তালা ভেঙ্গে ঢাবি উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও

সুরমা টাইমস ডেস্ক::

প্রক্টরের অপসারণসহ চার দফা দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করেছে ‘নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দের’ ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে জড়ো হয়ে মিছিল শুরু করে শিক্ষার্থীরা। পরে মিছিলটি টিএসসি, কলাভবন, বিজনেস ফ্যাকাল্টি, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ ঘুরে উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে আসে। সেখানে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে শিক্ষার্থীরা। এ সময় উপাচার্য কার্যালয়ের প্রধান ফটক ধরে ধাক্কা দিতে থাকে তারা। এক পর্যায়ে বেলা ১২টার দিকে উপাচার্য কার্যালয়ে প্রধান ফটকের দুটি তালা ভেঙে কার্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকে যায় তারা। বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত উপাচার্য কার্যালয় ভবনের কলাপসিবল গেট ভাঙার চেষ্টা করছিল বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।

উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান তার কার্যালয়েই অবস্থান করছেন।

রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে আন্দোলন কর্মসূচিতে ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের ‘নিপীড়নের’ প্রতিবাদে আন্দোলনের সামনে আসে নিপীড়ন বিরোধী শিক্ষার্থীরা। নিপীড়নে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বহিষ্কারের দাবিতে গত ১৭ জানুয়ারি প্রক্টর কার্যালয়ও ঘেরাও করে তারা। এছাড়া ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়ে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে ‘হামলার’ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দুই দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার দাবিও রয়েছে শিক্ষার্থীদের।

এর আগে গত বুধবার শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানীর কার্যালয় ঘেরাও করে তা ভাঙচুর করে। ওই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। শুরুতে সাত সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্তির সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল শিক্ষার্থীরা। তবে সে আন্দোলন এখন চার দফায় গড়িয়েছে।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার ছাত্রসংখ্যার দিক থেকে সাতটি বড় বড় কলেজ পরিচালনার দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্তান্তর করা হয়। ওই কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় ব্যবহার করছে-এমন অভিযোগ ‍তুলে অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে গত ১৫ জানুয়ারি আন্দোলনে নামে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ওই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা চড়াও হয় বলে অভিযোগ আছে। একই কর্মসূচিতে থাকা মেয়েদেরকে সেদিন কটূক্তি ও যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। আর এরপর থেকে ছাত্রলীগের অভিযুক্ত নেতা-কর্মীদের বহিষ্কারের দাবি যোগ হয়। এই দাবিতে ১৭ জানুয়ারি শিক্ষা্থীরা প্রক্টর কার্যালয় ঘেরাও করতে যায়। কিন্তু ভেতর থেকে তালাবদ্ধ করে রাখার পর ওই ফটক ভেঙে ফেলে শিক্ষার্থীরা।

এই ঘটনায় আবার পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের কারও নাম উল্লেখ না করে ৫০ থেকে ৬০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয় শাহবাগ থানায়। প্রক্টর কার্যালয়ের ফটক ভাঙচুরের ভিডিও ও স্থিরচিত্রও দেয়া হয়। ওই রাত থেকেই আবার নতুন দাবি যোগ হয় শিক্ষার্থীদের। মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিও জানাতে থাকে তারা।

আন্দোলনের মুখে যৌন হয়রানির তদন্তে গত বৃহস্পতিবার কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন উপাচার্য। শিক্ষার্থীরা এই ব্যবস্থা নিতে রবিবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না দেখে সোমবার বেলা ১১টার দিকে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে জড়ো হয় নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে শ দুয়েক ছাত্র-ছাত্রী। সেখানে সংক্ষিপ্ত জমায়েতের পর মিছিল নিয়ে তারা যায় উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে।

শিক্ষার্থীরা চাইছিলেন উপাচার্যের এসে যেন তাদের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু এ সময় কার্যালয়ের কর্মীরা ভেতর থেকে লোহার ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা ফটকে ধাক্কা দিতে থাকে। এক পর্যায়ে সেটি ভেঙে যায়।

এ সময় সেখানে হ্যান্ড মাইকে স্লোগান চলছিল, ‘ঘেরাও ঘেরাও ঘেরাও হলো, ভিসি অফিস ঘেরাও হলো।’ আবার স্লোগান উঠে, ‘হৈ হৈ রৈ রৈ, ভিসি স্যার গেলেন কই।’

শিক্ষার্থীরা দেখানে অবস্থান চালিয়ে গেলেও দুপুর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি। সেখানে উপস্থিত একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমাতে প্রক্টর স্যার আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছেন। এই মামলা কাঁধে নিয়ে আমরা বাড়ি ফিরতে পারব না, মামলা অবিলম্বে ‍তুলে নিতে হবে।’

আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে প্রকাশ্যে যৌন হয়রানি করে কেউ পার পেয়ে যাবে, এটা আমরা মেনে নেব না। হোক তারা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা। তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবস্থা নিতেই হবে। তাদেরকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করতে হবে।’

আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রক্টরের দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু তিনি সেটা না করে নির্লজ্জের মতো আমাদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছেন। তাকে এই পদ থেকে সরে যেতে হবে।’

সেই সঙ্গে যে দাবি নিয়ে আন্দোলনের শুরু, সেই সাত কলেজের সংকট সমাধানের দাবিও তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। অবশ্য সাত কলেজের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অপরিকল্পিত ছিল। তবে এই সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রমকে কোনোভাবেই ব্যাহত করবে না।

গত ২০শে জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পরিচয়পত্র দেওয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, পাঠাগার প্রভৃতির কোনোটিই ব্যবহার করার সুযোগ তাদের নেই। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শুধু এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রধারী শিক্ষার্থীদের জন্যই উন্মুক্ত। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়।

Sharing is caring!

Loading...
Open