এম. সাইফুর রহমান : শতাব্দির শ্রেষ্ঠ সিলেট প্রেমিক আরিফুল হক চৌধুরী

সুরমা টাইমস ডেস্ক :: আরিফুল হক চৌধুরী
এম. সাইফুর রহমান। একটি নাম- একটি ইতিহাস। রত্নগর্ভা সিলেটের এই ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্বের মৃত্যু দিবসে মনে পড়ছে তাকে ঘিরে থাকা অসংখ্যা টুকরো স্মৃতি। শতাব্দির শ্রেষ্ঠ এই সিলেট প্রেমিক মাত্র ৫ বছর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে সিলেট অঞ্চলে যে উন্নয়নের সুপরিকল্পিত সুবাতাসের প্রবাহ সঞ্চারিত করেছিলেন গত সাড়ে ৯ বছরে তা একেবারেই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। ছাত্র রাজনীতিতে যখন সম্পৃক্ত ছিলাম, তখন থেকেই ব্যক্তিগতভাবে এম. সাইফুর রহমান আমাকে চিনতেন। পরবর্তীতে তৎকালীন সিলেট শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদকে দায়িত্বভার গ্রহণের পর জনাব এম. সাইফুর রহমানের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ১৯৯১ সালে সিলেট অঞ্চলে রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে জনাব এম. সাইফুর রহমান সম্পৃক্ত হওয়ার পর থেকে তার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ লাভ করি। পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব লাভ করার পর তার নির্বাচনী এলাকা সিলেট-১ আসনে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন জনাব এম. সাইফুর রহমান। সে সময় মহানগর বিএনপির সভাপতি হিসেবে ও পরবর্তীতে সিটি কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে নগর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে তার নিবিড় সান্নিধ্য লাভের সুযোগ অর্জন করি। এ সময় সিলেট মহানগরী ও সিলেট সদর উপজেলায় জনাব এম. সাইফুর রহমান যে উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনা করেন, তা বৃহত্তর সিলেটের শত বর্ষের ইতিহাসে বিরল। সিলেট মহানগর, সিলেট সদর উপজেলা, কোম্পানীগঞ্জ তথা বৃহত্তর সিলেটের এমন কোন স্থান নেই যেখানকার উন্নয়নে মরহুম এম. সাইফুর রহমানের দরদী হাতের ছোঁয়া লাগেনি। চার দলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেট অঞ্চলে অবকাঠামোগত উন্নয়নে সিলেট মহানগরীর উন্নয়নই ছিল তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য এম. সাইফুর রহমানের ধ্যান জ্ঞান। মন্ত্রী হিসেবে যখনই তার টেবিলে কোন ফাইল যেত, তিনি খুঁজতেন ঐ ফাইলে সিলেটের কোন উন্নয়ন প্রকল্প আছে কি-না। এমনও ঘটনা আছে, অন্য জেলার একটি উন্নয়ন প্রকল্প হয়তো তার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে, কিন্তু অনুরূপ প্রকল্প সিলেট জেলার জন্য না থাকায় সেটি তিনি ফেরত পাঠিয়েছেন। উদাহরন স্বরূপ, বরিশালে বিভাগ ঘোষণার পর সেখানে একটি ভিআইপি সার্কিট হাউজ স্থাপনের জন্য প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয় পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে এম. সাইফুর রহমানের কাছে। তখন সিলেটও বিভাগ গঠিত হয়ে গেছে। ঐ সময় সিলেটে কোন অত্যাধুনিক সার্কিট হাউজের প্রয়োজনীয়তা ছিলনা। কিন্তু এরপরও এম. সাইফুর রহমান তার টেবিল থেকে ফাইল ফেরত পাঠান এই প্রকল্পের মাধ্যমে সিলেটে একটি ভিআইপি সার্কিট হাউজ নির্মানের সুপারিশ সহ তার পুণরায় প্রেরণের জন্য। ফলে, সুরমার তীরে একটি সুরম্য সার্কিট হাউজ ভবন নির্মিত হয়। একই ভাবে, দেশের অন্য আরেকটি জেলার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার একটি প্রস্তাবনা আসে মন্ত্রী সভার বৈঠকে। এ সময় এম. সাইফুর রহমান বলেন, দেশের অন্য জেলায় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হলে সিলেটে কেন হবে না ? তখন সভার সভাপতি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেন, সাইফুর রহমান সাহেব, আপনি কিভাবে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় করবেন, আপনার সিলেটে তো ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজই নেই। ফলে, এম. সাইফুর রহমান অতি অল্প সময়ে সিলেটে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করেন এবং আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বলেন, সিলেটে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নাই- এটা তোমরা কেউ এত দিন আমাকে বলোনি কেন ? আমি কলেজ করে দিলাম, একদিন এটিও বিশ্ববিদ্যালয় হবে। সিলেট শহরতলীর আলুরতলে সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সুবিশাল