নিউইয়র্কে মূলধারার রাজনীতি এবং একজন হাসান আলী


ইউএসএনিউজঅনলাইন.কম : আজ প্রবাসে মূলধারার রাজনীতি একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। নিউইয়র্কে যে ক’জন বাঙালীর হাত ধরে মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশী-আমেরিকানদের সংযোগ স্থাপিত হয় হাসান আলী তাদের অন্যতম। ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসী হওয়া হাসান আলী এই ধারার পথিকৃৎ।

মূলধারাসহ বাঙালী কমিউনিটিতে হাসান আলী রেখেছেন সৃজনশীলতার অনন্য স্বাক্ষর। হাসান আলী তাঁর সৃজনশীল কর্মপ্রবাহে সমৃদ্ধ করে চলেছেন মূলধারায় বাংলাদেশীদের। খ্যাতিমান এই সংগঠক দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে নিউইয়র্কে মূলধারায় কমিউনিটি বিকাশে নিয়োজিত। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন, কমিউনিটির অধিকারসহ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি নিবেদিতপ্রাণ। বাংলাদেশ সহ এশিয়ান কমিউনিটির অধিকার রক্ষায় ১৯৯১ সালে নিউইয়র্ক সিটির পুলিশ ডিপার্টমেন্টে গঠিত এশিয়ান-আমেরিকান এডভাইজারী কাউন্সিলের তিনি ছিলেন কো-চেয়ারম্যান। ১৯৯৪ সালে নিউইয়র্ক সিটির কনজুমার্স ডিপার্টমেন্টে এশিয়ান আমেরিকান এডভাইজারী কাউন্সিলের কো-চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ১৯৯৫ সালে নিউইয়র্ক সিটির হাইওয়ে সেফটি কমিশনে এশিয়ান আমেরিকান এডভাইজারী কাউন্সিলের অনারারী সদস্য, ১৯৯২ সালে কুইন্স ডিষ্ট্রিক্ট অফিসে এশিয়ান-আমেরিকান এডভাইজারী কাউন্সিলের কো-চেয়ারম্যান এবং ১৯৯২ সালে নিউইয়র্কের গভর্ণর মারিয়ো কমোর অফিসে এশিয়ান এফেয়ার্স গঠনে বিশেষ ভুমিকা রাখেন।

১৯৯১ সালে নিজের গড়া অর্গানাইজেশন অব বাংলাদেশী আমেরিকান্সের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হাসান আলী। ২০১৬ সালে গঠিত আমেরিকান-মুসলিম পলিটিকেল একশন (অগচঅঈ) কমিটি ও গ্লোবাল ভিলেজ লিডারশিপ কমিটির আহবায়ক হাসান ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক লেখক ফোরাম ইউএসএ গঠন করেন।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের সময় মেয়র ডেভিড ডিনকিন্সের সহায়তায় সিটি হলের ব্লুরুমে একটি প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সাহায্যের আবেদন জানান। ২০০৫ সালে বাংলাদেশকে ডিউটি ফ্রি বানিজ্য সুবিধা দেওয়ার জন্য কংগ্রেসে বিল ঐ.জ ৮৮৬ উত্থাপন করেন (যদিও লবিংয়ের অভাবে বিলটি পাশ হয়নি)। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে ফারাক্কার বিষয়ে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি, ২০০৩ সালে বাংলাদেশের নাম স্পেশাল রেজিষ্ট্রেশন থেকে বাদ দেওয়ার জন্য কংগ্রেসম্যান এলিয়ট এঙ্গেলের সাথে বৈঠক করেন, ২০০৫ সালে বাংলাদেশী-আমেরিকানদের বিরুদ্ধে হেইট ক্রাইম প্রতিরোধে নিউইয়র্ক সিটির পুলিশ হেড কোয়ার্টারে হেইট ক্রাইম টাস্কফোর্সের সার্জেন্টের সাথে বৈঠক করেন। ১৯৯১ সালে নভেম্বর মাসে এষ্টোরিয়ায় চুরি ডাকাতি বৃদ্ধি পেলে ১১৪ নম্বর প্রিসেঙ্কটের ক্যাপ্টেন মিঃ থমাসের সাথে একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা করেন, নিউইয়র্ক সিটিতে বাংলা ভাষা প্রচলনের (১৯৯৪-২০১৫) জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ছাত্র জীবন থেকেই বঙ্গবন্ধুর অনুসারী হাসান আলী ২০০৫ সালে নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক লাইব্রেরী মসোল ব্রাঞ্চে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের ওপর ডিভিডি সহ অনেকগুলো বই দান করেন।


