জৈন্তাপুরে স্ত্রীর পরকীয়ার বলি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নজরুল,বহাল তবিয়তে ওসি !

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন::সিলেটের জৈন্তাপুর থানাহাজতে স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমের বলি হয়েছেন নজরুল। আর এর নেপথ্যের নায়ক নসরিনের পরকীয়া প্রেমিক ইউপি মেম্বার ফখরুল। আদালতে দায়ের করা মামলায় মেম্বার ফখরুলকে এজাহারভুক্ত করা না হলেও নজরুলের রেখে যাওয়া মোবাইলের মেমোরি কার্ড থেকে পরবর্তীতে রেবিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। গত ১৯ মে ভোররাত পৌনে ৫টায় জৈন্তাপুর থানা হাজতে নজরুলের মৃত্যুর এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জৈন্তাপুর থানা পুলিশ একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু করলেও নিহতের মা রোকেয়া বেগম গত ১লা জুন সিলেটের ১নং আমলী আদালতে থানার ওসি শফিউল কবির সহ ১১জনের নাম উল্লেখ করে একটি নালিশা হত্যামামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করছে সিলেটের পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন(পিবিআই)।

অভিযোগে প্রকাশ, সিলেটের জৈন্তাপুর থানার উমনপুর গ্রামের আব্দুল হান্নানের মেয়ে নাসরিন ফাতেমা উপজেলার ঘিলাছড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা। সিলেট এমসি কলেজের ডেমোষ্টেটার জনৈক আনোয়ার হোসেনের সাথে প্রথমে বিয়ে হয় তার এবং তার কোল জুড়ে আসে আনোয়ারের ঔরসজাত কন্যা তিশা। বিয়ের পূর্ব হতেই মামাতো ভাই স্থানীয় ইউপি মেম্বার ফখরুলসহ অনেকের সাথে ছিল নাসরিনের দহরম মহরম ও দৈহিক সম্পর্ক। বিয়ের পরও বহুগামী নাসরিন তার এ সম্পর্ক বজায় রাখায় স্বামী আনোয়ার তাকে তালাক দিতে বাধ্য হন। একমাত্র কন্যা তিশাকে নিয়ে নাসরিন ফাতেমা চলে যায় পিত্রালয়ে এবং সেখান থেকেই স্কুলে শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন ।

এদিকে নজরুল ইসলাম বাবু চারবছর আগে বিয়ে করলেও তার কোন সন্তান ছিল না এবং বর্তমান স্ত্রীর গর্ভে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল কম। নজরুলরা ছিল তিন বোন ও একভাই। পরিবারে অন্য কোন পুরুষ না থাকায় ছেলে সন্তান পাওয়ার জন্য নজরুল দ্বিতীয় বিয়ে করার উদ্যোগ নেন। নজরুল জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সরকারী চাকুরি করার সুবাদে ইউএনও ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সাথে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে যাওয়ার সুযোগ হতো তার। যাওয়া-আসার একপর্যায়ে ঘিলাছড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা নাসরিন ফাতেমার সাথে তার পরিচয় ও পরিচয় পরবর্তী প্রনয়। এসময় নাসরিন ফাতেমা নিজেকে কুমারী (অবিবাহিতা) পরিচয় দেয় নজরুলের কাছে। পরিচয় ও প্রনয়ের সূত্র ধরে গতবছরের নভেম্বরে কোর্ট ম্যরেজের মাধ্যমে একে অন্যকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গ্রহন করে নেয় তারা। দ্বিতীয় বিয়ের পরও নাসরিন থেকে যায় তার বাপের বাড়ি। পরবর্তীতে নাসরিন ফাতেমার পূর্ববর্তী বিয়ে ও সন্তানের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পরও তাকে স্ত্রী হিসেবে তুলে আনতে রাজি হয়েছিল নজরুল। এ নিয়ে নাসরিনের পরিবারের সাথে আলাদা একটি চুক্তিও সই করেছিল নজরুল। কিন্তু এ পর্যায়েও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নাসরিনের পরকীয়া প্রেমিক ইউপি মেম্বার ফখরুল। ইউপি মেম্বার ফখরুল এর আগে দুটি বিয়ে করলেও তার ঘরে কোন স্ত্রী ও সন্তান নেই। নাসরিনের সাথে পরকীয়া করেই দিন চলছিল মেম্বার ফখরুলের।

