শাহপরাণ (র) থানা : দুর্নিতির বরপুত্র এসি ইসমাইলের বেপরোয়া চাঁদাবাজি

নিজস্ব প্রতিবেদক::
সিলেটে সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ থানা হিসেবে পরিচিত শাহপরান (র.) থানা এলাকা। এ থানা এলাকায় যেমন বার বার ঘটছে আলোচিত সব হত্যাকান্ড, তেমনি এমন কোনো অপরাধ নেই যা এ থানা এলাকায় ঘটছে না। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, অসামাজিক কার্যলাপ, টিলাকাটা, জুয়ার আস্তানাগুলো ঘিরে শাহপরান থানা এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক অপরাধী চক্র। আর এ সকল অপরাধীচক্রের হোতারাই পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। সোর্স পরিচয়ে তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে থানা এলাকা। পাশাপাশি পুলিশের বড় কর্তারাও এ সকল সোর্সের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধ অপকর্মকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন।
সিলেট তামাবিল মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকায় শাহপরাণ থানা। এই থানার অধীনে সিলেট নগরীর বালুচর, টিলাগড়, উপশহর, বোরহানউদ্দিনসহ শাহপরাণের বিশাল এলাকা। এসব এলাকার অপরাধ চলছে পুলিশি মদদে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু সোর্স তৈরি করে শাহপরাণ থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) ইসমাইল হোসেন অপ্রতিরোধ্য চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন। যে কারণে, শাহপরাণ এলাকার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ তো হচ্ছেই না, উল্টো মাদক, জুয়াসহ নানা অপরাধ বেড়েই চলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহপরাণ থানায় সাবেক এসি সাজ্জাদুল হাসানের নাম শুনলেই অপরাধীরা তটস্থ থাকতো। তিনি বদলি হওয়ার পর এ থানায় যোগদান করেন এসি ইসমাইল হোসেন। তিনি যোগদানের পর পরই কিছু সোর্সের মাধ্যমে অপরাধী ও খারাপ শ্রেণির লোকদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। তাদের মাধ্যমে তিনি চাঁদাবাজির পরিকল্পনা তৈরি করে নেন। শুরু হয় অপ্রতিরোধ্য চাঁদাবাজি। দিনপ্রতি, সপ্তাহে ও মাসে আসতে থাকে চাঁদাবাজির টাকা। যে কারণে দিনে দিনে ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। ওসি আখতার হোসেন এসি ইসমাইল হোসেনের অযাচিত হস্তক্ষেপে তিনি জনগণকে আইনিসেবা ঠিকমতো দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ইসমাইল হোসেনের কথায় থানার দারোগারা চলেন। তাই শাহপরাণ থানায় ইসমাইল হোসেনের দারোগারা ওসির তোয়াক্কা না করেই ওপেন চাঁদাবাজি করে থাকেন। নির্ধারিত এসআই ও সোর্সের মাধ্যমে পকেট ভারি হয় এসির।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও গোয়াইনঘাট সড়কের অনটেস্ট অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের নিয়ন্ত্রণ করেন নুরুল হক নামের একজন। এই সড়কে প্রায় ১৪ শ অবৈধ অটোরিকশা ও ইজিবাইক চলে। এসবের কাগজপত্র নেই। এসি ইসমাইল ওই নুরুল হকের মাধ্যমে এসব গাড়ি প্রতি টোকেনের ব্যবস্থা করে প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা চাঁদাবাজি করেন। এতে চালকেরা ৮ শ টাকার টোকেন স্টিকার কিনে গাড়ির গ্লাসে সাঁটিয়ে সিলেট-তামাবিল সড়কে ওপেন চলাচল করেন। ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যাল দিলে কোনো কোনো দাম্ভিক চালক সরাসরি এসি ইসমাইল হোসেনের কথা বলেন। এমনকি এসি ইসমাইল মুঠোফোনে সার্জেন্টদের সাথে কথাও বলেন। এরফলে ট্রাফিক পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না। সোর্স সালেহের মাধ্যমে এসি ইসমাইল ভারতীয় পণ্যের ট্রাক-পিকআপভ্যান তল্লাশি করা থেকে বিরত থাকেন। এসব গাড়ি প্রতি এক হাজার টাকা করে এসির নামে তোলেন সোর্স সালেহ। টাকা না দিলে ট্রাক আটক করে চাঁদাবাজি করা হয়। কিছুদিন আগে ভারতীয় মদ ও বিড়ি বোঝাই একটি ট্রাক আটক করেন এসি ইসমাইল। পরে ওই ট্রাকের চোরাকারবারির কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়ে ট্রাকটি তিনি ছেড়ে দেন। স্থানীয় অনেকেই ঘটনাটি দেখে ট্রাকের ছবি তুলেছেন।
শাহপরাণ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এএসআই হযরত আলী ও এএসআই রাজু আহমদ হলেন এসির বিশ্বস্ত মানুষ। টিলা খেকো আলমের মাধ্যমে শাহপরাণ থানা এলাকার জাহানপুরসহ প্রায় ২০টি টিলা কাটা হচ্ছে। এসব টিলা থেকে প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা করে নেন এসি। হযরত শাহপরাণ (র.)-এর মাজারে দূর দূরান্ত থেকে আসেন ভক্ত আশেকানরা। তাদের টার্গেট করে মাজার এলাকায় একটি প্রতারক ও পকেটমার চক্র গড়ে ওঠেছে। এরা তাবিজ কবজ দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ভক্তদের পকেট কেটে মুঠোফোন নিয়ে সটকে পড়ছে। ওই চক্রের কাছ থেকেও এসির নামে টাকা ওঠে।
জহির আলী নামের একজন সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা তোলে এসিকে দেন মাজার এলাকার এসব অপরাধ চলার জন্য। চোরাই গাড়ি ধরার বাণিজ্যও করেন এসি। চোরাই গাড়ি উদ্ধার করেন এসি, কিন্তু চোরদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আবার গাড়ি ফেরত দিয়ে দেন। পরে তাদের কাছ থেকে মাসোহারা চাঁদাবাজিতে আসেন। আর এসব গাড়ি চলে সিলেট-তামাবিল সড়কে।
শিলং তীর সম্রাট রাজ শাহপরাণ গেইট, বাগান এলাকা ও শান্তিবাগে রমরমা জুয়া পরিচালনা করেন। তিনি ৭ দিনের সাজাপ্রাপ্ত জুয়াড়ি। তার কাছ থেকে মাসে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে ইসমাইল হোসেন জুয়া খেলা ওপেন করে দিয়েছেন। নাজিম নামের একজনের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে মাসে নেন লক্করঝক্কর লেগুনা গাড়ি চলাচলের জন্য।
অভিযোগ অস্বীকার করে শাহপরাণ থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আমি শুধু মার্ডার ও ডাকাতি মামলা দেখি। আর বাকি কাজগুলো ওসি দেখে। টিলাকাটা, জুয়া খেলা, চোরাই পণ্য এগুলো দেখার সময় আমার নেই।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এসএমপির উপকমিশনার (দক্ষিণ), সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত অতিরিক্ত ডিআইজি বাসুদেব বণিক বলেন,‘ শাহপরাণ থানা এলাকার আইনশৃঙ্খলার ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নিব।’

Sharing is caring!

Open