” ‘লিডার’ এর প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা “

অহী আলম রেজা ::     আব্দুস সামাদ আজাদ। ত্রিকালদর্শী এক রাজনীতিবিদ। ব্রিটিশ আমলে ছাত্ররাজনীতি, পাকিস্থান আমলে রাজপথ-আন্ডাগ্রাউন্ড আর স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতির অন্যতম নীতিনির্ধারক। ছিলেন জাতির পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ট সহচর। সুনামগঞ্জের ঠিক হাওরের মাঝ থেকে এসেছেন উপমহাদেশের রাজনীতিতে। খুব কাছ থেকে দেখেছেন হাওরপাড়ের মানুষের সুখ দুঃখ, হাসি-কান্না। মানুষকে ভালোবেসেই আজীবন রাজনীতি করেছেন। হয়েছেন জনতার নেতা। সিলেট অঞ্চলে ‘লিডার’ বললেই যার অবয়ব চোখের সামনে ভেসে উঠে তিনি আব্দুস সামাদ আজাদ। এ অঞ্চলের মাটি ও মানুষের নেতা ছিলেন তিনি। মানুষকে যেমন ভালোবাসা দিয়েছেন তেমনি ভালোবাসা পেয়েছেন দলমত নির্বিশেষে।

জাতীয় এ নেতার মৃত্যুবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকলেও উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে সুনামগঞ্জ আওয়ামী লীগ। একটি আলোচনাসভার আয়োজন করতে পারেনি সুনামগঞ্জ আওয়ামী লীগ। সুনামগঞ্জে অনেকেই আব্দুস সামাদ আজাদের আদর্শের সন্তান দাবি করলেও তারা মৃত্যুতারিখটিও মনে রাখেন নি।

শুক্রবার জাতীয় এ নেতার ১৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়। সকালে বনানী কবরস্থানে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য মোজাফফর হোসেন পল্টু, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এনামুল হক শামিম, কেন্দ্রীয় সদস্য রেজাউল করিম কাওছার। এছাড়া যুবলীগের পক্ষে সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ, ছাত্রলীগের পক্ষে সাইফুর রহমান সোহাগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের পক্ষে মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাওছার পুস্পার্ঘ অর্পণ করেন। সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট, সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগের আহবায়ক খায়রুল হুদা চপল, যুগ্ম আহবায়ক আসাদুজ্জামান সেন্টু ও ঢাকা উত্তর- দক্ষিণ যুবলীগের নেতৃবৃন্দ পুস্পার্ঘ অর্পণ করেন।

বিকেলে সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আব্দুস সামাদ আজাদ স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্মৃতি সংসদের সভাপতি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, সাবেক সিটি মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সভাপতিত্বে বক্তারা বলেন, আবদুস সামাদ আজাদ একটি নাম, একটি ইতিহাস। বিভিন্ন সময় দেশের দুর্যোগে-দুঃসময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জাতীয় এ নেতাকে খুব বেশি শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর দিক নির্দেশনা শুনতেন। আওয়ামী লীগে আবদুস সামাদ আজাদ ছিলেন এক বটবৃক্ষ। একাত্তর সালে মুজিব নগর সরকারের সময় আবদুস সামাদ আজাদ সারা বিশ্বে বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন সৃষ্টি করেন। আব্দুস সামাদ আজাদের মতো নেতা আজ দেশের  বড় প্রয়োজন।

আব্দুস সামাদ আজাদ স্মৃতি সংসদের সদস্য সচিব ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আ. ন. ম. শফিকুল ইসলাম চৌধুরীর পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক বিজিত চৌধুরী, যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট শাহ মোশাহিদ আলী, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম কামাল, দপ্তর সম্পাদক মো. সায়ফুল আলম রুহেল, মহানগর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক সামসুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রনজিৎ সরকার, শ্রমিক নেতা জাফর আহমদ চৌধুরী, মো. আব্দাল মিয়া, এ. আর. সেলিম, বশির উদ্দিন, আওয়ামীলীগ নেতা সালেহ আহমদ সেলিম, ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল ইসলাম, মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আলম রুমেন, মহানগর স্বেচ্ছাবেক লীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাংশু দাস মিঠু, আওয়ামীলীগ নেতা কয়েস উদ্দিন আহমদ, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপু, ফারুক আহমদ, সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক যুগ্ম সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া মাসুক, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা গোলাম হাসান চৌধুরী সাজন, আব্দুর রকিব জুয়েল, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক কামরুল ইসলাম প্রমুখ।