ভবন ও এর অবকাঠামোগত সকল স্থাপনা নির্মিত হয় এম. সাইফুর রহমানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। কিন্তু ইতোমধ্যে সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় জনবলের মঞ্জুরী দেয়া সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। পরবর্তীতে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে খন্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু নিতান্ত পরিতাপের বিষয়, বিগত ওয়ান ইলেভেনের সরকারের দুই বছর ও বর্তমান সরকারের সাড়ে ৪ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষক ও জনবল নিয়োগের পরিপত্রটি জারি করেনি সরকার। ফলে, সিলেটের একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন ধ্বংসের প্রায় দ্বারপ্রান্তে। শত কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা কলেজের মূল্যবান বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও ফার্নিচার বিনষ্ট হচ্ছে অবহেলায়। এ প্রসঙ্গে আরো বলা যায়, দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে সরকারী বরাদ্দের বিষয়টি। সিলেটের এমসি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও সরকারী মহিলা কলেজ ইতোপূর্বেই দুই ধাপে সরকারী বরাদ্দ পেয়েছিল। সিলেটে সে সময় আর কোন সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ না থাকায় দেশের অন্যান্য জেলার ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক ভবন নির্মাণে অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাবনা পাঠানো হয় জনাব এম. সাইফুর রহমানের টেবিলে। ঐ তালিকায় সিলেটের কোন কলেজ ছিলনা। ক্ষুব্ধ হয়ে এম. সাইফুর রহমান সচিবের কাছে জানতে চান, সিলেটের কোন কলেজ বরাদ্দের প্রস্তাব নেই কেন ? সচিব জানান, সিলেটের দুটি কলেজে আগেই বরাদ্দ দেয়া হয়ে গেছে। বরাদ্দ দেয়ার মত আর কোন কলেজ সিলেটে নেই। সাইফুর রহমান বলেন, কেন থাকবে না ? ঐ যে ‘মদন বাবাজি’র কলেজ না কি যেন নাম (মদন মোহন কলেজ). ঐ টাতে তো কোন টাকা দেয়া হয় নাই। ঐ টার নাম সংযোজন করে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে মদন মোহন কলেজেও একটি সুরম্য একাডেমিক ভবন নির্মিত হয়েছিল ঐ বরাদ্দে। এম. সাইফুর রহমান আপাদমস্তক ছিলেন সিলেট অন্তঃপ্রাণ। সিলেট-১ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন তিনি। কিন্তু সিলেটের কোন দাবীদাওয়া নিয়ে যেতে হতো না তার কাছে। উল্টো যখনই দেশের অন্য কোন স্থানের কোন উন্নয়ন প্রকল্প তার কাছে আসতো, তিনি দেখে নিতেন এই প্রকল্পের অনুরূপ সিলেটে কোন প্রকল্প করা যায় কি-না। যদি সিলেটের কোন প্রকল্প না থাকতো, তাহলে তিনি তা পাশ করতেন না। পরবর্তীতে সচিব-আমলারাও তার এই মনোভাব বুঝে গিয়েছিলেন। আর তাই তারা সব ফাইলেই সিলেটের কোন না কোন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করতেন। প্রসঙ্গতঃ সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়টি বলা যায়। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেটবাসীর শত বর্ষের আন্দোলনের ফসল। কিন্তু সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য এক দিনও আন্দোলন করতে হয়নি সিলেটবাসীকে। জনাব এম. সাইফুর রহমান নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগেই সিলেট ভেটেরিনারী কলেজকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করেন। প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট ওসমানী বিমান বন্দরকে আর্ন্তজাতিক মানে উন্নীত করার জন্য দায়িত্বভার গ্রহণের পর পরই উদ্যোগ নেন এম. সাইফুর রহমান। একদিন কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের চেয়ে সিলেটে প্রবাসী বেশি। অথচ, লন্ডন-মধ্যপ্রাচ্য থেকে সিলেটে সরাসরি বিমান নামবেনা- এটি হতে পারেনা। এজন্য প্রথমে তিনি বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে ওসমানী বিমান বন্দরের নতুন ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে পরিসর বৃদ্ধি করেন এবং রানওয়েও সম্প্রসারণ করেন। ফলে, চার দলীয় জোট সরকারের দ্বিতীয় বছরেই লন্ডন থেকে সরাসরি বিমান এসে নামে সিলেটে। কিন্তু সে সময় যে রিফুয়েলিং স্টেশনের প্রয়োজন সেটি কেউ জানায়নি এম. সাইফুর রহমানকে। ফলে, সেটিতে হাত দেয়া হয়নি। বর্তমান সরকারের সাড়ে ৪ বছরেও সিলেট ওসমানী আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরে রিফুয়েলিং স্টেশন স্থাপিত হলোনা একটি সামান্য রিফুয়েলিং স্টেশন- এর চেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় আর কি হতে পারে ? সিলেটের ৪ জেলাকে নিয়ে বিভাগ ঘোষণার নেপথ্যে যে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন এম. সাইফুর রহমান- তা সিলেটবাসীর অনেকেরই অজানা। বরিশাল বিভাগ ঘোষণার পর সিলেটের মানুষ ফুঁসে উঠেন সিলেটকে বিভাগ ঘোষণার দাবীতে। দেয়ালে লেখা হয় শ্লোগান- ‘আমড়া চেয়ে কমলা ভাল, সিলেটকে বিভাগ করো’। এম সাইফুর রহমান মন্ত্রী সভার বৈঠকে নাকি এই শ্লোগানটি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও শুনিয়েছিলেন। কিন্তু সিলেট বিভাগ ঘোষণার বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছিলেন না প্রধানমন্ত্রী। ইত্যবসরে জনসভার উদ্দেশ্যে সিলেট আসেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেদিন সিলেট সার্কিট হাউজে আমাদের সামনেই প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের হুমকী দেন এম. সাইফুর রহমান বলেন, ম্যাডাম আপনি যদি আজকের জনসভায় সিলেট বিভাগ ঘোষণা না দেন, তাহলে আপনাকে একাই ঢাকায় ফিরে যেতে হবে। সিলেট বিভাগ ঘোষণা না হলে আমার পক্ষে ঢাকায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। সে সময় কোন উত্তর না দিয়ে একটু হেসেছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেদিনের জনসভাতেই সিলেটকে বিভাগ করার ঐতিাহাসিক ঘোষণা প্রদান করেছিলেন তিনি। এ রকম অসংখ্য টুকরো স্মৃতি এম. সাইফুর রহমানের সাথে জড়িয়ে আছে। সিলেট অঞ্চলের মানুষ ভালবেসে তাকে ‘সিলেট বিভাগের উন্নয়নের রূপকার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার আমলে সূচিত উন্নয়ন কর্মকান্ডের ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করার নয়। এ প্রসঙ্গে সবার আগেই উল্লেখ করতে হয় সিলেটের সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের বিষয়টি। সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী কীন ব্রীজ জরাজীণ হয়ে পড়েছিল। ফলে, এক পর্যায়ে এই ব্রীজ দিয়ে সব ধরনের ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। রেলওয়ে বিভাগের মাধ্যমে এই সেতুর সংস্কার করিয়ে এম. সাইফুর রহমান সিলেটের ঐতিহ্যের স্মারক কীন ব্রীজকে নতুন জীবন দান করেন। শুধু তাই নয়, এই সেতুর সৌন্দর্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে দুটি সুদৃশ্য তোরণও নির্মাণ করেন তিনি। এছাড়া, শাহপরাণ (র.) সেতু ও টুকেরবাজারে শাহজালাল সেতু-২ এর নির্মাণ কাজ তিনি শুরু করেন ও অতি অল্প সময়ে তা শেষও করেন। নগরীর যানজট নিরসনে কাজিরবাজারে ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন তিনি। সে অনুযায়ী কাজও শুরু করেন। তার মেয়াদে সেতুর মূল ভিত্তির কাজও শেষ হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সেই সেতুর অসমাপ্ত কাজ গত সাড়ে ৪ বছরেও শেষ হয়নি। ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী, সিলেটের আরেক কৃতি সন্তান মরহুম শাহ এএমএস কিবরিয়া। কিন্তু ফান্ড সংগ্রহ করতে না পারায় তার পক্ষে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ২০০১ সালে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এম. সাইফুর রহমান দায়িত্ব পাওয়ার পর দ্রুত তিনি ফান্ড বরাদ্দ দেন ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক বাস্তব রূপ লাভ করে। শুধু তাই নয়, সিলেটের সাথে ভারতের সেভেন সিস্টারের বাণিজ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে জনাব এম. সাইফুর রহমান তামাবিল পর্যন্ত সুপরিসর সড়ক নির্মাণ করেন। এ প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দের জন্য তিনি বিশ্বব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানকে তামাবিল পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন। এম. সাইফুর রহমানের পক্ষেই সম্ভব বিশ্বব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যানকে তামাবিলের মত সীমান্তে নিয়ে আসা। প্রসঙ্গতঃ শাহপরাণ সেতুর বাইপাস সড়কটি লালাবাজারে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক পর্যন্ত সংযুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল এম. সাইফুর রহমানের। কিন্তু সময়ের অভাবে তা হয়নি। বর্তমান সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য