সিলেটে ইজতেমা শুরু ব্যাপক নিরাপত্তা

জাহেদ আহমদ :: দীর্ঘ তিন যুগ পর সিলেটে আজ থেকে শুরু হচ্ছে তাবলিগ জামাতের ইজতেমা। বিশ্ব ইজতেমার অংশ হিসেবে দক্ষিণ সুরমার মোল্লারগাঁও ইউনিয়নের সুনামগঞ্জ বাইপাস সড়ক সংলগ্ন খিদিরপুরের পশ্চিম, লতিপুরের উত্তর ও হাজরাইয়ের দক্ষিণ এলাকা জুড়ে বিশাল মাঠে আজ বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া ইজতেমা আগামী শনিবার শেষ হবে। ওইদিন সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত হবে আখেরি মোনাজাত।
আজ বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজের পর থেকে আম (সাধারণ) বয়ানের মধ্য দিয়ে ইজতেমার কার্যক্রম শুরু হয়। আজ, আগামীকাল শুক্রবার ও শনিবার তিন দিনব্যাপী ইজতেমার শেষদিন শনিবার সকালে আখেরি মুনাজাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে। ৫ থকে ৬ লক্ষ মুসল্লির জন্য প্রায় সাড়ে ৯ লাখ বর্গফুট মাঠের প্যান্ডেল নির্মাণ করা হলেও শেষের দিনে আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে আশপাশের এলাকা জুড়ে ১০ থেকে ১২ লক্ষ মুসল্লির সমাগম ঘটবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ছয়শ’ কেদার (প্রায় ২’শ একর) জমির উপর সিলেট জেলার ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইজতেমা প্যান্ডেলে মোট ১১টি খিত্তা (এলাকা) রয়েছে। ১৬টি করে প্রত্যেকটি পয়েন্টে সাজানো মাঠে রয়েছে ২শ’টি মসজিদ ওয়ালি। এ ছাড়া মাঠের দক্ষিণ পাশে ৮ থেকে ১০ হাজার মুসল্লি যাতে এক সাথে ওজু করতে পারেন, সে জন্য করা হয়েছে একটি বিশাল ওজুখানা। এই ওজুখানা ছাড়াও আরো ২০ থেকে ২৫টি ছোট ওজু খানার ব্যবস্থা আছে। মাঠের একপাশে অন্তত ১৪’শ শৌচাগার রয়েছে; ১০টি গভীর নলকূপসহ প্রায় ১২ থেকে ১৫টি নলকূপ বসানো হয়েছে। পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য বসানো হয়েছে ১৮’শ অস্থায়ী শৌচাগার। সিলেটের গোলাপগঞ্জ, দক্ষিণ সুরমা, বিশ্বনাথ, সিলেট সদর, বিয়ানীবাজার, বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, জৈন্তাপুর, জকিগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট উপজেলার ও সিলেট সিটি করপোরেশনের ২৭টি ওয়ার্ডের মুসল্লিরা ইজতেমায় আসছেন। ইজতেমায় দেশি-বিদেশি ইসলামি চিন্তাবিদ ও ওলামায়ে কেরামগণ ঈমান, আকিদা, ইসলামের দ্বিনের দাওয়াত, ইসলাম ধর্ম ও আখিরাত সম্পর্কে বয়ান দেবেন। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে বয়ানের সঙ্গে সঙ্গে তা বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, হিন্দু ও আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. জয়নাল আবেদীন জানান, ইজতেমার জন্য জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে সকল ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। মুসল্লিরা যাতে নিবিঘেœ ইজতেমায় অংশ নিতে পারেন, সেজন্য পুলিশ প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ইজতেমার মাঠে দু’টি অস্থায়ী ট্রান্সফরমার বসানো হয়েছে।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাবীব বলেন, ইতোমধ্যে নলকূপ বসানো সহ পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। লাইট লাগানোর পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতা অব্যাহত আছে।
তাবলিগ জামাতের জেলা আমির সুয়েজ খান বলেন, ‘আল্লাহর নামে কোনো কাজ শুরু করলে তা থেমে থাকে না। আল্লাহর মেহেরবানিতে সকল কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, বিদেশি মেহমানদের নিরাপত্তসহ বিশেষ খেয়াল রাখা হবে। তাঁদের জন্য আলাদা প্যান্ডেল করে তাঁবু দিয়ে ইবাদত করার সুযোগ রয়েছে। যারা মাঠে থাকতে অসুবিধা মনে করবেন, তাঁদেরকে পার্শ্ববর্তী মসজিদে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে।

তাবলিগ জামাতের সাইফুর রহমান জানান, ৩২ বছর পর সিলেটে ইজতেমা হচ্ছে। এর আগে ১৯৬৫ ও ১৯৮৪ সালে সিলেট জেলার সুরমা নদীর দক্ষিণ তীর সংলগ্ন টেকনিক্যাল মাঠে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথমবার আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন ইউসূফ জি (রহ.) এবং দ্বিতীয়বার আখেরি মোনাজাত করেন এনামুল হাসান (রহ.)। তিনি বলেন শেষবার ৮৪ সালে পলিটেকনিক মাঠে জেলা পর্যায়ে একটি ইজতেমা হয়েছিল। এবার ৩২ বছর পর সিলেটের ইজতেমা সফল করতে সবাই সহযোগিতা করেছেন।
সিলেটের ইজতেমাকে ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে নগর পুলিশ। ইজতেমার মাঠসহ পুরো এলাকাজুড়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে প্রায় এক হাজারেরও বেশি পুলিশ। সেই সঙ্গে নিরাপত্তা দায়িত্ব পালন করবে র‌্যাবের সদস্যরা।
ইজতেমার স্কেচ ম্যাপ অনুসারে বিভিন্ন ধাপে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ ও র‌্যাব। এজন্য কয়েকবার ইজতেমার মাঠও পরিদর্শন করেছেন পুলিশ ও র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ইজতেমার মাঠসহ আশপাশ এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারিও বৃদ্ধি করা হয়েছে। আর পুলিশের সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করবেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ইজতেমার মাঠসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দেড়শতাধিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশের দুটি ওয়াচ টাওয়ার ও দুটি কন্ট্রোল রুমও স্থাপন করা হয়েছে তদারকি করার জন্য। এছাড়াও মাঠে ও মাঠের বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে গোয়েন্দা ও সাদা পোশাকধারী বিপুলসংখ্যক পুলিশ। দক্ষিণ সুরমাসহ সুনামগঞ্জ বাইপাস, তেলিবাজার বাইপাস পয়েন্ট, লামাহাজরাই, চন্ডিপুল পয়েন্ট ও হুমায়ুন রশিদ চত্বরসহ নগরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতেও বসবে পুলিশের চেকপোস্ট। বিভিন্ন যানবাহন ও সন্দেহজনক ব্যক্তিদের করা হবে তল্লাশি।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুসা জানান, ইজতেমার মাঠসহ আশপাশ এলাকায় প্রায় ১ হাজারেরও বেশি পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। ইজতেমায় তিন স্তরের নিরাপত্তা দেওয়া হবে। ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা দেয়ার জন্য পোশাকি পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
র‌্যাব সূত্র জানায়, র‌্যাব-৯ এর পক্ষ থেকে ইজতেমার মাঠসহ আশপাশ এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মোটরসাইকেল ও গাড়ি দিয়ে র‌্যাবের ২৪ ঘণ্টা মনিটিরং থাকবে। ইতোমধ্যে ইজতেমা মাঠের পাশেই স্থাপন করা হয়েছে র‌্যাবের কন্ট্রোল রুম ।

Sharing is caring!

Loading...
Open