জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অগ্নিকন্যা কাঁকন বিবি

সুরমা টাইমস ডেস্ক:: কঙ্কাল শরীর, হাত-পা অবশ, বিছানায় প্রশ্রাব পায়খানা করেন। দুধ ছাড়া অন্য কোন খাবারও খাওয়ানো যায় না। কথা বলতে পারেন না। পরিচিত কেউ পাশে গেলে ফ্যাল ফ্যাল করে থাকান আর শিশুদের মতো কাঁদেন। গত ১৯শে জুলাই ব্রেন স্টোক করার পর থেকে এভাবে দিন কাটছে মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিকন্যা কাঁকন বিবি’র।

নব্বইয়োর্ধ কাকন বিবি গত ১৯শে জুলাই ব্রেন স্ট্রোক করেন। এরপর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রায় একমাস চিকিৎসা শেষে গত ২৬শে আগস্ট হাসপাতাল ছাড়েন তিনি। কাঁকন বিবির জামাতা আব্দুল মতিন জানান, দ্বিতীয়বার ব্রেন স্টোক করে তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ছিলেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষিপুর ইউনিয়নের ঝিগার গাঁওয়ের বাড়িতে আসার পর তার এই অবস্থা।

কাঁকন বিবির অপ্রাপ্তি:- কাঁকন বিবির একমাত্র মেয়ে সখিনা বেগম জানান, একাত্তরে তার মায়ের বীরত্বগাঁথা কাহিনী ৫নং সেক্টরের কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধারা ভালো জানেন। জীবনবাজি রেখে পাক হানাদারদের ক্যাম্পে গিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি, সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও অমানষিক নির্যাতনের কাহিনী স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসের পাতায় লিখা আছে। পচাঁত্তরের পর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তাদের মাথাগোঁজার ঠাঁই ছিল না। মানুষের বাড়ির বারান্দায় থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে, বাজারে বাজারে শুটকী, মাছ আর লাকড়ী বিক্রি করে জীবন নির্বাহ করেছেন। এরপর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুর কন্যা ক্ষমতায় এলে মিডিয়ায় তার মার দুর্বিসহ জীবন উঠে আসে। কাঁকন বিবি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করেন। প্রধানমন্ত্রী এবং বিভিন্ন সংগঠন, ব্যাংক ও মিডিয়া তার সাহায্যে হাত বাড়ায়। এরপর একটি বাড়ি করে সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে তারা চলছেন। সখিনা বেগম জানান, কাঁকন বিবির একমাত্র স্বপ্ন তাকে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া। এটা তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবী জানান। এরপর মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের একটি সনদে কাঁকন বিবিকে বীর প্রতীক খেতাব দেয়া হয়। কিন্তু গেজেটে বীর প্রতীক হিসেবে তার নাম উঠেনি। তিনি খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মত কোন সুযোগ সুবিধাও পাননি। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে গিয়ে তিনি বার বার তার জীবনের একমাত্র এই আশাটির কথা ব্যক্ত করেছেন।কিন্তু মুখে মুখে তাকে বীরাঙ্গনা উপাধি দিলেও তিনি গেজেটেড হননি। এ নিয়ে তিনি সবসময় দুঃখ করেছেন। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের মূল সনদ প্রস্তুতির কাজ চলছে। এই সনদে যেন তার মা খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ঠাঁই পান-এটাই তাদের আকুতি।

দোয়ারাবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বীর প্রতীক জানান, কাঁকন বিবি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। তাকে বীর প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় একটি সাময়িক সনদ প্রদান করে। কিন্তু খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি গেজেটেট হননি। এবং খেতাব প্রাপ্তমুক্তিযোদ্ধাদের মত সুযোগ সুবিধাও পাচ্ছেন না।

মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র সুনামগঞ্জের আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট বজলুল মজিদ খসরু জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধে ৫নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টার সেলায় কাঁকন বিবি যুদ্ধ করেছেন। গুপ্তচর হয়ে পাক বাহিনীর ক্যাম্প থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নির্যাতিতও হয়েছেন। কিন্তু খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে গেজেটেট করা হয়নি। ’৭৩ সালের পর খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের কোন গেজেট হয়নি বলে তিনি জানান।

