হাকালুকি হাওরের ইজারাবিহীন জলমহাল থেকে প্রতিরাতে লুট হচ্ছে লাখ লাখ টাকার মাছ

নিজস্ব প্রতিনিধি:: হাকালুকি হাওরের সর্ববৃহৎ মাছের ভান্ডার গুটাউরা হাওরখাল বদ্ধ জলমহাল থেকে প্রতি রাতে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকার মাছ লুট করছে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট। ইজারার আবেদনকারী পানকৌড়ি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতিকে সামনে রেখেই মাছ লুটেরা বাহিনী এ তান্ডব চালাচ্ছে। ফলে সরকার লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। বিগত দু’বছর মামলা সংক্রান্ত জটিলতা এবং মামলা খারিজের পর চলতি মৌসুমে ইজারা প্রদানে বিলম্ব হওয়ার সুযোগে ও রক্ষণাবেক্ষনের অজুহাতে হাওরের ওয়াটার লর্ডরা সরকারের কয়েক কোটি টাকার মৎস্য ভান্ডার উজাড় করছে। অসাধু মাছ লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত ১৪ই জানুয়ারী বড়লেখার সোনারবাংলা মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা এখলাছুর রহমান ইউএনও বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

ইউএনও জানালেন যত দ্রুত সম্ভব জলমহালটির ইজারা প্রদান অথবা খাস কালেকশনের ব্যবস্থা নিতে তিনি উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে প্রতিবেদন প্রেরন করবেন এবং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নিবেন।

জানা গেছে, হাকালুকি হাওরের ১৬শ’ একরের সর্ববৃহৎ জলমহাল গুটাউড়া হাওরখাল (বদ্ধ) জলমহালটির অবস্থান বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়নে। ভূমি মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের ৩০শে জুলাই ১ম চার বছর বার্ষিক ৭৩ লাখ ৫১ হাজার টাকা এবং শেষ দুই বছর উক্ত অংকের ২৫ ভাগ বর্ধিত হারে ১৪২২ থেকে ১৪২৭ বঙ্গাব্দ মেয়াদে পানকৌড়ি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির অনুকুলে এ জলমহালটি লীজ প্রদান করে। কিন্তু এ ইজারা আদেশের বিরুদ্ধে সোনারবাংলা মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মৎস্যজীবি সমবায় (৮০৩৪/২০১৫) এবং ভোলারকান্দি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি (৮০৭৮/২০১৫) হাইকোর্টে পৃথক দু’টি রীট পিটিশন দায়ের করেন। ২০১৫ সালের ১৯শে নভেম্বর দু’টি রীট পিটিশনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট পানকৌড়ি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির ইজারা আদেশ বাতিল ঘোষণা করেন। এরপর পানকৌড়ি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (নং-৩৫৫৮/২০১৫ ও ৩৬১৬/২০১৫) রুজু করে। ২০১৬ সালের ১২ জুলাই আপিল বিভাগ দু’টি সিপি লিভ টু আপিল খারিজ করেন। উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে পানকৌড়ি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি সিভিল রিভিউ পিটিশন (নং-৪৩৫ ও ৪৩৬/২০১৬) দায়ের করে। ২০১৭ সালে ২৪শে অক্টোবর দু’টি রিভিউ পিটিশন খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু ইজারা আবেদনকারী পানকৌড়ি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি জলমহালটির নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি।

নির্ভরযোগ্য সুত্র জানায়, একের পর এক উচ্চ আদালতের মামলা আর পাহারার অজুহাত দেখিয়ে পানকৌড়ি সমবায় সমিতিকে সামনে রেখে হাওরের ওয়াটার লর্ডরা বিগত প্রায় আড়াই বছর থেকে জলমহালের কোটি টাকার মাছ লুটপাট করেছে। চলতি মৌসুমেও মাছ লুটের ঘটনা অব্যাহত রেখেছে। রাতের বেলা বড় বড় জাল ফেলে তারা অবৈধভাবে মাছ ধরে সকালে হাওরপারেই বিক্রি করছে।

সরেজমিনে মঙ্গলবার গুটাউড়া হাওরখাল বদ্ধ জলমহালে গিয়ে দেখা যায়, জলমহালের পাড়ে চালাঘর নির্মাণ করা হয়েছে। বিলের এক অংশে ৩টি নৌকায় ২০-২৫ জন জেলে অবস্থান করছে। নিজেদের হাওরখাল বিলের ইজারাদারের পাহারাদার দাবী করে জেলে মনোয়ার হোসেন, লুলু মিয়া, জহির উদ্দিন, হেলাল মিয়া, কামরুল ইসলাম, ফয়সল আহমদ, আলী মিয়া প্রমুখ জানান, কয়েক বছর ধরে তারা ১৪-১৫ জন মিলে বিলটি পাহারা দিচ্ছেন। ফেঞ্চুগঞ্জের নুরুল ইসলাম (চেয়ারম্যান), জলিল মিয়া, ছামি মিয়া, রজাই মিয়া তাদের পাহারায় রেখেছেন। পানকৌড়ি মৎস্যজীবি সমিতি ইজারা নিলেও মুলত রজাই মিয়া, ছামি, নুরুল চেয়ারম্যান গংরা বিলের দেখভাল করেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাওরের লোকজন জানান, ফেঞ্চুগঞ্জের নুরুল চেয়ারম্যান ও ইসলামপুরের জাফর বাহিনী রাতের আধারে বিশাল জাল ফেলে প্রতিরাতে মাছ লুট করছে।

পানকৌড়ি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির সভাপতি শুক্কুর মিয়া হাওরখাল বিলের উচ্চ আদালতের মামলা নিষ্পত্তি ও ইজারা বাতিলের সত্যতা স্বীকার করে জানান, সমিতি নিজে কোন বিলই লীজ নিতে পারে না। একটা পার্সেন্টিজ দিয়েই বড় বড় ব্যবসায়ীরা বিল লীজ নেন। মাছ লুটের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, পাবলিকে মাছ লুটেপুটে খেয়ে ফেলবে তাই রজই মিয়া, নুরুল চেয়ারম্যান গংরা বিল পাহারা দেয়াচ্ছেন।

বড়লেখা ইউএনও মোহাম্মদ সুহেল মাহমুদ জানান, ইজারা বিহীন কোন সমিতি বিলের পাহারায় থাকতে পারে না। পাহারার নামে তাদের বিরুদ্ধে মাছ লুটের অভিযোগ রয়েছে। হাওরখাল বিলের উচ্চ আদালতের সকল মামলা নিষ্পত্তির বিষয়টি জেলা প্রশাসন থেকে চিটি দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ইজারা প্রদান অথবা খাস কালেকশনের ব্যবস্থা নিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে তিনি প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন।

Sharing is caring!

Loading...
Open