বরিশালে ডিআইজি মিজানের ‘স্বর্ণকমল’

ডেস্ক রিপোর্টঃ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য প্রত্যাহার হওয়া ডিআইজি মিজানের স্বর্ণকমলের সন্ধান মিলেছে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে। শুধু স্বর্ণকমলই নয়, এখানে তার আত্মীয়স্বজনরাও ক্ষমতার চরম দাপট দেখিয়ে রাম রাজত্ব কায়েমের অভিযোগ মিলেছে। এদের কথা না শুনলে ঢাকায় বসে ডিআইজি মিজান ক্ষমতার দাপট দেখাতেন। তার ভয়ে তটস্থ থাকতো স্থানীয় থানায় কর্মরত পুলিশও।
মেহেন্দিগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শ্রমজীবী বাবা আলী আকবরের ২ ছেলে ও ৬ মেয়ের মধ্যে তৃতীয় মিজান। অভাব-অনটনে চলতো তাদের সংসার।
তাদের ছিল ছনের ঘর। ওই ঘরে বৃষ্টির সময় পানি চুয়ে পড়তো। দরিদ্র পরিবারের সন্তান মিজান ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মেধাবী। ১৯৮০ সালে মেহেন্দিগঞ্জের পাতারহাট পিএম স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ’৮২ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকতেন এফ রহমান হলে।
মিজানের পুলিশ বিভাগে চাকরি হওয়ার পরই ভাগ্য খুলে যায় পুরো পরিবারের। কয়েক বছর আগে মেহেন্দিগঞ্জ পৌর শহরের পাতারহাট-উলানিয়া সড়কের পাশে কালীকাপুর এলাকায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেন বিশাল বাউন্ডারি ঘেরা বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি ‘আমেনা ভিলা’। মেহেন্দিগঞ্জের লোকজনের কাছে ওই বাড়িটি ‘স্বর্ণকমল’ হিসেবে পরিচিত।
মেহেন্দিগঞ্জের সাবেক এক সংসদ সদস্য বলেন, শুধু মেহেন্দিগঞ্জে নয়, ঢাকা পুলিশ হেড কোয়ার্টারের যাবতীয় নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন ডিআইজি মিজান। অবৈধ এই বাণিজ্য করে অগাধ টাকার মালিক হন তিনি। মেহেন্দিগঞ্জে তেমন একটা আসা-যাওয়া না থাকলেও ঈদে এবং কোরবানির সময় এলাকায় আসতেন তিনি। এলাকার বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং দরিদ্রদের মাঝে ডিআইজি মিজান অনেক দান-খয়রাত দিতেন বলে জানিয়েছেন ওই সাবেক সংসদ সদস্য।
ডিআইজি মিজানুর রহমানের ক্ষমতার দাপটে গত কয়েক বছর ধরে মেহেন্দিগঞ্জ থানা পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল তার ছোটভাই মো. স্বপন এবং ৩ ভগ্নিপতি। তারাই নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন মেহেন্দিগঞ্জ থানা পুলিশের যাবতীয় তদবির বাণিজ্য। আসামি ধরা, ছাড়া, জিডি, মামলা, চার্জশিট সবই হতো ডিআইজি মিজানের ছোট ভাই স্বপন ও তার ৩ ভগ্নিপতির ইশারায়।
এমনকি ডিআইজি মিজানের ছোটভাই স্বপনের অন্যায় আবদার না রাখায় ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বদলি করে দেয়া হয় মেহেন্দিগঞ্জ থানার তৎকালীন এসআই শাহজাহানকে। তিনি বর্তমানে আগৈলঝাড়া থানায় কর্মরত।
এসআই শাজাহানের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানান, মেহেন্দিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে একটি ফার্মেসি রয়েছে মিজানের ছোটভাই স্বপনের। ভাইয়ের প্রভাবে ওই ফার্মেসিতে বসেই পুলিশের সব বিষয়ে খবরদারি করতেন তিনি।
