সিলেটে আওয়ামীলীগ সভাপতির প্রত্যায়নপত্রে বিএনপি নেতার জামিন…….!

বিশেষ প্রতিবেদন::           দুজন দু’মেরুর রাজনীতিবীদ। একজন জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান। আর অন্যজন সিলেট জেলা বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা পরিষদের ১১ নং ওয়ার্ডের সদস্য অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান। দুজনের’ই নামের শব্দগত মিল থাকলেও তারা নিজ দলের হয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করছেন সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। তবুও তাদের মধ্যে রয়েছে গোপন সখ্যতা.!

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির লিখিত সাফাইয়ে জামিন পেয়েছেন বিস্ফোরক ও পুলিশ অ্যাসল্ট মামলার আসামি বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান। এ নিয়ে সিলেটে তোলপাড় চলছে। বিব্রত আওয়ামীগ পরিবার।

সিলেটের সিনিয়র আইনজীবী, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান দীর্ঘদিন কোর্টে যান না। কিন্তু হঠাৎ করেই কোর্টে গিয়ে বিস্ফোরক ও পুলিশ অ্যাসল্ট মামলার আসামি এম মুজিবুর রহমান মুজিবের পক্ষে সাফাই গেয়ে জামিনের ব্যবস্থা করেন। মুজিব জেলা বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জেলা পরিষদের ১১নং ওয়ার্ডের সদস্য।

জানা যায়, গত ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সিলেট নগরীতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জেলা পরিষদে এবং বিএনপি নেতাকর্মীরা আদালত এলাকায় অবস্থান নেন। একপর্যায়ে পুলিশ, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ শুরু হলে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ার পাশাপাশি ব্যাপক গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ ৫৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০-১৭০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করে। ওই মামলার ২১নং আসামি হলেন বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট এম মুজিবুর রহমান মুজিব।

গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুজ্জামান হিরোর আদালতে হাজির হয়ে এম মুজিবুর রহমানের পক্ষে জামিন আবেদন করেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান। আবেদনে তিনি বলেন, ‘অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ও নিয়মিত প্র্যাকটিশনার। তিনি সিলেট জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্য। মুজিব দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে কর্মজীবন অতিবাহিত করছেন। ঘটনার দিন ও সময়ে তিনি সিলেট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে জরুরি মিটিংয়ে ছিলেন।’ তার এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত মুজিবের জামিন মঞ্জুর করেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, গত ‘৮ই ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টা থেকে বিকাল পর্যন্ত আমি, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, মহানগর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য নেতাকর্মীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে জেলা পরিষদে অবস্থান করছিলাম। ওই সময় আমরা বিএনপি নেতা মুজিবকে দেখিনি।’

তিনি বলেন, ‘তিনি তো (মুজিব) জেলা বিএনপির পদধারী নেতা। ওই সময় তার ওখানে থাকার কথা কে বিশ্বাস করবে? তিনি তো তার দলের নেতাকর্মীর সঙ্গে থাকার কথা।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির এমন কান্ড দুঃখজনক ও অপমানজনক।’

জানতে চাইলে বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব বলেন, ‘ওই ঘটনার সময় পরিষদের ডেভেলপমেন্ট কমিটির বৈঠক চলছিল। আমি ওই বৈঠকে ছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দ পেয়ে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, মহানগর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ আমি বের হয়ে দেখি, ছাত্রলীগের ছেলেরা গুলি করছে।’

সিলেটের ইতিহাসে কোর্টে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা আর ঘটেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর আগে আমি দুপুর ১২টা পর্যন্ত কোর্টে ছিলাম।’

বিএনপি নেতার এ অভিযোগ প্রসঙ্গে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ছাত্রলীগের ছেলেদের গুলি করার প্রশ্নই উঠে না। আমরা জেলা পরিষদে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলাম। ওই সময় উনাকে তো আমরা দেখিনি। তিনি মামলা থেকে বাঁচার জন্য এমন মিথ্যাচার করছেন।’ এক প্রশ্নের জবাবে আসাদ বলেন, ‘জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির এমন কর্মে আমরা লজ্জিত, বিব্রত। বিষয়টি নিয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করা জরুরি।’

জেলা পরিষদের ২০০০ সালের ১৯ নম্বর আইন অনুযায়ী পরিষদে ‘ডেভেলপমেন্ট কমিটি’ বলে কিছু নেই। তারপরও চেয়ারম্যান ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির তিন সদস্যের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, গত ‘৮ই ফেব্রুয়ারি আমাদের জানামতে কোনো মিটিং ছিল না। এ তিনজন হলেন- বিএনপি নেতা ও জেলা পরিষদের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. শাহপরাণ, সংরক্ষিত ৩নং আসনের মহিলা সদস্য সুষমা সুলতানা রুহি এবং বিএনপি নেতা ও জেলা পরিষদের ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. মুহিবুল হক।’

সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির চার সদস্য জানান, ‘ওই দিন অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিবকে বিএনপি নেতাকর্মীর সঙ্গে দেখা গেছে। তাদের দাবি আদালত চত্বর, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের গেট ও জেলা পরিষদের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখলে প্রমাণ পাওয়া যাবে।’

তারা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা লুৎফুর রহমান একজন শ্রদ্ধাভাজন সিনিয়র আইনজীবী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কোর্টে আসেন না। হঠাৎ কেন এসে এমন বিতর্কিত ঘটনার জন্ম  দিলেন, তা বুঝে উঠতে পারছি না।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইল অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান বলেন, গত ‘৮ই ফেব্রুয়ারি পরিষদের কোনো মিটিং ছিল না। বিএনপি নেতা মুজিব জেলা পরিষদের সদস্য। আমাদের পাঁচ-ছয়জনের একটি মিটিং ছিল। তাই উনি এসেছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দেখে কিছু সময় থেকে তিনি চলে যান।’

Sharing is caring!

Loading...
Open