রেখেছেন, সেটাও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে তার লড়াইয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে। তবে এসব যুক্তি মানতে নারাজ মহানগর বিএনপির অন্য অংশের নেতাকর্মীরা।

সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘আরিফকে সিটি নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোয়ন দেওয়া হয়েছে, একথা কোনোভাবেই সত্য নয়। আমরা যারা দল থেকে নির্বাচন করতে মনোনয়ন চেয়েছি, তাদের শুধু সাক্ষাতকার নিয়েছে মনোয়ন বোর্ড। এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সবার দাবি ছিল, এবারের সিটি নির্বাচনে বিএনপি থেকে আরিফ ছাড়া অন্য কাউকে প্রার্থী দেওয়া হোক। সেটা হলে সবাই সেই প্রার্থীর জন্য কাজ করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আরিফ দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। এমনকি, সিলেটে দলের আন্দোলন-সংগ্রামে তার ভূমিকা একেবারেই নেই।’

সেলিম বলেন, ‘আরিফ আমার বন্ধু। তবে আমি মনে করি, বন্ধুত্ব ও রাজনীতির জায়গা আলাদা। আমি বা আমরা দলের স্বার্থে তার বিরুদ্ধে রয়েছি। আরিফ মেয়র থাকাকালীন দলের সংকটে কোনও নেতাকর্মী তাকে পাশে পায়নি।’

মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি ও প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেন, ‘দলের মনোয়ন বোর্ড যখন আমাদের সাক্ষাৎ নেয়, তখন আমাদের সবারই অবস্থান ছিল বর্তমান মেয়র আরিফুল হকের বিরুদ্ধে। কারণ, তিনি নেতাকর্মী বান্ধব নন, যদিও তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। সিলেটে তিনি দলের জন্য কোনও ভূমিকাই পালন করেননি। এমনকি, ৫ জানুয়ারি আগে ও পরে সিলেট বিএনপি যে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, তাতে তার বিন্দুমাত্র ভূমিকা নেই।’

লোদীর অভিযোগ, ‘একবার বক্তব্য রাখার জন্য মেয়র আরিফ পুলিশের গাড়ি করে সমাবেশে যান। এরপর বক্তব্য দিয়ে আবার পুলিশের গাড়ি করে করপোরেশনে ফিরে যান। আমরা মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন না দিতে দলের নীতি-নির্ধারকদের অনুরোধ করেছি। তার বাইরে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, আমরা সবাই তার পক্ষে কাজ করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিএনপি সমর্থিত একজন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র। কিন্তু আরিফুল হক দেশের বাইরে একাধিকবার গেলেও আমাকে দায়িত্ব দেননি। বরাবরই তিনি আমার বিরোধিতা করেছেন। আমাকে আদালত থেকে দায়িত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিলেও কৌশলী আরিফুল হক আমার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। সিলেটে আরিফুল হককে দিয়ে দলের কোনও লাভ হবে না। কারণ, আরিফুল হক দলবান্ধব নেতা নন।’

মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম জালালী পংকী বলেন, ‘আরিফ বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে নেতাকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বিজয়ী হয়ে মেয়র হন। এরপর তিনি নেতাকর্মীদের কাছ থেকে দূরে সরে যান। তার কাছ থেকে সিলেট বিএনপি যা পাওয়ার কথা ছিল, তা পায়নি। আমরা চাই, এবার আরিফ ছাড়া অন্য কাউকে দল থেকে মনোয়ন দেওয়া হোক।’

সিলেট সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপি একটি বৃহৎ দল। এখানে নেতাকর্মীদের মধ্যে মত-বিরোধ থাকতেই পারে, এটা স্বাভাবিক। দলের আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম কিনা, এটা একমাত্র মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরাই বলতে পারবেন। দল ও সিলেটের জন্য বিএনপি থেকে যাকেই প্রার্থী করা হবে, আমি তার পক্ষেই কাজ করবো। দলের মনোয়ন বোর্ডের কাছে সাক্ষাতকার দেওয়ার সময় আমাকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।’

অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অভিযোগের ব্যাপারে আরিফ বলেন, ‘সিলেট মহানগর বিএনপি থেকে মেয়র পদে মনোনয়ন চান –এমন পাঁচ নেতা দলের মনোয়ন বোর্ডের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগের ব্যাপারে আমি আমার পক্ষ থেকে যথাযথ উত্তরও দিয়েছি।’

Sharing is caring!

Loading...
Open