সিলেটে ফুড সাপ্লিমেন্টের ছড়াছড়ি,প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা!

বিশেষ প্রতিবেদন : সিলেটের চিকিৎসকরা ওষুধ প্রশাসনের আইন মানছেননা। নির্ধারীত আইন অমান্য করে ব্যবস্থাপত্রে লিখছেন ভেজাল ও নিন্মমানের ফুড সাপ্লিমেন্ট (খাদ্য সম্পূরক)। আর এতে করে প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। এতে যেমন বেড়েছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি, তেমনি আর্থিক ক্ষতিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের।

ওষুধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগরীর বিভিন্ন ফার্মেসীতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলেও এসব চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে না কোন পদক্ষেপ। ওষুধ প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার কোন নিয়ম তাদের নেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রে লিখছেন তাই তারা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সিলেটের স্বনামধন্য কিছু চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র পড়ে দেখা গেছে বিভিন্ন এন্টিবায়োটিক ওষুধের পাশাপাশি লিখা হয়েছে ফুড সাপ্লিমেন্ট বা খাদ্য সম্পূরক। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে প্রয়োজন না হলেও তাদেরকে শুধু ফুড সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক তার ৬ জুলাইয়ের একটি ব্যবস্থাপত্রে দেখা গেছে তিনি এক রোগীকে ‘পোলেন সি আর’ নামের একটি ফুড সাপ্লিমেন্ট লিখে দিয়েছেন। তাছাড়াও একই মেডিকেলের একজন গাইনী বিশেষজ্ঞ ২৭ মে’র একটি ব্যবস্থাপত্রে এক রোগীকে ‘ফিলা’ নামের একটি ফুড সাপ্লিমেন্ট লিখে দিয়েছেন।

এছাড়া জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের গাইনী বিভাগের এক অধ্যাপকের ব্যবস্থাপত্রে দেখা গেছে তিনি এক রোগীকে তিনটি ফুড সাপ্লিমেন্ট লিখে দিয়েছেন যার মধ্যে রয়েছে, এক্সটিমিন, ভেলিডো, ই-গ্রেইস, নামের নিষিদ্ধ ফুড সাপ্লিমেন্ট। বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্টের ব্যবস্থাপত্রে দেখা গেছে তিনি ৮ জুলাইয়ের একটি ব্যবস্থাপত্রে ‘বায়োবিলোভা’ নামের ফুড সাপ্লিমেন্ট দিয়েছেন। একই ভাবে সিলেটের সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসকরা নিওভিট, ইভ ১০০০, ফ্লেক্সিমেক্স, গ্লোকোসেন্ড, নিওলিন, ভায়োটিনসহ বিভিন্ন নামের নিষিদ্ধ ভেজাল ওষুধ রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে লিখছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভিন্ন ফুড সাপ্লিমেন্ট কোম্পানির প্রতিনিধিরা এক শ্রেণির চিকিৎসককে প্রভাবিত করে রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে এগুলো লিখিয়ে নিচ্ছে। তাছাড়াও মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে অনেক চিকিৎসকের কাছ থেকে এসব ফুড-সাপ্লিমেন্ট লিখিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। কিছু কিছু কোম্পানি ওষুধ প্রশাসনের দেওয়া বৈধ লাইসেন্সের আড়ালে নামে-বেনামে অবৈধ ওষুধ ও ফুড সাপ্লিমেন্ট বাজারজাত করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করছে। এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট ক্রয় করে চিকিৎসা সেবার নামে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে মানুষ। পড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতেও।

নগরীর বিভিন্ন ফার্মেসীর ওষুধ বিক্রেতাদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, চিকিৎসকরাও এখনো ব্যবস্থাপত্রে ফুড সাপ্লিমেন্ট লিখে যাচ্ছেন। এমনকি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অনেক রোগীকে ওষুধের পাশাপাশি ফুড সাপ্লিমেন্ট দেয়া হচ্ছে। তারা আরো জানান, একশ্রেণির লোভী চিকিৎসককে ম্যানেজ করে ফুড সাপ্লিমেন্ট কোম্পানিগুলো তা বাজারে ছাড়ছে। অত্যাধুনিক মোড়কে প্লাস্টিক বোতলভর্তি বিদেশী ফুড সাপ্লিমেন্ট আসছে বৈধ ও অবৈধ পথে। অবশ্য ব্যবস্থাপত্রের বাইরেও এগুলো বিক্রি হচ্ছে । শতকরা ৭০ ভাগ ব্যবস্থাপত্রেই একাধিক ফুড সাপ্লিমেন্টের নাম লেখা থাকে। যেহেতু ডাক্তাররা ব্যবস্থাপত্রে লিখে দিয়েছেন তাই কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা।

