থেমে থাকলেন না ওসি আখতার

সুরমা টাইমস ডেস্ক :: সিলেট নগরীর উপকন্ঠে ব্যস্ততম একটি পয়েন্ট টিলাগড়। এ অঞ্চলের দুটো ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ এমসি কলেজ ও সিলেট সরকারি কলেজ এই পয়েন্ট লাগুয়া। পয়েন্টের একেবারে গাঁ ঘেষে এমসি কলেজ আর এমসি কলেজের দেয়াল ঘেষে সরকারি কলেজ। আর তাই দিনের অন্যান্য সময় তো থাকেই তারপরও সকালের দিকে এই এলাকার যানবাহন আর লোকজনের হাটাচলার ব্যস্ততা বেড়ে যায় অনেক গুণ। কখনো সেই ব্যস্ততার রেশ ধরে তৈরী হয় দীর্ঘ সময়ের যানজট।
বছরের অন্যান্য দিনের মতো একটি দিন ছিলো ২৭ সেপ্টেম্বর বুধবার। আগেরদিন সকালে সিলেটে বজ্রসহ বৃষ্টি হয়েছে খুববেশি। আজকেও আকাশের অবস্থা সকালের দিকে তেমন ভালো ছিলো না। তাই সবার মাঝে একটা তাড়া তাড়া ভাব দেখা যাচ্ছিলো। সকাল তখন সাড়ে ৯টা। লোকজনের এই ব্যস্ততায় ঘটলো বেশ আকস্মিক এক ছন্দপতন। সিলেট সরকারি কলেজের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে একব্যক্তি। দু হাত দিয়ে আটকাতে চাইছে গাড়ি। ইট ছুঁড়ে ভাঙতে চাইছে গাড়ির কাঁচ। দুই পাশে জমে গেছে উৎসুক জনতার ভীড়। একসময় ঐ ব্যক্তিটি তেড়ে গেলো সেই লোকজনের দিকে। ফলে যা হবার তাই হলো। উত্তেজিত জনতা লোকটাকে বেদম মারধর করে আটকে রাখে। পুরো ঘটনা ঘটে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের শাহপরান থানা এলাকায়।

ঘটনার খবর দ্রুত পৌছে যায় থানার ওসি আখতার হোসেনের কাছে। তিনি দ্রুত ছুটে আসেন সেখানে। লোকটির অবস্থা দেখে তার মনে কিছুটা খটকা লাগে। তিনি তার সাথে কথা বলতে চেষ্টা করলেন। লোকটি কখনো তার নাম বলছে মো. সাদিক কখনো বলছে বাদশা। এর বাইরে সে তার আর কোনো পরিচয়ও দিতে পারেনা। আনুমানিক ৩৫ বছর বয়স্ক লোকটির অসংলগ্ন কথাবার্তায় তিনি মোটামোটি নিশ্চিত হন লোকটি মানসিক ভারসাম্যহীন।
তিনি লোকটিকে নিয়ে যায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে গিয়ে ঘটে আরেক বিপত্তি। পরিচয়হীন এবং ঠিকানীবিহীন হওয়ায় তাকে ভর্তি করতে চাইছে না হাসপাতালের লোকজন। থেমে থাকলেন না ওসি আখতার। তিনি যোগাযোগ শুরু করলেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে। তাদের সাথে আলোচনা করে অবশেষে নিজ দায়িত্বে তাকে ভর্তি করলেন হাসপাতালে। মো. সাদিক এখন ওসমানী হাসপাতালের ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে মানসিক বিভাগে চিকিৎসাধীন। সে জানেনা তার পরিচয়। তার জন্য ওদিকে হয়তো স্বজনরা পথচেয়ে বসে আছে সেই কবে থেকে। কিন্তু সেই যে সে হাঁরিয়েছে আর ফিরেনি ঘরে।
পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে যা করার দরকার তার চেয়ে হয়তো একটু বেশিই করেছেন শাহপরান থানার ওসি আখতার। মানসিক ভারসাম্যহীন লোকটিকে নিজে নিয়ে গিয়েছেন হাসপাতালে। তার বদলে হয়তো কোনো অধস্থন কর্মকর্তাকে দিয়েই পাঠাতে পারতেন। কিন্তু এরচেয়ে বেশি আর কিছু কি করার খুব একটা দরকার ছিলো তার? কিন্তু তিনি কি করলেন যখন দেখলেন লোকটিকে পরিচয়ের কারণে ভর্তি করা যাচ্ছে না। তখন নিজ জিম্মায় ভর্তির ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু এতোটা কেনো করলেন তিনি। এটা কি শুধুই পুলিশি দায়িত্ব?
এ ব্যাপারে ওসি আখতার হোসেন জানান, পুলিশি একটা দায়িত্ব তো আছে বটে তবে তার বাইরে একান্ত মানবিক দিক থেকেই তিনি এই কাজটি করেছেন। তিনি জানান, পুলিশের প্রতি আমাদের সমাজের অনেকের অনেক নেতিবাচক ধারণা আছে আমি চাই তাদের এই ধারনার পরিববর্তন ঘটুক। পুলিশও মানুষ। তাদের ভেতরেও বাস করে একটা মানুষের মন। এমনিতেই আমি মানুষের কষ্ট সহ্য করতে পারিনা। আর সেটা যদি হয় শিশু, বৃদ্ধ কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীন তাহলে তো তা আরো কঠিন।
এই বাদশা বা সাদিককে যদি আমি উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করতাম তাহলে সে আজ যেভাবে লোকজনের হাতে মার খেয়েছে কাল হয়তো আরেক জায়গায় আরেকজনের হাতে মার খেতো। আজ যেভাবে রাস্তাঘাটে অশান্তি সৃষ্টি করেছে কাল আবার করতো। কিন্তু এতে করে তারও কোনো লাভ হতো না আবার সমাজেরও কোনো লাভ হতো না। কিন্তু আমার মতো একজন অফিসারের সামান্য একটু প্রচেষ্ঠায় যদি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে কিংবা তার স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে পারে তাহলে তো সেটা এক বড়ো পাওয়া। এসময় তিনি বাদশা/সাদিক ওসমানী মেডিকেলের ২৫ নম্বর ওর্য়াডে চিকিৎসাধীন জানিয়ে কেউ তার পরিচয় জানলে হাসপাতাল বা শাহপরান থানায় যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন। পাশাপাশি তিনি এই ধরণের মানসিক ভারসাম্যহীনদের জন্য যারা রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ায় তাদের আশ্রয় এবং চিকিৎসার জন্য সমাজের বিত্তশালী ও সমাজ সচেতন লোকদের এগিয়ে আসার আহবান জানান।
এ ব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র এবং অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জেদান আল মুসা জানান, ওসি আখতার হোসেনের এই কাজ একটি ইতিবাচক ঘটনা। এধরণের কাজ জনগণের কাছে পুলিশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করবে। সেবাই হচ্ছে পুলিশের ধর্ম। পুলিশ সবসময় সেই কাজ করার চেষ্টা করে। ওসি আখতার আজ সেটাই করে দেখালেন।

Open