কী আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ছয়টি ধারায়…….?

সুরমা টাইমস ডেস্ক::

এবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এর ছয়টি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন এডিটরস কাউন্সিল। এর মধ্যে আলোচিত ৩২ ধারা তো রয়েছেই, এরসঙ্গে আইনটির ২১, ২৫, ২৮, ৩১ ও ৪৩ ধারা নিয়েও আপত্তি রয়েছে সংবাদপত্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের।

আজ বৃহস্পতিবার (১৯শে এপ্রিল) আইন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশগ্রহণের পর সাংবাদিকদের কাছে এই আপত্তির কথা তুলে ধরেন এডিটরস কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহাফুজ আনাম।

তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এর ২১,২৫,২৮,৩১,৩২ ও ৪৩ ধারা সম্পর্কে এডিটরস কাউন্সিলের আপত্তি রয়েছে। এডিটরস কাউন্সিল মনে করে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এর এই ছয়টি ধারা বিদ্যমান থাকলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। তবে এডিটরস কাউন্সিল এ-ও মনে করে যে আলাপ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এই ছয়টি ধারা সংশোধন করে প্রণয়ন করলে তা হবে একটি যুগোপযোগী আইন। কারণ, সম্প্রতি দেশে সাইবার ক্রাইম অত্যধিক হারে বেড়েছে। সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে এই আইনটি খুবই প্রয়োজন।’

এর পরিপ্রেক্ষিতে দেখে নেওয়া যেতে পারে কী আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ওই ছয়টি ধারায়:-

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২১ ধারা:-

এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনও ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে কোনও প্রকার প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা চালান বা উহাতে মদত প্রদান করেন, তাহলে অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন৷

যদি কেউ এই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ সংঘটন করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা তিন কোটি টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারা:-

এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনও ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনও ইলেকট্রিক বিন্যাসে,- (ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে, এমন কোনও তথ্য প্রেরণ করেন যা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক, (খ) এমন কোনও তথ্য সম্প্রচার বা প্রকাশ করেন, যা কোনও ব্যক্তিকে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ করিতে পারে (গ) মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্ত্বেও কোনও ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্ত বা হেয় প্রতিপন্ন করবার অভিপ্রায়ে কোনও তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, বা (ঘ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করবার বা বিভ্রান্তি ছড়াবার উদ্দেশ্যে, অপপ্রচার বা মিথ্যা বলে জানা থাকা সত্ত্বেও কোনও তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, প্রচার বা সম্প্রচার করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই অপরাধ যদি দ্বিতীয়বার বা বার বার সংঘটন করেন তাহা হইলে তিনি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৮ ধারা:-

এই ধারাটি মূলত ওয়েবসাইটে বা কোনও ইলেকট্রিক বিন্যাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনও তথ্য প্রকাশ, সম্প্রচার, ইত্যাদি বিষয়ক। এতে বলা হয়েছে:: (১) যদি কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করবার উদ্দেশ্যে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহলে তিনি সাত বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই অপরাধ যদি একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা বার বার সংঘটন করেন, তাহলে তিনি দশ বছরের কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ৩১ ধারা:-

এটি মূলত আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো ইত্যাদির অপরাধ ও দণ্ড। এতে বলা হয়েছে::

‘(১) যদি কোনও ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটার উপক্রম হয়, তা হলে ওই ব্যক্তির এ ধরনের কাজ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি কোনও ব্যক্তি এ ধরনের কোনও অপরাধ করেন তাহলে তিনি সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর একই ধরনের অপরাধ পুনরায় করলে তার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড হবে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ৩২ ধারা:-

এ ধারায় কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির সাজার বিধান রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে,‘যদি কোনও ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনও সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনও সংস্থার কোনও ধরনের অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করতে সহায়তা করেন তাহলে ওই ব্যক্তির এ ধরনের কাজ কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ।

এর জন্য ১৪ বছরের জেল এবং ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কেউ এ ধরনের অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বার বার ঘটালে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে বা উবয় ধরনের দণ্ডে দন্ডিত হবেন।

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ৪৩ ধারা:-

এ ধারার মূল বিষয়বস্তু পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতার। এ আইনের উপধারা ১-এ বলা হয়েছে, ‘যদি কোনও পুলিশ কর্মকর্তার বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে কোনও স্থানে এই আইনের অধীনে কোনও অপরাধ সংঘটিত বা হচ্ছে বা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো,নষ্ট হওয়া, মুছে পরিবর্তন বা অন্য কোনও উপায়ে দুষ্প্রাপ্র্য হওয়ার বা করার সম্ভাবনা রয়েছে, তাহা হলে অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করে, নিম্নবর্ণিত কার্য সম্পাদন করতে পারবেন—

ক) ওই স্থানে প্রবেশ করে তল্লাশি এবং প্রবেশে বাধাপ্রাপ্ত হলে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ

খ) ওই স্থানে তল্লাশিকালে প্রাপ্ত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার্য কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেম, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, তথ্য-উপাত্ত বা অন্যান্য সরঞ্জামাদি এবং অপরাধ প্রমাণে সহায়ক কোনও দলিল জব্দকরণ,

গ) ওই স্থানে উপস্থিত যে কোনও ব্যক্তির দেহ তল্লাশি,

ঘ) ওই স্থানে উপস্থিত কোনও ব্যক্তি এই আইনের অধীনে কোনও অপরাধ করেছেন বা করছেন বলে সন্দেহ হলে ওই ব্যক্তিকে গ্রেফতার।

(২) উপ-ধারা (১) এর অধীন তল্লাশি সম্পন্ন করার পর পুলিশ কর্মকর্তা তল্লাশি পরিচালনার রিপোর্ট ট্রাইব্যুনালের কাছে দাখিল করবেন।

এ আইনটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংসদের স্থায়ী কমিটি যখন বৈঠকে বসবে তখন এডিটরস কাউন্সিলের প্রতিনিধিকে সেখানে উপস্থিত রাখা হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে প্রণীত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনটি (আইসিটি অ্যাক্ট) যুগোপযোগী করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এ উদ্দেশ্যে তৈরি করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটির খসড়া গত ২৯শে জানুয়ারি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের পর তা অনুমোদিত হয়ে এখন সংসদে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে। বর্তমানে আইনটি নিয়ে সংসদের স্থায়ী কমিটিতে যাচাই-বাছাই চলছে। তবে আগের আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আপত্তি ছিল। আইনটির এই ধারাটির অপব্যবহার নিয়েও হরহামেশা প্রশ্ন উঠছিল। এ অবস্থায় নতুন আইনটি সাংবাদিকবান্ধব হবে বলে আইনমন্ত্রী ঘোষণা দিলেও নতুন আইনটির ৩২ ধারাটি নিবর্তনমূলক দাবি করে এটি নিয়ে আপত্তি তোলে সাংবাদিক সংগঠনগুলো। এ অবস্থায় গত ২৫শে মার্চ আইনটির ২১, ২৫,২৮ ও ৩৫ ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ১০টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও তাদের প্রতিনিধিরা। সচিবালয়ে আইনমন্ত্রীর কাছে উদ্বেগ প্রকাশের পর ধারাগুলো নিয়ে আরও পর্যালোচনা করা হবে বলে তাদের জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

Sharing is caring!

Loading...
Open