কর্মবীর হাসান আলীর অন্যান্য কর্ম তৎপরতার মধ্যে রয়েছে ১৯৯২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বিল ক্লিন্টনের কনভেনশন কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের শপথ অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। ১৯৯৬ সালে ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল ষ্টিয়িরিং ক্যাম্পেইন কমিটি ক্লিনটন/গোর এর সদস্য হন। ১৯৯৬ সালে এশিয়ান-আমেরিকান হেরিটেজ মাস উপলক্ষে মার্কিন ট্রেজারী সেক্রেটারী (অর্থ মন্ত্রী) এর অফিসে আমন্ত্রণ পান। ২০০২ সালে নিউইয়র্ক স্টেট ডেমোক্রেটিক কাউন্টি কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৩ সালে কমিউনিটি বোর্ডের মেম্বার নিযুক্ত হন। জাতিসংঘের এনজিও (ঘএঙ) প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯২-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অনারারী কিচেন কেবিনেটে মেম্বার হন। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন। ১৯৯১ সালে আমেরিকান মাইনোরিটিদের অধিকার আদায়ে কংগ্রেসের ব্লাক ককাসের সহায়তায় জাতিসংঘের হিউমেন রাইটস কমিশনারের সাথে আলোচনায় অংশ নেন।

কমিউনিটির কল্যাণে অসামান্য অবদানের জন্যে হাসান আলী বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। ২০০৬ সালে নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিল থেকে সমাজ সেবায় স্বীকৃতি স্বরূপ প্রক্লেমেশন প্রদান করা হয় তাকে। ২০১৮ সালে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে নিউইয়র্ক স্টেটের এসেম্বলির পক্ষ থেকে ৩৬ বছরের কমিউনিটি সার্ভিসের জন্য প্রক্লেমেশন প্রদান করা হয়। ২০১২ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন থেকে তৎকালীন এম্বেসেডার ড. এ কে আবদুল মোমেন বাংলাদেশের কল্যাণে কাজ করার জন্য হাসান আলীকে সম্মাননা প্রদান করেন। ২০১৬ সালে প্রবাসীদের অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখার জন্য লেখক ফোরমের পক্ষ থেকে নাজমুল ইসলাম মকবুল সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ পোয়েট্স ক্লাব ২০১৭ সালে সংগঠনের চেয়াম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি।
অর্গানাইজেশন অব বাংলাদেশী আমেরিকানস’র চলতি বছরের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বক্তারা আমেরিকার মূলধারার সাথে বাঙালিদের সেতুবন্ধন রচনার জন্য হাসান আলীর অবদানের কথা উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানে মাফ মিসবাহ উদ্দীন আমেরিকার মূলধারার সাথে বাঙালিদের প্রথম সংযোগ স্থাপনে ভূমিকার জন্য হাসান আলীর অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রতিবছর ২৫ মার্চ অ্যাসালের স্পন্সরে হাসান আলী ডে পালনের ঘোষনা দেন।

হাসান আলী ১৯৫৩ সালে হবিগজ্ঞ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের উমর পুর গ্রামে এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম সিদ্দীক আলী ও মাতা চান বিবি। স্ত্রী হাফসা বেগম ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচিত মেম্বার। এ দম্পতি মহসিনা হাসান ও মারজান হাসান নামে এক কন্যা এবং এক পুত্র সন্তানের জনক-জননী। মহসিনা হাসান সেন্ট জন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মাসি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী এবং মারজান হাসান ফরডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ফাইনেন্সের ছাত্র।
হাসান আলী জালাল পুর প্রাইমারী স্কুল, সৈয়দ পুর বাজার ফাজিল মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। আউশকান্দি হাই স্কুল থেকে ১৯৭৬ সালে মেট্রিক, সিলেট এমসি কলেজ থেকে ১৯৭৭-১৯৭৮ সালে আইএসসি পাশ করেন। নিউইয়র্কের চধপব টহরাবৎংরঃু ও ঝঃ. ঔড়যহ’ং টহরাবৎংরঃু থেকে ১৯৮৮-১৯৮৯ সালে বিজনেস ডিপ্লোমা করেন। তরুণ বয়সেই দেশ ছাড়েন হাসান আলী। আইএসসি পাশ করার পর ১৯৭৯ সাল থেকে জার্মানীতে প্রবাস জীবন শেষে ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসী হন। পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে।

Sharing is caring!

Loading...
Open