কাঁকন বিবির জন্ম:- কাঁকনবিবির মেয়ে, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখা বিভিন্ন বই এবং পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধের সূত্র মতে, দোয়ারাবাজারের সীমান্তে বাংলাদেশের কাছে খাসিয়া অধ্যুষিত ভারতের একটি গ্রাম নক্রাই। বৃটিশ ভারতের মিজোরাম প্রদেশের এক খ্রীষ্টান খাসিয়া পরিবারে কাঁকন বিবির জন্ম। তবে জন্মের সন-তারিখ তিনি জানেন না। বাবা গিসয় ও মা মেলি ছিলেন জুমচাষী। তারা ৩ ভাই ও ২ বোন। তিনি সবার সবার ছোট। মা বাবা তাকে কাঁকন ও কাকেট নামে ডাকতেন।

কাঁকন বিবির বয়স যখন ছয় মাস তখন বাবা মৃত্যুবরণ করেন। বাবার মৃত্যুর কয়েক মাস পর মা ও চিরবিদায় নেন। এ সময় তাঁর বড় বোনের বিয়ে হয় এক বাঙালি মুসলমানের সাথে। বোন জামাই বৃটিশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীতে চাকরি করতেন। বড় বোনের বাড়িতে তিনি লালিত পালিত হন।

বাংলাদেশে আসা:- বড়বোনের বাড়ির একটু দূরেই ছিল পাকিস্তান সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্প। সেই ক্যাম্পে সৈনিক হিসাবে কাজ করতেন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের আব্দুল মজিদ খান। বোন জামাইর সাথে মজিদ খানের বেশ চেনা-জানা ছিল, বাড়িতেও আসতেন মাঝে মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের ১২/১৩ বছর আগে আবদুল মজিদ খানের সাথে কাঁকন বিবির বিয়ের ব্যবস্থা পাকা করেন বোন জামাই। পারিবারিকভাবেই সে বিয়ে সম্পন্ন হয়। ধর্মান্তরিত হয়ে নাম হয় নূরজাহান বেগম।

বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে কর্মস্থল বর্তমান দোয়ারাবাজারের বোগলা ক্যাম্পে এসে ওঠেন। এরপর কাঁকন বিবি সুনামগঞ্জ, সিলেট ও ছাতকে স্বামীর সাথে কাটান। বিবাহিত জীবনের দীর্ঘ আট বছরে তাঁদের ঘরে তিনটি সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু জন্মের পরপরই তারা মৃত্যুবরণ করে। খুব সম্ভবত এ কারণেই আব্দুল মজিদ খান সিলেট আখালিয়া ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় কাঁকন বিবিকে পরিত্যাগ করেন। হঠাৎ করেই আব্দুল মজিদ খান উধাও হয়ে যান।

স্বামী নিরুদ্দেশ হওয়ার পর একা কাঁকন বিবি অসহায় হয়ে পড়েন। আবারো ভগ্নিপতির বাসায় ফিরে যান কাঁকন। সেখানে থাকতেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার শাহেদ আলী নামে একজন। শাহেদ আলীর সাথে বিয়ে হয় কাঁকন বিবির। দুই বছরের সেই সংসারে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়, নাম রাখেন সখিনা বেগম।

এ সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। সুনামগঞ্জের এ অঞ্চলটি ছিল পাঁচ নম্বর সেক্টরের অধীন। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল মীর শওকত আলী। কাঁকন বিবি যে গ্রামে থাকতেন তার পাশেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এই ক্যাম্প থেকে খানিকটা দূরেই টেংরায় ছিল পাকিস্তানিদের ক্যাম্প। মুক্তিবাহিনীর যে ক্যাম্প ছিল সেখানে শহীদ কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন হরিনাপাটির শহীদ চৌধুরী। মীর শওকত আলী একদিন এই ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন। তিনি কাঁকন বিবিকে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প থেকে খবর সংগ্রহের কাজে লাগানোর জন্য উৎসাাহিত করেন। কাঁকন বিবির স্বামী যেহেতু আগে পাকিস্তানি ক্যাম্পে কাজ করত ; সুতরাং তাঁর পক্ষেই সম্ভব সেই পরিচয় কাজে লাগিয়ে সেখানকার খবরাখবর এনে মুক্তিবাহিনীর কাছে প্রেরণ করা। দেশের জন্য কিছু একটা করতে পারবেন এই ভেবে রাজি হয়ে যান কাঁকন বিবি। দুধের শিশুকে স্বামীর কাছে রেখে নেমে যান কাজে। সেই তার যুদ্ধ শুরু।

