পাঁচ জানুয়ারির চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা…….!

সুরমা টাইমস ডেস্ক::          দায়িত্ব গ্রহণের অল্পসময়ের মধ্যে আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠ ও সর্বজনগ্রাহ্য করতে এবং নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে সফল সংলাপ সম্পন্ন করেছিল কেএম নুরুল হুদা নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংলাপে দেশের সব নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, পেশাজীবী সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রতিনিধিসহ সমাজের প্রায় সব অংশেরই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারায় জনআস্থাও কুড়িয়েছিল সাংবিধানিক এই সংস্থাটি। রাজনৈতিক সমঝোতার দ্বার উন্মোচন হয়েছে মনে করে বিএনপিসহ দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করা দলগুলো আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে শুরু করেছিল প্রচার-প্রচারণাও। ইসির প্রতি আশান্বিত হয়ে একটি স্থিতিশীল নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল দেশজুড়ে।

কিন্তু সম্প্রতি একটি দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় ফের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে রাজনীতির মাঠে। প্রধান দুটি দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি শক্ত বিপরীতমুখী অবস্থান গ্রহণ করায় বিনষ্ট হয়ে যায় সমঝোতার পরিবেশ। পিছু হঠে আসে নির্বাচন কমিশনও। দলগুলোর সমঝোতার বিষয়ে সংলাপ আয়োজন কিংবা অন্য কোনো প্রচেষ্টা তারা করবে না বলে এরইমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি। সেইসঙ্গে সংলাপে উঠে আসা সুপারিশ ও দাবি দাওয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা থেকেও বিরত রয়েছে কমিশন। এ অবস্থায় আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে শঙ্কা ও ভয় ভর করছে জনমনে। শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকরাও।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ, একটি তফসিল ঘোষণা এবং কিছু রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের ক্ষমতার মেয়াদ বৃদ্ধি বা ক্ষমতার পালাবদল নিশ্চিত করার নাম গণতন্ত্র নয়। একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়দায়িত্ব যেমন সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর, সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনেরও। নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব ধরনের আয়োজন বন্দোবস্ত করার পাশাপাশি নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে কিনা, দলগুলোর সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হয়েছে কিনা, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে কিনা ইত্যাদি বিষয়গুলো ইসির দেখার দায়িত্ব রয়েছে।

তাদের মতে, বিগত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া এবং বেশিরভাগ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হওয়ার কারণে শুরু থেকেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল সেই নির্বাচন। এবারো এমনটি ঘটলে দেশের পরিবেশ ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকালীন পরিবেশের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

এদিকে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনের উন্নয়ন সহযোগীরাও দেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান লক্ষ্য করে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে আরেকটি সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার ও উন্নয়ন সহযোগী ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশে সহিংসতা ও রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা করছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাংলাদেশ ককাস বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন ও মানবাধিকার নিয়ে তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করতে গিয়ে ২০১৮ সালকে ২০১৪ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করেছে। নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ না থাকায় তারা এই আশঙ্কা করছে বলে জানা যায়।

সম্প্রতি ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাংলাদেশ ককাসের সভায় উপস্থাপিত রিপোর্টে বলা হয়েছে- বাংলাদেশের রাজনীতি আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে। বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টা করা হলে বিএনপি আগের চেয়েও বেশি বেপরোয়া হয়ে নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করতে পারে। ২০১৪ সালের নির্বাচনী সহিংসতার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়েছিল। রিপোর্টে বিএনপিকে সহিংসতা পথ পরিহার করার সুপারিশ করেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বাংলাদেশ ককাস কমিটি। সেই সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সমঝোতা ও সংলাপের পথ উন্মুক্ত করারও আহ্বান জানিয়েছে। সর্বশেষ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দল আগামী নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার অংশ গ্রহণের বিষয়ে ইসির সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছে। সেইসঙ্গে আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করারও আহ্বান জানায় তারা। জবাবে অবশ্য ইসি নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এ বিষয়ে তাদের কিছুই করণীয় নেই বলে জানায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দশম জাতীয় নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও উন্নয়ন সহযোগীরা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য প্রধান দুই রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিল। সেই প্রয়াস ব্যর্থ হওয়ায় তাদের ক্ষুব্ধতার বহিঃপ্রকাশ তারা বিভিন্নভাবে ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে, গার্মেন্টস রফতানিতে নানা ধরনের শর্ত আরোপ করে, তাদের নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বার বার উদ্বেগ প্রকাশ করে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তাদের অপরিবর্তিত অবস্থানের কথা বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়ে আরেকটি অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের জন্য তাগাদা দিয়ে তারা তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।

তাদের মতে, অতীতে বল্গাহীন রাজনৈতিক কর্মসূচি জাতীয় উন্নয়ন এবং স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চরমভাবে ব্যাহত করেছে। বর্তমান সরকারের গত ১০ বছর সে ধারার রাজনীতি অনেকটাই রুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু দেশে যে ধরনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গড়ে ওঠার কথা তা হয়ে ওঠেনি। তাই দেশকে এগিয়ে নিতে আগামী নির্বাচন সর্বজনগ্রাহ্য ও সব দলের অংশগ্রহণে করতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে বিএনপি কিংবা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতাও এজন্য প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

Sharing is caring!

Loading...
Open