ফেসবুকে এখনো সবাইকে কাঁদাচ্ছে হবিগঞ্জের বিউটি……..

নিজস্ব প্রতিবেদক::

বিউটির লাশটা যেখানে পড়ে ছিল তার চারপাশে সবুজ ঘাস, আর বিউটির গায়ে লাল জামা। সবুজের বুকে লাল, যেন প্রিয় স্বদেশের প্রতিচ্ছবি! ধর্ষিতা বিউটি বিচার পায়নি, তাই তাকে পুনরায় ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে। স্বাধীনতার মাসে যখন উন্নয়নশীলতার উৎসব করছি আমরা তখন বিউটির এ ঘটনা বড্ড বেমানান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘটনাটি মর্মান্তিক কিন্তু মোটেও নতুন নয়। এ দেশে অনেক ধর্ষিতারাই বিচার পায় না। ধর্ষকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ক্ষমতা, নিদেনপক্ষে ক্ষমতার প্রভাব। সেই ক্ষমতা কিংবা প্রভাবের সিঁড়ি বেয়ে উতরে যায় ধর্ষকরা। প্রথমবার ধর্ষণের শিকার হয়ে মামলা করেছিলেন বিউটি কিন্তু ধর্ষক গ্রেপ্তার হয়নি। দ্বিতীয়বার ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি অপরাধীরা, মেরেও ফেলেছে ১৬ বছরের বিউটিকে। এটা বিচারহীনতার স্পষ্ট উদাহরণ।

ধর্ষণের বিচার চেয়ে মামলা করার পরও খুন হতে হলো বিউটিকে, এটা মেনে নিতে পারছে না কেউ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি নানা প্রশ্ন আর ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকজুড়ে।

সোহাগ গাজী লিখেছেন, ‘বিউটিদের কেউ নেই। রাষ্ট্র থাকার কথা ছিল, বিউটি রাষ্ট্রের কাছে গিয়েছিলেনও, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। বিউটি খুন হয়েছে, এবার রাষ্ট্র আসবে, বিউটির লাশ নিয়ে এখন কাটাকুটি করবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। দেহ হেফাজত করবে।’ বিথী তাবাসসুম লিখেছেন, ‘প্রথম দফা ধর্ষিত হওয়ার পর মামলা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধর্ষককে গ্রেপ্তার করেনি। বিউটির জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি, তাকে নিরাপত্তা দেয়নি। যদি প্রথমবার গ্রেপ্তার করা হতো তাহলে বিউটিকে অন্তত জীবনটা দিতে হতো না।’

হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জের ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের সায়েদ আলীর কন্যা ও স্থানীয় উচ্চবিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী বিউটি আক্তারকে গত ২১শে জানুয়ারি অপহরণ করে নিয়ে ধর্ষণ করে একই গ্রামের বাবুল। এ ঘটনায় গত ১লা মার্চ সায়েদ আলী বাদী হয়ে বাবুল ও তার মা ইউপি সদস্য কলম চাঁনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অপহরণ ও ধর্ষণ মামলা করেন। মামলাটি গত ৪ঠা মার্চ শায়েস্তাগঞ্জ থানায় প্রেরণ করা হয়।

মামলা করার পর সায়েদ আলীকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হলে তিনি গত ১৬ই মার্চ বিউটি আক্তারকে লাখাই উপজেলার গুনিপুর গ্রামে তার নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ওই রাতেই বিউটি আক্তার নানার বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়। অনেক স্থানে খোঁজাখুঁজির পর কোথাও না পেয়ে পরদিন ১৭ই মার্চ সকালে শায়েস্তাগঞ্জ হাওরে বিউটি আক্তারের লাশ পাওয়া যায়। এরপর থেকে বাবুল পলাতক রয়েছে। সায়েদ আলীর অভিযোগ, ধর্ষণ মামলার আসামিই তার মেয়েকে পুনরায় ধর্ষণ শেষে হত্যা করেছে।

এ নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। গুঞ্জন চলছে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও গ্রাম্য মোড়লদের কথায় পুলিশ ওই মামলা হওয়ার পরও আসামি গ্রেপ্তার থেকে বিরত থাকছে। আর এমন কালক্ষেপণের কারণেই বিউটির মতো হত্যাকান্ড- ত্বরান্বিত হয় বলেও অনেকের অভিমত। এ জন্য তদন্ত সাপেক্ষে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি এলাকাবাসীর।

এব্যাপারে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসি বলেন, মামলার আসামী মোট দুইজন। এর মধ্যে আমরা একজনকে গ্রেপ্তার করে কোর্টে পাঠিয়েছি। আসল আসামি বাবুলকে যদিও আমরা গ্রেপ্তার করতে পারিনি, তবে তার সহযোগী একজনকে গ্রেপ্তার করেছি। আমরা সন্দেহ করছি, সেও বাবুলের সঙ্গে ছিল। আর বাবুলকে গ্রেপ্তারের জোর চেষ্টা চলছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির সোশিওলজি অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারপারসন ড. মালেকা বেগম বলেন, এ ঘটনায় আমরা ক্ষুব্ধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জিজ্ঞাসার মুখোমুখি করা দরকার, কেন তারা মামলা করার পরও ধর্ষককে গ্রেপ্তার করল না।

তিনি বলেন, আমাদের আইনেও গলদ আছে। কেন শুধু ধর্ষণের শিকার মেয়েটাকেই পুলিশের সামনে পরীক্ষা দিতে হবে, ছেলেটিকে কেন পরীক্ষা দিতে হবে না, সে ধর্ষণ করেছে। দীর্ঘদিন থেকে আমরা এটা বলে আসছি কিন্তু আইন সংশোধন হচ্ছে না।

আরেকটা কথা হলো-সামাজিকভাবে এটিকে প্রতিরোধ করা। বিউটির ঘটনায় এখন যদি ওই এলাকার সবাই বিচারের জন্য সোচ্চার হয় তাহলে এর প্রভাব পড়বে অন্য সব জায়গায়। এভাবে সবাই এক কাতারে এসে সংগঠিত হলে অবশ্যই ধর্ষণ বন্ধ হবে বলে মনে করেন ড. মালেকা বেগম।

Sharing is caring!

Loading...
Open