২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে মেহেন্দিগঞ্জ থানার তৎকালীন এসআই শাহজাহান পাতারহাট বন্দরে কাগজপত্রবিহীন মোটরসাইকেল আটক অভিযান পরিচালনা করছিলেন। এ সময় স্বপনের ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে যাওয়া এক মোটরসাইকেল আরোহীর মোটরসাইকেল আটক করেন শাহজাহান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওই মোটরসাইকেল ছেড়ে দেয়ার পাশাপাশি পাশের ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে যাওয়া ক্রেতাদের মোটরসাইকেল আটক করতে বলেন ডিআইজি মিজানের ক্ষমতাধর ভাই স্বপন। কিন্তু এতে রাজি হননি এসআই শাহজাহান। ডিআইজি মিজানের ভাইয়ের অন্যায় আবদার না রাখায় এসআই শাহজাহানকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় বাবুগঞ্জের আগরপুর পুলিশ তদন্তকেন্দ্রে। ওই সময় তার দুই সন্তান মেহেন্দিগঞ্জের একটি স্কুলে পড়তো। সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য শিক্ষা বছরের শেষ অর্থাৎ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্ব-স্থানে থাকার আকুতি করেও বিফল হন এসআই শাহজাহান।
ডিআইজি মিজানের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তার ভাই ও ৩ ভগ্নিপতির দাপটের বিষয়ে ওই সময়ে স্থানীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশ করা হলে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন মিজান ও তার ভাইয়েরা। ওই সংবাদের প্রেক্ষিতে স্থানীয় এক ব্যক্তিকে দিয়ে মেহেন্দিগঞ্জের ৩ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করান ডিআইজি মিজান। ওই মামলায় বরিশালের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) এক কর্মকতার উপর অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ৩ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র পর্যন্ত দাখিল করানোর অভিযোগ রয়েছে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে। যদিও পরবর্তীতে ওই মামলার বাদী আদালত থেকে মামলা তুলে নেয়ায় ডিআইজি মিজানের রোষানল থেকে বেঁচে যান স্থানীয় ৩ সাংবাদিক।
মিজানের রোষানল থেকে বেঁচে যাওয়া মেহেন্দিগঞ্জের সাংবাদিক সঞ্জয় গুহ জানান, ডিআইজি মিজানের ক্ষমতার দাপটের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করার পর ডিআইজি মিজান ও তার ভাই স্থানীয় সাংবাদিকদের দেখে নেয়ার হুমকি দেন। এর এক সপ্তাহ পর তার অনুগত ইউপি সদস্য মনির চাপরাশীকে দিয়ে স্থানীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আক্তার হোসেন খোকন, তিনি (সঞ্জয় গুহ) এবং সঞ্জয় দেবনাথের বিরুদ্ধে আদালতে চাঁদাবাজির মামলা করান। ওই মামলায় আদালত পিবিআইকে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু পিবিআই’র তৎকালীন পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন সরজমিন তদন্ত না করেই ডিআইজি মিজানের প্রভাবে বরিশালে বসেই তাদের ৩ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে আদালতে প্রতিবেদন দেন।
ওই সময় পুলিশ পরিদর্শক আনোয়ার ডিআইজি মিজানের নির্দেশে ৩ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস এমপি’র কাছে স্বীকার করেন।
মেহেন্দিগঞ্জের পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন খান বলেন, মেহেন্দিগঞ্জে একটা সুন্দর বাড়ি করেছেন মিজান। সবাই বলে ‘এসপি সাহেবের’ বাড়ি আবার কেউ বলে ‘স্বর্ণকমল’। মেহেন্দিগঞ্জের একজন সন্তান পুলিশের বড় পদে চাকরি করায় এতদিন তাকে নিয়ে গর্ব করতেন স্থানীয় মানুষ। কিন্তু ঢাকায় নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ায় এখন সবাই ছিঃ ছিঃ করছে। এটা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে। (মানবজমিন)

Sharing is caring!

Loading...
Open