কাঁকন বিবি মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হন একজন গুপ্তচর হিসাবে। যার কাজ ছিল পাকিস্তানি ক্যাম্পে ঢুকে তাদের হাতিয়ারের ধরণ, সংখ্যা ও সৈনিকদের অবস্থান সম্পর্কে খবর সংগ্রহ করা।

ময়লা ও ছেঁড়া কাপড় পরে ভিক্ষুক হয়ে কৌশলে টেংরা ক্যাম্পে ঢুকে প্রথম স্বামী আব্দুল মজিদ খানের খোঁজের বাহানা করে নানা কায়দায় খবর সংগ্রহ করেন এবং সবকিছু শহীদ চৌধুরীকে এসে জানান। এক সময় তিনি পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং শারীরিকভাবে নির্যাতিত হন। এরপর অত্যাচারে পোড় খাওয়া কাঁকন বিবি যেন আরো শক্তিশালী হয়ে উঠেন। তার সাহস দ্বিগুণ বেড়ে যায়। এদিকে, নির্যাতনের খবর শুনে কাঁকন বিবিকে ‘নষ্টা মেয়ে’ বলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন স্বামী শাহেদ আলী। একমাত্র মেয়ে সখিনাকে রেখে দেন নিজের কাছে। স্বামী সন্তানকে হারিয়ে গৃহহীন, সম্বলহীন কাঁকন বিবি ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। কাঁকন বিবি ক্যাম্প থেকে খবর সংগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীর কাছে প্রেরণ করছেন-তা স্থানীয় কয়েকজন রাজাকার সন্দেহ করে। ওই রাজাকাররা পাকিস্তানি ক্যাম্পে গিয়ে অফিসারদের কাছে তাদের সেই সন্দেহের কথা জানায়। এরপর পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁকে ধরে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন চালায়। টানা সাতদিন অজ¯্র হায়েনার লালসার শিকার হন কাঁকন বিবি। বিবস্ত্র করে চলে অমানুষিক অত্যাচার। গাছের সাথে বেঁধে নিষ্ঠুরভাবে পেটানো হয় তাকে। সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। বিকৃত উল্লাসে সিগারেট দিয়ে ছ্যাঁকা দেয়া হয় হাতে উরুতে তলপেটে। এক পর্যায়ে পাকহানাদাররা মোটা লোহার শিক গরম করে তাঁর উরু দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। এই বীভৎস নির্যাতনের পরও তার মুখ থেকে কোনো কথা বের করতে পারেনি পাকিস্তানি সৈন্যরা। সাতদিন পরে কৌশলে তিনি পালিয়ে আসেন বালাট ক্যাম্পে। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আবার ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার বুকে তখন প্রতিশোধের আগুন।

মৃত্যুর দুয়ার দেখে এসে এবার তার সাহস দ্বিগুণ বেড়ে যায়, গুপ্তচরের পাশাপাশি শুরু করেন সম্মুখযুদ্ধ। দোয়ারার রহমত আলীর কাছে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নভেম্বর মাসে টেংরাটিলার যুদ্ধে উরুতে গুলিবিদ্ধ হন, যে দাগ এখনো বয়ে চলেছেন। তিনি টেংরাটিলাসহ আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই বালিউড়া, মহব্বতপুর, বেতুরা, দুরবিন টিলা, হাদা টিলা মোট ৯টি যুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র হাতে অংশগ্রহণ করেন। নভেম্বর মাসে শেষের দিকে রহমত আলীসহ আরও কয়েক যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের জাউয়া ব্রিজ অপারেশনে যান। একটি সফল অপারেশনের সাক্ষী হয়ে থাকেন কাঁকন বিবি। গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন জাউয়া বাজার ব্রিজ।

Open