খালেদার জিয়ার ২০১৮ সাল ?


অনেক আশা এবং কিছু আশঙ্কা নিয়ে শুরু হয়েছে ইংরেজি বছর ২০১৮ সাল। কেমন যাবে এই বছরটির রাজনীতি? কেউ বলছেন, এই বছরটা হবে নির্বাচনের বছর। কেউ বলছেন, এই বছর হবে রাজনৈতিক উত্তাপ-উত্তেজনার বছর। দুটোই ঠিক। তবে নির্ধারিত ঘটনার চাইতে ‘হঠাৎ’ বা আকস্মিক ঘটে যাওয়া ঘটনাই হয়তো রাজনীতির নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।

বছরের শুরুতে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো পরিবর্তনের পক্ষে তার অবস্থান জানিয়েছেন। তবে মন্ত্রিসভার কলেবর বাড়ানোটা খুব প্রত্যাশিত ছিল বলে মনে হয় না। মানুষ চাইছিল রদবদল। সংযোজন-বিয়োযোজন। মন্ত্রীদের পারফর্মমেন্স বিচার-বিবেচনা করে, যারা নানা কারণে এরমধ্যে আলোচিত,সমালোচিত, সরাকারের জন্য বোঝা হয়ে উঠেছেন, তাদের বাদ দিয়ে নতুন মুখ সংযোজন করা হলে মানুষ খুশি হতো। কিন্তু তা হলো না।

তিনজন (একজন আগে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন) নতুন পূর্ণ মন্ত্রী এবং একজন প্রতিমন্ত্রী ২ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন।

এই চারজনের অন্তর্ভুক্তি মন্ত্রিসভাকে কীভাবে এবং কতটুকু গতিশীল বা উদ্যোমী করবে তা পরিষ্কার নয়। তবে ৩ জানুয়ারি মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন-পুনর্বণ্টনের ফলে অবশ্য বিষয়টি একটু গুরুত্ব পেয়েছে। মন্ত্রিসভার কয়েকজনের দপ্তর অদল-বদল হয়েছে।

এ সব রদবদল সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি করতে পেরেছে বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক মহলে কিছু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আছে। আওয়ামী লীগের ভেতরে এবং মহাজোট শরিকদের মধ্যেও হয়তো কিছু মান-অভিমান আছে। তবে এ সব বিষয় যেহেতু একান্তভাবেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখতিয়ারে সেহেতু প্রকাশ্যে কেউ কোনো কথা বলছেন না। প্রধানমন্ত্রী তার বিবেচনায় যেটা ভালো মনে করেছেন, সেটাই করেছেন। বাকিটা পরীক্ষা প্রার্থনীয়।

তবে নতুন যাদের মন্ত্রী করা হয়েছে তারা এই শেষ বছরে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে কতটুকু ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবেন সে বিষয়ে অনেকেরই সন্দেহ আছে। কারণ তাদের হাতে সময় খুব বেশি নেই, এক বছরেরও কম। মন্ত্রণালয়ের কাজ বুঝতে বুঝতেও অনেকটা সময় যাবে। তারপর তারা যদি মিডিয়ার খাবারে পরিণত হন, তাহলে কি হবে সেটাও বলা যাচ্ছে না।

কথা কম, কাজ বেশি – এই নীতি আমাদের মন্ত্রীরা মেনে চলতে পারেন না। তারা কাজের কাজ কি করেন তা জানা না গেলেও কথায় তারা গগন ফাটান। আর বেশি কথা বলতে গেলেই বিপদ। একাধিক মন্ত্রী এর আগে বেফাঁস কথা বলে সরকারকে বিব্রত করেছে। নতুন মন্ত্রীরাও যদি কথা বলে সরকারকে বেকায়দায় ফেলেন তাহলে এই পরিবর্তনও সরকারের গলার কাঁটাই হবে।

এরমধ্যেই নতুন দুই মন্ত্রী- ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার এবং বিমান মন্ত্রী শাহজাহান কামালের দুই বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি হচ্ছে। এবং তা প্রশংসাসূচক নয়। মোস্তফা জব্বার ছাত্র জীবনে জাসদ করতেন। জাসদের রাজনীতি যে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুবিরোধিতার ক্ষেত্র প্রস্তুতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল এটা ইতিহাসের সত্য।

তবে তখনকার কাঁচা জাসদ এখন পেকেছে এবং কাঁচা জাসদ চরম আওয়ামী লীগবিরোধিতা দিয়ে শুরু করে এখন পাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের ঘরে ঢুকে পড়েছে। আওয়ামী লীগের অনেকে অখুশি হলেও তাদের কিছু করার নেই। কঠিনেরে ভালোবাসা ছাড়া রাজনীতি চলে না।

যাহোক, মোস্তফা জব্বার পূর্ণ মন্ত্রী হবেন সেটা কেউ ভেবেছেন বলে মনে হয় না। তিনি একজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। বর্তমান সরকারের কাছে তথ্যপ্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকারের বিষয়। তাই একজন বিশেষজ্ঞকে ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় বিস্মিত হওয়ার মতো কিছু নেই। তবে লোকটি মোস্তফা জব্বার হওয়ায় কেউ কেউ বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারেননি, যেহেতু তার রাজনৈতিক অতীতটা বিতর্কমুক্ত নয়।

মন্ত্রী হয়ে তিনি অতিকথনের দোষমুক্ত থাকবেন এমনটা আশা করা যায় না এ জন্যই যে তিনি কথা বলারই লোক। তিনি বিটিভিসহ বিভিন্ন চ্যানেলে টকশোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে থাকেন এবং সংবাদপত্রে লেখালেখিও করেন। তিনি বিষয়বিশেষজ্ঞ। তাই তার মধ্যে অনেক কথা জমা থাকাই স্বাভাবিক।

তিনি মন্ত্রী হয়েও কথা বলা শুরু করেছেন। একদিন বলেছেন, তার মন্ত্রণালয়টি ‘ক্যান্সার আক্রান্ত’। পরে আবার বলেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নাকি তাকে ডুবন্ত নৌকার দায়িত্ব দিয়েছেন। এ সব বলে তিনি হয়তো নিজের ওজন বাড়াতে চেয়েছেন। কিন্তু সরকারকে তো বিরাট প্রশ্নের মুখে ফেলেছেন।

টানা ৯ বছর ধরে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় যদি ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে সরকার পরিচালনায় সাফল্য দাবি করা যায় কি?

