খুনের উপত্যকায় পরিণত হয়েছে বিয়ানীবাজার

নিজস্ব প্রতিনিধি:: বিয়ানীবাজারে ছয় মাসে ৬ খুন ও অপর আরেক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ লক্ষ করা গেছে। জনভীতি দূর করতে এসব খুনের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং রহস্য উদঘাটনে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। গত দু’দিনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনী পৃথক স্থানে অন্তত ১০টি অভিযান পরিচালনা করেছে। সাম্প্রতিক এসব হত্যাকাণ্ডের ৪টির নেপথ্যে পূর্ববিরোধ ছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।

এদিকে পুলিশের বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে প্রত্যন্ত স্থানে আত্মগোপনে থাকা আসামিদের গ্রেপ্তারে সমন্বিত অভিযানের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানান বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহজালাল মুন্সী।

তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে জড়িত কোনো আসামিকে ছাড় দেয়া হবে না। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বিয়ানীবাজারের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আমান উদ্দিন জানান, ‘ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। এ যেন খুনের উপত্যকায় পরিণত হয়েছে বিয়ানীবাজার। বেশিরভাগই ঘটছে প্রকাশ্যে।’

বিয়ানীবাজার পৌরশহরে সর্বশেষ শনিবার প্রকাশ্য দিনেদুপুরে খুন হন আনোয়ার হোসেন (২৪) নামের এক যুবক। ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে বাড়ি থেকে ডেকে এনে ছুরিকাঘাত করে তাকে খুন করা হয়েছে বলে তার স্বজনদের অভিযোগ। তিনি সুপাতলা গ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে। ঘটনায় জড়িত বলে পুলিশ যাকে শনাক্ত করেছে তার পরিবারের দুই সদস্য আজাদ উদ্দিন (৪৪) ও পাভেল আহমদ (২০) নামের দু’জনকে আটক করে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে। সন্দেহভাজন প্রধান আসামি সায়েল আহমদ (২৩) ও তার পিতা পংকি মিয়া (৪৩) কে গ্রেপ্তারে গোলাপগঞ্জের নদী তীরবর্তী এলাকায় একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। আনোয়ার খুনে ব্যবহৃত ছুরিও এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে জানান বিয়ানীবাজার থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাহিদুল হক।

এর আগে ১৭ই জুলাই বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসের শ্রেণিকক্ষে ছাত্রলীগকর্মী খালেদ আহমদ লিটু’র (২৪) গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা কামরান হোসেন ও এমদাদুর রহমান জামিনে মুক্ত হয়েছেন। অপর আসামি ফাহাদ আহমদ ও দেলওয়ার হোসেন এখনো কারাগারে।

হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে একনলা বন্ধুকের গুলিতে লিটুর মৃত্যু হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মামলার ৭ আসামির মধ্যে অপর ৩ আসামি পলাতক।

গত ৩১শে জুলাই উপজেলার চারখাই এলাকার কনকলস থেকে অটোরিকশা চালক মাসুদ আহমদ’র (১৮) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ছিনতাই হওয়া অটোরিকশাটি উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দু’জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হয়। নিহত মাসুদ শেওলা ইউনিয়নের চারাবই গ্রামের সুজন মিয়ার পুত্র। লাশ উদ্ধারের চারদিন পূর্ব থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।

গত ২৬শে জুন চারখাই ইউনিয়নে ফরহাদ আহমদ (২২) নামের এক যুবকের লাশ স্থানীয় একটি জলাশয় থেকে উদ্ধার করা হয়। তাকে পূর্ববিরোধের জের ধরে খুন করা হয়েছে বলে মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী জানান। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার সব আসামি পলাতক। নিহত ফরহাদ গিয়াস উদ্দিনের ছেলে। তিনিও পেশায় অটোরিকশা চালক ছিলেন।

মোল্লাপুর ইউনিয়নের পাতন গ্রামে মসজিদ এলাকার ভেতরে গত ১২ই জুন সৃষ্ট সংঘর্ষে খুন হন দিনমজুর মহিদুর রহমান মিন্টু (৪৮)। এটিও একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে তদন্ত সূত্রের দাবি। পূর্ব থেকে মারামারির জন্য মসজিদ এলাকায় অস্ত্র জড়ো করে রাখা হয় বলে পুলিশ জানায়।

এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ মোট পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করে। তবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের কালাইউরায় ২৩শে জুন রাতে ইউপি সদস্য মুমিনুল ইসলাম রুমনের বাড়িতে গৃহপরিচারিকা রেশম বেগম’র (৪৫) লাশ উদ্ধার করা হয়। বড় ধরনের আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ মামলায় দুই আসামির একজন মুমিনুল ইসলাম রুমন কারাগারে আছেন। অপর আসামি তার স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পলাতক।

এ ছাড়াও গত মাসে শেওলা ইউনিয়নের শালেস্বর থেকে ব্যবসায়ী আব্দুল গফুর’র (৬০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। রহস্য উদঘাটনে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সিরাজুল ইসলাম নিহত ব্যক্তির মোবাইল ফোনের ‘কললিস্ট’ সংগ্রহের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু ওই তালিকাটি দীর্ঘদিনেও পুলিশের কাছে না আসায় রহস্য আরো ঘনীভূত হচ্ছে।

বিয়ানীবাজার থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জাহিদুল হক জানান, ‘বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত। আমরা রহস্য উদঘাটনে কাজ করছি। আসামিদের গ্রেপ্তারে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করছি। অচিরেই সব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।’

Open