জগন্নাথপুরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ, ছাত্রলীগের উদ্যোগে আব্দুস সামাদ আজাদ অডিটোরিয়ামে আলোচনাসভা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি, পৌরমেয়র আব্দুল মনাফের সভাপতিত্বে ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জয়দ্বীপ সূত্রধর বীরেন্দ্রর পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি ও চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান চৌধুরী সুফি মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদ সদস্য সৈয়দ সাব্বির মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বকুল, উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য নুরুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান মো. আঙ্গুর মিয়া, সাবেক শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক তাজউদ্দিন, কাউন্সিলর মো. আবাব মিয়া, সুহেল আহমদ, জগন্নাথপুর বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. জাহির উদ্দিন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব, পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ছালিক আহমদ পীর, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সিদ্দিকুর রহমান, শেখ মামুন হোসেন, হোসাইন আহমদ টিটু, সৈয়দ আকমল হোসেন তানিন, জাহাঙ্গীর আলম,  উপজেলা যুবলীগ নেতা আনা মিয়া, আনোয়ার কোরেশী ছাত্রলীগ নেতা তৈয়বুর রহমান সিতু, হুমায়ুন খান, শাহীন মিয়া সুমন, মিটন দেব, হাসানুর রহমান হাসান, সাইফুর রহমান সোহাগ।

এ ছাড়া মসজিদে মসজিদে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। মন্দিরেও বিশেষ প্রার্থনা করা হয়েছে। সকালে জগন্নাথপুরের মিরপুরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের উদ্যোগে মিলাদ ও শিরণী বিতরণ করা হয়। সুনামগঞ্জে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

৬৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ৫১ বছরই তিনি ছিলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। জন মানুষের সুখ-দুঃখের সারথি ছিলেন আবদুস সামাদ আজাদ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে পাঠ নেয়া আবদুস সামাদ আজাদ ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সকল আন্দোলনে অগ্রপথিক।

আবদুস সামাদ আজাদ যখন সুনামগঞ্জে রাজনীতি করতেন তখন তিনিই সিদ্ধান্ত নিতেন। কাকে দিয়ে রাজনীতি করাতে হবে তা ভাবতেন। বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আবদুস সামাদ আজাদকে নেতা মেনেই আওয়ামী লীগে এসেছিলেন।

আজীবন তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কখনো রাজপথ, কখনো জেল জীবন কখনো আন্ডারগ্রাউন্ড। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন মিছিলের অগ্রভাগে। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক মান ছিল আকাশ ছোয়া। সামাদ আজাদ অন্য কোন গ্রহের মানুষ ছিলেন না। তিনি প্রায়ই বলতেন, আমি গ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষ। হাওর-বাওড় অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ থেকে এসেছি। গ্রামের মানুষের জীবন-যাপন আমার চাইতে কে ভালো বুঝবে?

তিনি বলতেন ‘আমি তো বর্ধিত জীবন নিয়েই বেঁচে আছি। আমার সহযোদ্ধা তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী, কামরুজ্জামানের সহযাত্রী হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ৩ নভেম্বর ’৭৫ ছিল আমার মৃত্যুদিবস। কিন্তু মহান করুনাময় আমাকে জালেমদের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের এক চরম ক্রান্তি লগ্নে হাল ধরেছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদ। জাতির জনক হত্যাকান্ড, জেল হত্যাকান্ড, সামরিক শাসনের দাঁতাল পেশীশক্তি যখন আওয়ামী লীগকে ভীষণ দুর্বল করে তুলেছিল, তখন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই হয়ে পড়েছিলেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। সে সময়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন সামাদ আজাদ। তাঁর অসিম ধৈর্য, প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতার ফলেই ১৯৭৮-৭৯ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ প্রাণ পেতে শুরু করেছিল পুরোমাত্রায়। সে সময় গ্রামে গ্রামান্তরে তিনি আপামর জনসাধারণকে সাহস দিয়ে যা বলতেন তা হচ্ছে, আওয়ামী লীগকে কেউ ষড়যন্ত্র করে নিশ্চিহ্ন করতে পারবে না। মুজিব হত্যার বিচার বাংলাদেশে হবেই। তাঁর সে স্বপ্ন যে বাস্তবতার পরশ পেয়েছে তা বাংলাদেশের জনগণ শ্রদ্ধার সাথেই স্মরণ করবেন।

আজীবন সংসদীয় গনতন্ত্রের জন্য লড়াই করে গেছেন আব্দুস সামাদ আজাদ। তিনি খুব গর্ব করতেন যে তাঁর হাত দিয়েই ১৯৯৬ সালে সংসদীয় গনতন্ত্রে পুনঃ প্রত্যাবর্তনের বিলটি সংসদে উপস্থাপিত হয়।

আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন হাওর পারের মানুষ। হাওর পারের মানুষদের তিনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন। তিনি বুঝেছিলেন তাদের অন্তরের কথা। ১৩ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই মহান নেতার প্রতি  বিনম্র শ্রদ্ধা।

Sharing is caring!

Loading...
Open