নতুন মন্ত্রী ‘ডুবন্ত’ নৌকার দায়িত্ব পেয়েছেন বলেও বিরোধীদের হাতে সরকারবিরোধিতার মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। আইসিটি খাত নিয়ল সরকারের বড়াইয়ের শেষ নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের গতিশীল নেতৃত্বে আইসিটি খাত দ্রুত বিকশিত হচ্ছে বলে আমরা এতদিন শুনে এসেছি। আর এখন নতুন মন্ত্রী একে ডুবন্ত নৌকা বলছেন?

শুরুতেই বিএনপির প্রচারণার রসদ জুগিয়ে সরকারের খুব উপকার করলেন কি জনাব মোস্তফা জব্বার?

ওয়ার্কস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননকে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন মন্ত্রী শাহজাহান কামালকে। আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের নেতা কামাল সাহেবের নামও মন্ত্রী হিসেবে কখনও আলোচনায় আসেনি। হয়তো সে জন্যই মন্ত্রী হয়ে তিনি আবেগ সম্বরণ করতে পারছেন না।

তাই প্রথম দিনই বলে ফেললেন, নিজের রক্ত দিয়ে হলেও তিনি বিমানকে লাভজনক করে ছাড়বেন। রক্ত দিয়ে কি কোনো প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করা যায়?

তাছাড়া প্রশ্ন হলো, তিনি কি তার পূর্বসূরিকে প্রকারান্তরে অসফল বললেন না? বিমানকে লাভজনক করতে ব্যর্থ রাশেদ খান মেনন সমাজকল্যাণে সফল হবেন কি?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সহকর্মী বাছাইয়ে সব সময়ই ‘চমক’ দিয়ে থাকেন। যাদের নাম আলোচনায় আসে তাদের বাদ দিয়ে অনালোচিতদের তিনি আলোর সামনে নিয়ে আসেন। এটা ভালো। তবে এই মন্ত্রীরা সরকারের সুনাম বাড়াতে সাহায্য করে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নতুন দুই মন্ত্রী শুরুটা ভালো করলেন বলে বলা যাব না।

শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক বেড়েছে। মন্ত্রী হওয়ার পর কয়েক বছর তিনি যথেষ্ট প্রশংসিত থাকলেও এখন তাকে নিয়ে নিন্দামন্দের শেষ নেই। তার ব্যক্তিগত সততা, তার সারল্য, সাধারণ জীবন যাপন সবার মনোযোগ কেড়েছিল। কিন্তু এখন বাতাসে অন্য গন্ধ। সম্ভবত সে জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একজন প্রতিমন্ত্রী দেওয়া হয়েছে।

রাজবাড়ির কাজী কেরামত আলীর সঙ্গে নুরুল ইসলাম নাহিদ জুটি বাধতে পারবেন কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়। অন্যদিকে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এতদিন একাই দাপটের সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয় চালালেও এবার তার সঙ্গে একজন প্রতিমন্ত্রী দেওয়া হয়েছে। তারানা হালিমকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অর্ধেক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব ভাগাভাগি দুইজন কীভাবে গ্রহণ করবেন তার ওপর নির্ভর করবে এই জুটির সাফল্য।

বিদায়ী ২০১৭ সালটি আমাদের জাতীয় জীবনে বড় কোনো উত্থান-পতনের সাক্ষী হতে পারেনি । রাজনীতিতে ঘটেনি বড় কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা। সরকার ও বিরোধী বিএনপির মধ্যে মতপার্থক্য দূর হওয়ার কোনো কারণ তৈরি হয়নি। বরং ফাটল বাড়ার লক্ষণ স্পষ্ট হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাক কিছু হয়েছে।

সাময়িকভাবে কিছু উত্তেজনা ছড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু বড় অস্থিরতা দেখা দেয়নি। নতুন বছর রাজনীতিকে কোন পথে নিয়ে যায়, দেখা যাক।

পুনশ্চ : বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘২০১৮ সাল হচ্ছে খালেদা জিয়ার বছর, বিএনপি বছর।‘

তাই কি? তেমন কোনো আলামত কেউ কাথাও দেখতে পারছেন কি? রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই – এটা অনেকেই বলে থাকেন। তাহলে মির্জা আলমগীর ২০১৮ সালের রাজনীতি নিয়ে শেষ কথা বললেন কীভাবে?

নির্বাচন দিলে সরকারের পতন হবে দাবি করেছেন বিএনপির মহাসচিব। নির্বাচনে কি সরকারের পতন হয়?

নির্বাচনে তো হয় সরকার বদল। আন্দোলনে হয় সরকার পতন। বিএনপি আসলে কোনটা চায়, আন্দোলন, না, নির্বাচন? ২০১৮ সালের রাজনীতিটা উত্তেজনাপূর্ণ হবে বলেই মনে হচ্ছে।

Sharing is caring!

Loading...
Open