এ ব্যাপারে অভিযোগ পাওয়া একাধিক চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট নিষিদ্ধ তারা জানেন না। এমকি স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় থেকেও তাদের অবগত করা হয়নি।অনেক সময় রোগীদের অনুরোধে তারা ব্যবস্থাপত্রে লিখে থাকেন। তারা আরো জানান, বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানীর প্রতিনিধিরা তাদের এ ফুড সাপ্লিমেন্ট গুনাগুন ভাল বলে তাদেরকে অবহিত করে এ জন্য রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে এটি দেওয়া হয়ে থাকে। যেহেতু এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেহেতু এটি দেশে আমদানী করা বন্ধ করলে কেউ আর ব্যবস্থাপত্রে এটি লিখবে না। ফুড সাপ্লিমেন্ট যেহেতু নিষিদ্ধ তাই ব্যবস্থাপত্রে এগুলো আর লিখবেন না বলে প্রতিবেদককে জানান চিকিৎসকরা।

এ ব্যাপারে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের সাবেক এক সহকারী অধ্যাপকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, রোগী হলে চেয়ারে বসেন, রোগী না হলে বেরিয়ে যান। সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি বলেন,কোন বিষয়ে আলাপ করতে চান। রোগীর ব্যাবস্থাপত্রে ফুড সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না যা ইচ্ছা লিখতে পারেন।

এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন সিলেটের ড্রাগ সুপার শফিকুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ফুড সাপ্লিমেন্টের উৎপাদন ও বিক্রি করার অনুমতি ওষুধ প্রশাসন দেয়নি। ভেজাল ও নিম্নমানের এসব ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি বন্ধ করতে নগরীর ফার্মেসী গুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ফার্মেসীকে জরিমানা করাও হয়েছে। তিরি আরো জানান, চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার ক্ষমতা ওষুধ প্রশাসন বিভাগের নেই যার কারণে আমরা তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। সিভিল সার্জন ও বিএমএ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। তারা ব্যবস্থা নিলে হয়তো তা প্রতিরোধ করা যাবে।

এ ব্যাপারে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা.হিমাংশু লাল রায় জানান, ফুড সাপ্লিমেন্ট কোন ওষুধ নয়। এটা খাদ্যের বিকল্প হিসেবে অনেকের খেয়ে থাকে। দেশে কোন ওষুধ বিক্রি বা উৎপাদন করতে হলে ওষুধ প্রশাসনের যেমন অনুমতি লাগে, ঠিক তেমনি খাদ্য জাতীয় কোন কিছুর ক্ষেত্রে অনুমতি নিতে হয় খাদ্য অধিদপ্তরের ।এ ফুড সাপ্লিমেন্ট উৎপাদন ও বিক্রি করার অনুমতি এ দুই প্রতিষ্ঠান দেয়নি। তাই দেশে এটি বিক্রি বা বিপনন করার অনুমতিও নেই । তাই কোন চিকিৎসকদের এটি রোগীদের দেওয়া ঠিক না। এটি বন্ধের ব্যাপারে গত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় তিনি আলোচনা করেছেন । তিনি আরো জানান, কিছু অসাধু চিকিৎসককে ম্যানেজ করে ফুড সাপ্লিমেন্ট কোম্পানিগুলো তা রোগীর ব্যবস্থা পত্রে লিখিয়ে নিচ্ছে। আগামী বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এর সভায় তিনি এ বিষয়ে সবাইকে অবহিত করবেন। সেখান থেকে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২-এর ১৪ (এ) (১) উপ-ধারায় বলা আছে, রেজিস্ট্রিবিহীন ওষুধ রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কোনো চিকিৎসক লিখতে পারবেন না। লিখলে এটা বেআইনি। তথ্যসূএ:সিলেট টাইমস বিডি।

Open