“কেমন আছে ইলিয়াস আলীর জন্য জীবন দেয়া সেই ব্যক্তিদের পরিবার?”

অতিথি প্রতিবেদক ::     বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ‘নিখোঁজ’ এম ইলিয়াস আলীর জন্য জীবন দিলেও ভালো নেই নিতেদের পরিবার। ২০১২ সালের ২৩শে এপ্রিল ইলিয়াস আলীর সন্ধানে আন্দোলনে নেমে নিহত হন উপজেলা যুবদল নেতা মনোয়ার হোসেন, ছাত্রদল নেতা সেলিম আহমদ ও বিএনপি কর্মী রিকশাচালক জাকির হোসেন নিহত হয়। ৬ বছরে এসে অভাব-অনটনে দিন কাটছে নিহতদের পরিবারের। প্রথমদিকে বিএনপিসহ বিভিন্ন লোকজন খোঁজখবর নিলেও এখন আর খবর রাখে না কেউ।

সাহায্য সহযোগিতাও আর তেমন কেউ করে না। দলের পক্ষ থেকেও খোঁজখবর নেয়া প্রায় বন্ধ বলেই জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

নিহত সেলিমের বাড়ি উপজেলার অলংকারী ইউনিয়নের শাবান টেংরা ও মনোয়ারের বাড়ি সদর ইউনিয়নের রাজনগর মোল্লারগাঁও গ্রামে গেলে কথা হয় তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে।

সেলিমের মা হাসিনা বেগম (৫০) বলেন, দুঃসহ জীবনযাপন করছি আমরা। সেলিম নিহত হবার পরে বিএনপি ও অন্য অনেকের কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা পেলেও এখন কেউ আর তেমন একটা খবর নেয়না। প্রতি ঈদের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে উপহারসামগ্রী ও ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনার পক্ষ থেকে কিছুটা আর্থিক সহযোগিতা পেয়ে আসছি। অর্থাভাবে সেলিমের আদরের ছোট বোনের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে। একই কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রয়েছে বেঁচে থাকা তার একমাত্র ছোটভাইও। তাদের দু’জন ও সেলিমের আব্বার চিকিৎসার জন্যে বিএনপি নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সহযোগিতা পাইনি। নিজে পরের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালাচ্ছি।

একই কথা জানান নিহত মনোয়ারের মা রেনু বেগম (৬৫)। তিনি বলেন, গত রোজার ঈদে অন্যবারের মত পাঁচ হাজার টাকা দেন ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। এছাড়াও তারেক রহমানের পক্ষ থেকে দেয়া হয় উপহার সামগ্রী। তবে স্থানীয় বিএনপির কেউ আমাদের তেমন একটা খোঁজ খবর নেন না। মনোয়ারের বেঁচে থাকা একমাত্র ভাই ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত দিলোয়ার ছোটখাটো একটি মুদি দোকান দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছে।

এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে নিহত সেলিম ও মনোয়ারের মা তাদের সন্তান হত্যার বিচার দাবি করেন। তবে, ২০১২ সালের ২৩শে এপ্রিলের ঘটনায় নিহত বিএনপি কর্মী রিকশাচালক জাকিরের পরিবার সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে বসবাস করায় তাদের বক্তব্য নেয়া যায়নি।

এব্যাপারে কথা হলে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিলু মিয়া বলেন, দলের জন্য, নেতার জন্যে যারা প্রাণ দিয়েছে, তাদের পাশে আমরা সব সময়ই আছি। তাদেরকে সহযোগিতা করে যাচ্ছি।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, নিহত জাকিরের মাকে ঘর নির্মাণের ব্যবস্থা করে দেবো আমরা।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম. ইলিয়াস আলীর সহধর্মীনি তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, বিএনপি এবং আমার পক্ষ থেকে নিহত সেলিম, মনোয়ার ও জাকিরের পরিবারকে সহযোগিতা করে আসছি। জাকিরের পরিবারকে বসতভিটাও কিনে দেয়া হয়েছে। তবে, সেলিমের বোনের লেখাপড়া বন্ধের বিষয়টি কেউ আমাকে জানায়নি। আপনার কাছ শুনেছি, এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করব।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ২৩শে এপ্রিল এম ইলিয়াস আলীর সন্ধানে আন্দোলনে নামে ইলিয়াস প্রেমীরা। এ দিন বিশ্বনাথে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীসহ কয়েক হাজার মানুষ আন্দোলনে নামে। ওইসময় তারা মিছিল সহকারে উপজেলা সদরে প্রবেশ করতে চাইলে বাঁধা দেয় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ। মিছিলকারীরা বাঁধা ডিঙ্গাতে চাইলে শুরু হয় সংঘর্ষ। উত্তেজিত মানুষজন হামলা চালায় উপজেলা পরিষদে। এসময় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসায়-জিপগাড়িতে (সিলেট-ঘ ১১-০২৩৮), বিভিন্ন ব্যাংক, মার্কেট, কমিউনিটি সেন্টার, বিপনিবিতানে হামলা-ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এতে উপজেলা পরিষদের ১৯টি দপ্তরের ১ কোটি ৬২ লাখসহ প্রায় ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। সংঘর্ষে উপজেলা যুবদল নেতা মনোয়ার হোসেন, ছাত্রদল নেতা সেলিম আহমদ ও বিএনপি কর্মী রিকশাচালক জাকির হোসেন নিহত হয়। গুলিবিদ্ধ হন ছাত্রদল নেতা সাহেল সামাদ, জুবায়ের আহমদ, যুবদল নেতা রফিক। গুরুতর আহত হন বিশ্বনাথ থানার তৎকালিন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) চান মিয়া, নায়েক সাধন চাকমা, জামালসহ অর্ধশতাধিক লোক।

হরতালের প্রথম দিন ২২শে এপ্রিল ও ২৩শে এপ্রিলের ঘটনায় পুলিশ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি চালক বাদী হয়ে পৃথক পৃথক ছয়টি মামলা বিশ্বনাথ থানায় দায়ের করে। এতে উপজেলার আটটি ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালিন চেয়ারম্যানসহ প্রায় চৌদ্দ হাজার ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়। ছয়টির মধ্যে পাঁচটি মামলা ইতিমধ্যেই নিষ্পত্তি হয়েছে।

Sharing is caring!

Loading...
Open