আনিসুল হকের লাশ নিয়ে লন্ডন থেকে আসার সময় তার স্ত্রীর হৃদয়বিদারক স্ট্যাটাস

সুরমা টাইমস ডেস্ক:: একপাশে কফিনের উপর মাথা রেখে মাটিতেই বসে আছেন রুবানা হক। দীর্ঘ সময় এভাবেই কেটে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে দুই একজন আত্মীয় স্বজন মাথায় বা গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।

কফিনের অন্যপাশে দুই মেয়ে তানিশা হক ও ওয়ামিক হক অপলক নয়নে চেয়ে আছেন। চোখ দিয়ে অঝরে গড়িয়ে পড়ছে পানি। কখনও কখনও ওড়নায় সে পানি মুছে নিচ্ছেন তারা।

পাশের কাঁচের দরজার ওপাশে তখনও শত শত মানুষ ভিড় করে আছেন আনিসুল হককে এক পলক দেখার জন্য। দরজার এপাশ থেকে করজোড়ে সবাইকে অনুরোধ করে আনিসুল হকের ছেলে নাভিদুল হক বারবার বলছিলেন সবাই যেন আর্মি স্টেডিয়ামে চলে যান। সেখানেই শেষ দেখা দেখতে পারবেন। তার পরও উৎসুক মানুষ সামলানো যাচ্ছিল না।

দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। আনিসুল হকের ৯৫ বছর বয়সি বাবাকেও লাশ দেখানো হয়েছে। এবার শেষ বিদায় জানাতে হবে। দরজার পাশ ধরে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে সরে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে। এই পথ ধরেই আনিসুল হকের প্রিয় ঘর থেকে হবে শেষ যাত্রা।

সেসময়ও নির্বাক আনিসুল হকের প্রিয়তমা স্ত্রী রুবানা হক। খাটিয়া চলে এসেছে ঘরের ভেতর। রুবানা উঠে দাঁড়ালেন। খাটিয়ায় কফিন তুলে কাঁধে নিলেন ৮/১০ জন মানুষ। সেসময়ও রুবানা হক নির্বাক। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা দুচোখ যেন আরও অনেক কথা বলতে চায়। তার সামনে দিয়ে চির বিদায় নিচ্ছে তার প্রিয় মানুষটি আনিসুল হক।

আনিসুল হকের লাশ বাসায় আনা, জানাজা, দাফন পুরো সময়টাই নিশ্চুপ কাটিয়েছেন রুবানা হক।

আনিসুল হকের পারিবারিক বন্ধু টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব আব্দুর নূর তুষার বলেন, সারা দিনই রুবানা শুধু তাকিয়েই ছিলেন। যতটা সময় আনিসুল হকের মরদেহ বাসায় ছিলো ততটা সময় তার সাথেই থাকার চেষ্টা করেছেন।

আব্দুর নূর তুষার বলেন, আমরা দূর থেকে দেখি। আমরা সব সময় দেখেছি ‘দ্য আর দ্য হেপিয়েস্ট কাপল, ঢাকা শহরের সবচেয়ে সুন্দর দম্পতি সম্পর্কের একটা।’

ব্যবসায়ী, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব মেয়র আনিসুল হক বরাবরই তার আলাপচারিতায় কোনও না কোনওভাবে তার স্ত্রী রুবানা হকের গল্প তুলতেন।

তার সংগ্রাম, সফলতার পেছনে স্ত্রীর উৎসাহ উদ্দীপনার স্মৃতি মানুষকে শুনাতেন। তাদের অতীত কঠিন যাত্রার কথা মনে করতেন।
রুবানা হকও একইভাবে আনিসুল হকের প্রতিটি ব্যবসা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন সব সময়। আনিসুল হকের নির্বাচন পরিচালনায় স্ত্রী রুবানা হকের পরিকল্পনার গুরুত্ব ছিলো সবচেয়ে বেশি।

৯০ দশকেই নিজেদের পছন্দে এক হয়ে জীবন চলা শুরু করেছিলেন আনিসুল হক এবং রুবানা হক। ২৭ বছরের সংগ্রামী দৃষ্টিকাড়া সম্পর্ক ছিল সুশীল সমাজের এই জুটির।

স্বামীর লাশ নিয়ে লন্ডন থেকে ঢাকায় রওনা দিতে দিতে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে রবি ঠাকুরের কয়েক লাইন তুলে ধরে রুবানা হক লিখেছেন, প্রিয় তারে রাখিল না, রাজ্য তারে ছাড়ি দিল পথ, রুধিল না সমুদ্র পর্বত। আজি তার রথ চলিয়াছে রাত্রির আহবানে নক্ষত্রের গানে প্রভাতের সিংহদ্বার-পানে। তাই স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি, ভারমুক্ত সে এখানে নাই।’

Open