ফেঞ্চুগঞ্জ সাব-স্টেশনে অগ্নিকাণ্ড বুশিং ক্র্যাক থেকে!

নিজস্ব প্রতিনিধি:: সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে গ্রিড সাবস্টেশনে ট্রান্সফর্মারে অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শন করেছে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি।

গতকাল মঙ্গলবার (১২ই ডিসেম্বর) বিকেলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন জাতীয় গ্রিডের প্রধান প্রকৌশলী (সঞ্চালন-১) এমদাদুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের তদন্ত দল। কমিটির সদস্যরা রাত সোয়া ১০টার দিকে গ্রিড সাবস্টেশন ত্যাগ করেন।

তদন্ত কমিটির বরাত দিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়- কমিটির সদস্যরা অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শনকালে দু’টি কারণ শনাক্ত করতে সক্ষম হন। এরমধ্যে একটি হলো- ট্রান্সফর্মারে মানসম্মত যন্ত্রাংশ না লাগানো। অর্থাৎ এইচডি বুশ দুর্বল থাকায় বুশিং ক্র্যাক থেকেই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটার বিষয় সম্পর্কে অনেকটা নিশ্চিত হন কমিটির সদস্যরা।

আরেকটি হলো ট্রান্সফর্মারের অভ্যন্তরের তেলে পানির অস্তিত্ব তথা আর্দ্রতা ছিল শতকরা ৩৫ শতাংশ। ফলে ট্রান্সফর্মারে কারিগরি (ম্যাকানিজম) ত্রুটিও পরিলক্ষিত হয় তদন্ত কমিটির কাছে।

তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে অগ্নিসংযোগ নিয়ে অনেকটা হতাশা ব্যক্ত করেন এবং কারিগরি ত্রুটির জন্য স্থানীয় প্রকৌশলীদের দায়ী করেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র।

সূত্রগুলো বলছে- মানসম্মত যন্ত্রাংশ ব্যবহার না করা এবং কারিগরি ত্রুটির কারণে দায়িত্ব অবহেলার দায়ে গ্রিড সাব স্টেশনের কর্মকর্তাদের ওপর শাস্তির খড়গ নামতে পারে।

সূত্র জানায়- কিছুদিন আগে ট্রান্সফর্মারের তেলের নমুনা পাঠানোর জন্য ঢাকাস্থ পরীক্ষাগার থেকে তাগিদ দেওয়া হয় স্থানীয় দায়িত্বশীল নির্বাহী প্রকৌশলীকে। সপ্তাহ তিনেক আগে পুনরায় তেল পরীক্ষাগার থেকে ট্রান্সফর্মারের তেলের নমুনা পাঠানোর জন্য তাগিদ দেওয়া হয়। কিন্তু শুষ্ক আবহাওয়া না থাকায় ট্রান্সফর্মারের নমুনা সংগ্রহে বিলম্বের কারণেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে মনে করছে তদন্ত কমিটি।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী- গ্রিড লাইনে ৩০০ এমপিএ (১৩২/২৩০) ট্রান্সফর্মার বাংলাদেশে মাত্র তিনটি রয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জ গ্রিড সাবস্টেশন ছাড়া বাকি দু’টি ঢাকার রামপুরায় এবং ও বরিশালে।

প্রায় ২৩৫ হাজার কেজি ওজনের ট্রান্সফর্মারটি অন্তত ২০ বছর পর্যন্ত নিরাপদ থাকার কথা। অথচ সেখানে মাত্র ৫ বছরের মাথায় উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন এই ট্রান্সফর্মারে অগ্নিসংযোগের ঘটনা নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের।

এদিকে, সাবস্টেশনে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও সেখানে এখনো নিভু নিভু আগুন জ্বলছে। এ কারণে ফায়ার সার্ভিসকে সতর্কতাবস্থায় রাখা হয়েছে।
সিলেট ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ট্রান্সফর্মারের ভেতরে দাহ্য পদার্থ থাকায় এখনও নিভু নিভু আগুন জ্বলছে। তবে পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

গত সোমবার (১১ই ডিসেম্বর) বেলা ১০টায় ফেঞ্চুগঞ্জ পালবাড়িতে বিদ্যুতের গ্রিড লাইনে ৩০০ এমপিএ (১৩২/২৩০) ট্রান্সফর্মারে আগুন লাগে। নিমিষেই আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়লে জাতীয় গ্রিড লাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও কুমিল্লার কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে।

পরে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিটের সমন্বিত চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু গ্রিড সেকশনের কর্মকর্তারা সেসময় দাবি করেন, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে- আগুনে পুড়ে যাওয়া ট্রান্সমিটারের তেল ধারণ ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার গ্যালন। এর মাধ্যমে ১৩২ কেভি ইনপুট ও ২৩০ কেভি আউটপুট তথা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যেতো।

আগুন লাগার ঘটনায় অন্তত ৩০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে শুধু ট্রান্সফর্মারের মূল্যই ছিল অনুমানিক ১২ কোটি টাকা। এটি দেশের বাইরে থেকে আনতে ব্যয় হয়েছে কমপক্ষে আরও ছয় কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য যন্ত্রপাতি পুড়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা।

এতো উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সফর্মারে আগুন লাগতে হলে ১৬০ ডিগ্রি উত্তপ্ত বা হাইটেনশন হতে হয়। অথবা ৩শ’ সেন্টিগ্রেড হাইটেনশন উত্তপ্ত হলে তেলেই আগুন তৈরি হয়। সেখানে মাত্র ১২০ ডিগ্রি উত্তপ্ত হওয়ায় আগুন লাগার কথা ছিল না। এর নেপথ্যে কারণ হিসেবে এইচডি বুশ ফেল করার বিষয়টি উঠে আসে তদন্তে। এতো দামি ট্রান্সমিটারে ব্যবহার করা হয়েছে কমদামি বুশ। ফলে বুশ ফেল করার কারণে আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্রান্সফর্মারে আগুন ধরায় শ্রীমঙ্গল গ্রিড লাইন থেকে বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। বিকল্প এই গ্রিড লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিপর্যস্ত হবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। সেজন্য খুব শিগগির অবিকল আরেকটি ট্রান্সফর্মার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

Sharing is caring!

Loading...
Open