পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করা এই নারীটি হচ্ছেন ,কাঁকন বিবি


সুরমা টাইমস ডেস্ক :: একাত্তরের কোনো একদিনের কথা। তিনি ভিক্ষে করতে করতে চতুর্থবারের মতো পাকিস্তানিদের টেংরা ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক জুম্মার আজানের সময়, রাস্তায় তাকে আটকে ফেলল কয়েকজন পাকিস্তানি সৈন্য। একাধিকবার ক্যাম্পে আসায় সৈন্যরা তার সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যে যোগাযোগ আছে সেটা স্বীকার করানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার এক কথা, ‘আমি আমার স্বামী আবদুল মজিদ খানের খোঁজে ক্যাম্পে যাই’।

এর পরই শুরু হয় তার ওপর প্রচণ্ড শারীরিক নির্যাতন। গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলে নিষ্ঠুরভাবে পিটাতে শুরু করল তাকে। শরীর দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে। এভাবে দীর্ঘক্ষণ প্রচণ্ড অত্যাচারের মুখে তার শরীর একেবারে ভেঙে পড়ে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। একপর্যায়ে পাকহানাদাররা মোটা লোহার শিক গরম করে তার উরু দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। এ হেন নির্যাতনের পরও তার মুখ থেকে কোনো কথা বের করতে পারেনি পাকিস্তানি সৈন্যরা।

পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করা এই নারীটি হচ্ছেন কাঁকন বিবি। ইতিহাস যাকে চেনে বীরাঙ্গনা কাঁকন বিবি নামে। কিন্তু তিনি শুধু মানুষের মুখে মুখেই তিনি বীরঙ্গনা নামে পরিচিত বাস্তবে একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নেই কোনো পরিচিয়।

বর্তমানে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আর কিছুই চান না তিনি; একটাই আকাঙ্ক্ষা তার- খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। এ কথাটিই বলেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার পর।

বাজারে বাজারে মাছ, শুঁটকি আর লাকড়ি বিক্রি করে তখন জীবনধারণ করতেন তিনি। কখনও ভিক্ষাও করতে হতো বৈকি। অথচ জীবন বাজি রেখে অংশ নিয়েছেন একাত্তরের সম্মুখযুদ্ধে, গুপ্তচরবৃত্তি করে সহযোদ্ধাদের তথ্য জুগিয়েছেন, পাকিস্তানিদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন।

পাঁচ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের কে না জানেন তার সাহসিকতা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা। তা হলে কেন তিনি খেতাব পাবেন না?

১৯৯৬ সাল তখন। দীর্ঘ ২১ বছর পর আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার। বিভিন্ন পত্রিকায় পাঁচ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবির দুরবস্থা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাড়া পড়ে গিয়েছিল সারাদেশে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সঙ্গে সঙ্গে কাঁকন বিবির সন্ধান করেছিলেন। কাঁকন বিবি তার সঙ্গে দেখা করার পর বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন। সহযোগিতা করেছিল তখন আরও অনেক সংগঠন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কাছে কাঁকন বিবির চাওয়া ছিল একটাই- তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। প্রধানমন্ত্রী তাকে সেই প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের একটি সনদে বীরপ্রতীক খেতাব দেওয়া হয় তাকে। অথচ গেজেটে বীরপ্রতীক হিসেবে তার নাম আজও যুক্ত হয়নি।

এখন কাঁকন বিবির মুমূর্ষু অবস্থা। গত জুলাই মাসে ব্রেইন স্ট্রোক করার পর অবশ হয়ে গেছেন নব্বই-উর্ধ্ব এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় এক মাস চিকিৎসার পর তিনি বাড়ি ফিরে গেছেন গত ২৬ আগস্ট। শরীরের মাংস শুকিয়ে গেছে তার। হাত-পায়ে কোনো বল নেই। পরিস্কার করে কথাবার্তাও বলতে পারেন না। নীরবে শিশুর মতো কাঁদেন। তবে এখনও একটাই আকাঙ্ক্ষা তার- খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ঝিগারগাঁও গ্রামের কাঁকন বিবি এলাকায় পরিচিত মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিকন্যা হিসেবে। দোয়ারাবাজার সীমান্তে ভারতের গ্রাম নক্রাইয়ে বাড়ি ছিল তাদের। ব্রিটিশ-ভারতের মিজোরাম প্রদেশের এক খ্রিষ্টান খাসিয়া পরিবারে তার জন্ম। তবে জন্মের তারিখটি জানা নেই কাঁকন বিবির। বাবা গিসয় ও মা মেলি ছিলেন জুমচাষি। জন্মের মাত্র বছরখানেকের মধ্যেই পিতা-মাতা হারানো কাঁকন বিবি বড় হন বোনের বাড়ি।

একপর্যায়ে তার বিয়ে হয় সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার শাহেদ আলীর সঙ্গে। দুই বছরের সেই সংসারে জন্ম হয় তাদের একমাত্র কন্যা সখিনা বেগমের। সে সময়েই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কাঁকন বিবিদের গ্রামের কাছেই স্থাপিত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প।

সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল মীর শওকত আলীর উৎসাহে পাকিস্তানি সেনাদের তথ্য সংগ্রহের কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু পাকিস্তানিদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার পর তিনি আরও শানিত হন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। সিলেটের ৯টি যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। নভেম্বরের শেষ দিকে এক অপারেশনে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের জাউয়াবাজার ব্রিজটি তিনিই উড়িয়ে দেন। প্রশস্ত করেন বিজয়ের পথ।

এব্যাপারে দোয়ারাবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী (বীরপ্রতীক) জানান, কাঁকন বিবিকে বীরপ্রতীকের মর্যাদা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় একটি সাময়িক সনদ দিয়েছে। কিন্তু খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তিনি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি এখন জীবনসায়াহ্নে এসে দাঁড়িয়েছেন। এই সন্ধিক্ষণে তার একমাত্র চাওয়া- তাকে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

তার পরিবার ও এলাকাবাসীই শুধু নয়, সারাদেশের মানুষেরও প্রত্যাশা, তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক। কাঁকন বিবি কি জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারবেন না প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাকে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে?

Sharing is caring!

Loading...
Open