গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে চাকরিতে ৪৬৮ পুলিশ কর্মকর্তা!

চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে চাকরি করছেন ৪৬৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা। এদের বেশিরভাগই পরিদর্শক ও উপ-পরিদর্শক পদের। যাদের একের পর এক নোটিশ জারি করেও আদালতে হাজির করা যাচ্ছে না। সাক্ষী হিসেবে এসব পুলিশ কর্মকর্তা আদালতে হাজির না হওয়ায় নিষ্পত্তি হচ্ছে না অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলাও। আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর ঘুরছেন বিচারপ্রার্থীরা। আদালত থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, বিভিন্ন মামলায় সাক্ষী হিসেবে হাজিরা না দেয়ায় গত ৮-১০ বছরে প্রায় দেড় হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর অধিকাংশ সাক্ষী পুলিশ কর্মকর্তা হাজির হলেও প্রায় ৪৬৮ জন পুলিশ কর্মকর্তা পলাতক হিসেবে আছে। এসব পুলিশ কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির করার জন্য পুলিশ প্রধানসহ সংশ্লিষ্টদের একাধিকবার তাগাদা সত্ত্বেও কার্যত কোনো ফল হয়নি। এমনকি এসব পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালত বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন। তারপরও কোনো সুরাহা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার পরও চাকরি করছেন পুলিশের বেশকিছু কর্মকর্তা। আবার অনেক পুলিশ কর্মকর্তা চাকরি থেকে অবসরও নিয়েছেন। ফলে থমকে আছে শত শত মামলার বিচারিক কার্যক্রম। বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। বিচারপ্রার্থী অনেকের অভিযোগ, বিচার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতেই মূলত টাকার বিনিময়ে আসামি পক্ষের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়ায় তারা আদালতে হাজির হচ্ছেন না। তবে, এ অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তাদের ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে তারা বারবার আদালতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকে বলেছেন, বদলির কারণে তারা আজ দেশের এ প্রান্তে থাকেন তো, কাল অন্য প্রান্তে। প্রতিটি থানায় কর্মরত থাকাকালে অসংখ্য মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সাক্ষী হন। এসব মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তারা হয়রান হয়ে পড়ছেন। এর বাইরে জঙ্গি তৎপরতা, ইয়াবা পাচার ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণসহ নিত্যনতুন ঘটনা সামাল ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মানতে গিয়ে অনেক মামলায় হাজিরা দিতে পারছেন না। চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সুভাষ বড়ুয়া বলেন, অভিযোগপত্রে পুলিশের স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ না থাকার কারণে আদালতকে অনেক অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার উচিত অভিযোগপত্রে প্রত্যেক সাক্ষী পুলিশ কর্মকর্তার স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা। তিনি বলেন, পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) পাবলিক সাক্ষীর নামসহ স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা উল্লেখ থাকে। কিন্তু যখন সাক্ষী হিসেবে কোনো পুলিশ সদস্যের নাম আসে তখন শুধু তার নাম, পদবি, আইডি নম্বর ও সংশিষ্ট থানার (তৎকালীন কর্মস্থল) নাম উল্লেখ করা হয়। স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ না থাকায় সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর ওই সময়ের কর্মস্থলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কিংবা নোটিশটি জারি হয়। মামলা চলাকালীন দীর্ঘসূত্রতার কারণে যখন ওই নোটিশ থানায় আসে তখন ওই থানায় কর্মরতরা সংশ্লিষ্ট সাক্ষী (পুলিশ সদস্য) কোথায় কর্মরত আছেন তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জানা সম্ভব হয় না। এর ফলে ওই থানা থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কিংবা নোটিশ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ফেরত পাঠানো হয়। বিভিন্ন দপ্তর ঘুরে যখন সংশ্লিষ্ট সাক্ষীর (পুলিশ) হাতে ওই নোটিশ পৌঁছে ততদিনে মামলার তারিখ পার হয়ে যায়। এভাবেই দিনের পর দিন অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়ায় মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। অথচ ক্রিমিনাল রুলস অ্যান্ড অর্ডারস ভলিউম-১ অনুযায়ী, সব সাক্ষীকে নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজির করার দায়িত্ব পুলিশ ও প্রসিকিউশনের। অথচ এসব পুলিশ সাক্ষী আইন অমান্য করে আদালতে হাজির হচ্ছেন না। এর ফলে ব্যাহত হচ্ছে বিচারাধীন মামলার স্বাভাবিক কার্যক্রম। মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন সহকারী কমিশনার কাজী সাহাবুদ্দীন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে জারি হওয়া অনেক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তাদের কাছে আসে না। পেশকার ও সেরেস্তাদারদের অনেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাঠায় না। তবে প্রসিকিউশন কোনো পরোয়ানা হাতে পেলে সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠিয়ে দেয়। জানা গেছে, চট্টগ্রাম তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বর্তমানে ৩৭টি হত্যা মামলা বিচারাধীন। এরমধ্যে রয়েছে ১৯৯৪ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নগরীর ডবলমুরিং থানা এলাকায় স্কুলছাত্রী সাবিনা ইয়াসমিন হত্যা মামলাও। এ ঘটনায় ডবলমুরিং থানায় বাদী হয়ে মামলা করেন ওই থানার এসআই আবদুল হামিদ। মামলা দায়েরের পর তিনি কোনোদিন আদালতে হাজির হননি। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা থানার তৎকালীন এসআই হারুন অর রশিদও আদালতে হাজিরা দেননি কোনোদিন। আদালত এ মামলার ছয় পুলিশ সাক্ষীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছেন। এভাবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ৫৫টি ও জননিরাপত্তা ট্রাইব্যুনালে ৩৫টি হত্যা মামলা বিচারাধীন ছিল। যার মধ্যে ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৮৬ সালে সংঘটিত একাধিক হত্যা মামলাও রয়েছে। যেগুলোর একটি মামলার বিচারও নিষ্পত্তি হয়নি। এসব মামলার বেশিরভাগই সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বিচার কার্যক্রম থমকে আছে।
এ ব্যাপারে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর আইয়ুব খান জানান, পুলিশের দায়িত্ব যেখানে সাক্ষী হাজির করা, সেখানে পুলিশই যদি নির্ধারিত তারিখে হাজির না হয় সেখানে আদালতের কি করার আছে। ফলে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল থেকে সব মামলা ফেরত পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এই ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলা নেই। জননিরাপত্তা ট্রাইব্যুনালের সেরেস্তাদার মো. ইউনুচ জানান, আদালতের হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে অন্তত দশটি মামলার বাদীকে পুলিশ আদালতে হাজির করতে পারেনি। সে কারণে এসব হত্যা মামলার বিচারের মূল কাজ শুরু হয়নি। এ অবস্থায় আদালত একাধিক পুলিশের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। তারপরও তারা আদালতে আসেন না। (মানবজমিন)

Open