হারিয়ে যেতে বসেছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ‘শিলপাটা’

বিশেষ প্রতিনিধি:: কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে সিলেটের জাফলংয়ের ঐতিহ্যবাহী শিলপাটা। সেই সাথে বেকার হতে চলেছেন এ শিল্পের সাথে জড়িত কয়েক শতাধিক ব্যবসায়ী ও শ্রমিক।

এর ফলে খেটে খাওয়া এসব শ্রমিকরাও ঝুঁকতে শুরু করেছেন অন্য পেশায়। এক সময় সারা দেশের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষাভাষী লোকজনের বাড়িঘরে মসলাবাটার কাজে নিয়মিত ব্যবহৃত হতো এ শিলপাটা। তখন এর কদরও ছিলো বেশি।

শুধু মসলা বাটায় নয় এইসব শিলপাটার পাথর পাথর কেটে জন্মদিনের শুভেচ্ছা স্মারক, ভ্রমণ স্মৃতি, সম্মাননা কেষ্ট এবং প্রিয়জনকে দেয়া উপহার রসদ হিসেবেও এই শিলপাটার ব্যবহার ছিলো সর্বব্যাপী। কিন্তু প্রযুক্তি মানুষের দোরগোড়ায়। বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ আর আধুনিক প্রযুক্তির নানা বিকল্প উদ্ভাবনের ফলে এখন আর শিলপাটায় মসলা বাটায় উৎসাহী নয় এ প্রজন্মের নারীরা।

বাজারের প্রচলিত বিভিন্ন প্রজাতির ব্ল্যান্ডারসহ বেশকিছু আধুনিক মসলাবাটার পদ্ধতি বের হওয়ায় তারা এখন ঐসব পদ্ধতিতে আকৃষ্ট হচ্ছেন। জাফলং বেড়াতে আসা পর্যটক দর্শনার্থীরা আগে ফেরার পথে বাড়ির মসলা বাটা এবং উপহার স্মারক হিসেবে সবাই শিলপাটা ও শিলপাটার তৈরি উপহার স্মারক নিয়ে যেতেন। কিন্তু দিন দিন কমছে এই শিলপাটার কদর।

জাফলং বল্লাঘাট এলাকায় রয়েছে শতাধিক শিলপাটার দোকান। এসব দোকান সমূহে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন আরও শতাধিক শ্রমিক।

কথা হয় শিলপাটা ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের সাথে। জসিম উদ্দিন নামের এক শিলপাটা ব্যবসায়ী জানান, আগের তুলনায় প্রতিনিয়তই কমছে শিলপাটার ব্যবহার। মানুষজন মসলা বাটায় ব্রান্ডারসহ আধুনিক যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে ক্রেতা কিছুটা কমছে। বিকিকিনিও নেই আগের মতো।

দেলোয়ার হোসেন নামের একজন শিলপাটার খোদাই শ্রমিক। তিনি জানান, শিলপাটা পাথরে খোদাই করে জন্মদিন, মৃত্যু স্মরণিকা, শুভেচ্ছা, সম্মাননা স্মারকসহ নানা কাজে শিলপাটা পাথরের ব্যবহার এখনো আছে, তবে আগের মতো নেই। ফলে দিন দিন এ ব্যবসা অনেকটা নিষ্প্রভ হতে চলেছে। বেহাল সড়ক যোগাযোগ, পর্যটক হ্রাসও এ খাতের দুর্দিনের অন্যতম কারণ বলে জানান তিনি।

কুতুব উদ্দিন নামের একজন ব্যবসায়ী জানান, মসলা বাটতে শিলপাটার বিকল্প নেই। তাই অনেকেই এই শিলপাটাই কিনে থাকেন। তবে আগের তুলনায় এখন অনেকটা কম বিক্রি হয় শিলপাটা।

একটি শিলপাটার দোকানে দেখা হয় জাফলং বেড়াতে আসা পর্যটক কুমিল্লার দাউদকান্দির ফারুক হোসেন। তিনি জানান, মসলাবাটার কাজে গ্রামীণ গৃহিণীদের প্রথম পছন্দ শিলপাটা। দুটি কিনেছি এই শিলপাটায় বাটা মসলার স্বাদ গন্ধ অটুট থাকে, তাই মসলা বাটতে আমরা শিলপাটাই ব্যবহার করি।

জাফলং বল্লাঘাট পর্যটন কেন্দ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হোসেন আহমদ জানান, শিলপাটা আমাদের জাফলংয়ের একটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য। প্রতি বছরই জাফলং বেড়াতে আসা পর্যটক, দর্শনার্থীগণ বাড়ি ফেরার সময় মসলাবাটার উপকরণ এই শিলপাটা ক্রয় করেন। এই শিল্প ও এ খাতের বিনিয়োগকারীদের রক্ষার্থে সরকারের তরফে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

Sharing is caring!

Loading...
Open