এদিকে ভুমিহীন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান নজরুল তাদের পরিবারের নামে দ্বিতীয় স্ত্রীর গ্রামের স্কুলের কাছেই ২৮শতক ভুমি বরাদ্দ পান সরকার থেকে। এ ভূমির দখল নিয়েও স্কুল কমিটির সদস্যদের সাথে বিরোধ ছিল তার। নজরুলের সাথে বিয়ে হওয়ার পরও নাসরিন ফাতেমা তার মামাতো ভাই মেম্বার ফখরুলের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করতে পারেনি । ফখরুলের সাথে বিভিন্ন স্থানে ও হোটেলে-মোটেলে বেড়াতে যাওয়া আসা সহ ফখরুলের সাথে পরকীয়া সম্পর্ক বহাল রেখেই চলছিল বহুগামী নাসরিন। এনিয়ে নাসরিন ও ফখরুলের সাথে মোবাইল ফোনে নজরুলের বাক-বিতন্ডা ও দেন-দরবার চলতে থাকে। নজরুল স্ত্রী নাসরিনকে ফখরুলের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করতে চাপ দিতে থাকলে চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে নাসরিন ও ফখরুল। ফখরুল তখন হাত মেলায় স্কুল কমিটির সদস্যদের সাথে। শেষ পর্যন্ত ইউপি মেম্বার ফখরুল ও স্কুল কমিটির সদস্যদের যৌথ প্রযোজনায় নজরুলের অজান্তেই সাজানো হয় একটি নারী নির্যাতন মামলা। আর এ মামলায় গ্রেফতার করিয়ে থানা হাজতে নিয়ে নির্মমভাবে পিঠিয়ে হত্যা করা হয় বীর মুক্তযোদ্ধা আব্দূল জলিলের একমাত্র পুত্রসন্তান নজরুল ইসলাম বাবুকে। হত্যার পর আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয় ঘাতকচক্র ও থানা পুলিশ। নির্মম এ হত্যাকান্ডে প্রাতবাদের ঝড় বইতে শুরু করে জৈন্তাপুর উপজেলাসহ জেলার সর্বত্র। ঘটনার দায়ে থানার এসআই শফিকসহ চার পুলিশকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও বহাল তবিয়তে থেকে যান থানার ওসি শফিউল কবির। এছাড়া ওসি শফিউল কবির থানা পুলিশের ডিউটি সিলেক্ট করে দেন কিন্তু রহস্যজনক কারণে ওসি হুকুমদাতা হয়েও আজ পর্য্যন্ত জৈন্তাপুর মডেল থানায় রয়েছেন বহাল তবিয়তে !

ঘটনার পর পুলিশের দায়েরকরা অপমৃত্যু মামলা চলাবস্থায় সিলেট জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি অ্যাডেভোকেট মুহাম্মদ লালাসহ কয়েকজন আইনজীবির মানবিক সহায়তায় গত ১লা জুন আদালতে একটি নালিশা হত্যা মামলা করেন নিহতের মা রোকেয়া বেগম। আদালত তদন্তক্রমে প্রতিবেদন দাখিল করতে পিবিআই সিলেটকে নির্দেশ দেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই সিলেট-এর ইনসপেক্টর ইমরান সুরমা টাইমস কে জানান, নজরুলের বোন নাজমিন একটি মেমোরি কার্ড দিলে তা মোবাইলে সাপোর্ট না করায় ডিক্স করে দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। তিনি আরো জানান তদন্তের অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে এবং আগামী ২৫ জুলাই বেধে দেয়া সময়সীমার মধ্যেই যেকোন দিনই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।

অভিযোগের ব্যাপারে স্কুল শিক্ষিকা নাসরিন ফাতেমার সাথে বুধবার (২৮জুন) বিকেলে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন বক্তব্য না দিয়ে পরবর্তীতে কথা বলবেন বলে মোবাইল ফোন কেটে দেন। কিন্তু পরে আর কোন কিছু জানান নি।

পরকীয়া সম্পর্ক ও ঘটনার নেপথ্যে থাকার বিষয়ে ইউপি মেম্বার ফখরুলের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, নাসরিন ফাতেমা তার মামাতো বোন। তার সাথে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। তবে পরকীয়া প্রেম বা কোন প্রকার অনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং ছিল না বলে জানান তিনি।

Sharing is caring!

Loading...
Open