মহোদয় প্রায় ৩ বছর আগে পারাইরচক থেকে লালাবাজার পর্যন্ত বাইপাস সড়ক নির্মাণে আশ্বাস দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ৬ মাসের মধ্যে এর কাজ শুরু হবে। কিন্তু সেই উদ্যোগ আজো আলোর মুখ দেখেনি। অনেকেই ‘আলোকিত সিলেট’ গড়ার শ্লোগান দিয়ে জনপ্রিয়তা আদায়ের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এম. সাইফুর রহমানই ছিলেন আলোকিত সিলেটের মূল স্বপ্ন দ্রষ্টা। শুধু স্বপ্ন দেখা বা দেখানোর মধ্যেই সীমিত ছিলনা তার সদিচ্ছা। তিনি তার বাস্তব রূপায়নও করেছিলেন। এর প্রমাণ তিনি শিক্ষায় আলোকিত করার জন্য সিলেটে অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও উন্নয়ন করেছিলেন। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, সিলেট মডেল স্কুল এন্ড কলেজসহ অনেকগুলো নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পাশপাশি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ, সরকারী মহিলা কলেজ, মদন মোহন কলেজ, সরকারী কলেজ, ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ করেন তিনি। তিনি সিলেট প্রেসক্লাব ভবন নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ দেন। ঐতিহাসিক শাহী ঈদগা তার প্রচেষ্টায় নতুন সৌন্দর্য লাভ করে। সিলেটে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নতুন সুবিশাল ভবন নির্মিত হয় তার প্রচেষ্টায়। ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমী, জেলা শিল্পকলা একাডেমী, বিভাগীয় গণগ্রন্থাগার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান তার উদ্যোগেই নিজস্ব সুবিশাল ভবন লাভ করে। রেড ক্রিসেন্ট মাতৃমঙ্গল হাসপাতাল সম্প্রসারণ করে এখানে একটি মেডিক্যাল কলেজও চালু করেন তিনি। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিহিংসার রাজনীতির কারণে বন্ধ করে দেয়া হয় এই মেডিক্যাল কলেজ। সিলেট মহানগরীকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার পাশাপাশি মেট্রপলিটন পুলিশ গঠনের মাধ্যমে সিলেট নগরবাসীকে প্রকৃত নগরায়নের সুফল প্রদানের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। মনে আছে, সরকারের একেবারে শেষ মুহূর্তে ঈদের ছুটিতে জরুরী ভিত্তিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি ভবনে তিনি এসএমপি’র কার্যালয় উদ্বোধন করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সাড়ে ৪ বছরেও সিলেট মেট্রপলিটন পুলিশ পায়নি তার নিজস্ব ঠিকানা। সিলেট নগরীর যানজট নিরসনে নগরীর প্রায় প্রতিটি সড়কের সম্প্রসারণ এবং সার্কিট হাউজ থেকে বিমান বন্দর পর্যন্ত ভিআইপি রোড নির্মাণ তার অনন্য কৃতিত্ব। আমি নিজে সৌভাগ্যবান যে, সিলেটবাসীর একজন সেবক ও এম. সাইফুর রহমানের একজন বিশ্বস্ত অনুচর হিসেবে তার প্রায় সকল কার্যক্রমেই আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম। মনে পড়ে, অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালন কালে প্রায় প্রতিরাতেই সাড়ে ৯টায় বেজে উঠতো আমার টেলিফোন। লাইনের অপর প্রান্তে থাকতেন এম. সাইফুর রহমান। জানতে চাইতেন, কোন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ কতটুকু এগিয়েছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর উন্নয়ন বঞ্চিত সিলেট নগরবাসী তথা বৃহত্তর সিলেটের মানুষ মর্মে মর্মে তার অভাব উপলব্ধি করতে পারছেন। আর এ কারণেই বিগত সিটি নির্বাচনে নগরবাসী আমাকে মেয়র নির্বাচিত করার মাধ্যমে পুণরায় তাদের খেদমত করার সুযোগ দিয়েছেন। আমি মনে করি, এ মাধ্যমে সিলেট নগরবাসী শুধু আমাকে নয়, শতাব্দির শ্রেষ্ঠ সিলেট প্রেমিক মরহুম এম. সাইফুর রহমান ও তার সুবিশাল উন্নয়ন কর্মকান্ডকে মূল্যায়ন করেছেন। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এম. সাইফুর রহমানের মৃত্যুর পর যেভাবে তার জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি যেভাবে তার প্রতি ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে রয়ে গেছে। আমি তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি প্রতি মুহূর্তে। অগণিত সিলেটবাসীর মত আমিও বিশ্বাস করি, ‘হককুল এবাদ’ বা মানবতার কল্যাণে তার অবদানের জন্য আল্লাহ রাববুল আলামীন তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেছেন।
-লেখক : মেয়র, সিলেট সিটি কর্পোরেশন।

Sharing is caring!

Loading...
Open